• ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩, মঙ্গলবার ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ই-পোর্টাল

Janatar Katha

Banner Add
  • কলকাতা
  • রাজ্য
  • দেশ
  • বিদেশ
  • রাজনীতি
  • খেলার দুনিয়া
  • বিনোদুনিয়া
  • সম্পাদকীয়
  • নিবন্ধ
  • ভ্রমণ
  • রাশিফল
  • টুকিটাকি
  • চিত্রহার
  • বিবিধ
  • ভিডিও
  • এছাড়াও
    • উৎসব
    • ব্যবসা
    • স্বাস্থ্য
    • শিক্ষা
    • প্রযুক্তি
    • হেঁসেল

নিবন্ধ

নিবন্ধ

ফারাও এর দেশ ঘুরে... (ভ্রমণ কাহিনী) পঞ্চম পর্ব

পরের দিনের আমাদের গন্তব্য ছোট্ট শহর লাক্সর। এই শহর টি কায়রো থেকে প্রায় ৭০০ কি.মি দূরে।আমরা প্লেনে করে এখানে চলে এলাম।তাই সময় বেশ কম লাগলো। মিশরের অন্তর্দেশীয় ফ্লাইটের জন্য যে প্লেন গুলো চলে, তার symbol দেখলেও অবাক হয়ে যেতে হয়। মিশরীয়দের প্রিয় হরাস দেবতার চোখ আঁকা থাকে। এই হরাস একে দেবতা তায় আবার বাজ পাখি, তাই উচ্চতার সাথে উড়ান দিতেও এর জুড়ি মেলা ভার। এর জন্যই মিশরকে এত ভালো লাগে। এরা সূক্ষ্মতার উপর জোর দেয় বেশি। লাক্সর শহরের এয়ার পোর্ট টি খুব সুন্দর। ছোট্ট হলেও খুব পরিষ্কার আর রুচি সম্মত। এখানে এলেই বোঝা যায় , যে আমরা মিশরীয় সভ্যতার একদম কেন্দ্র স্থলে চলে এসেছি। এখানে আমরা একটি বোট এ থাকব। দু দিন এখানেই ঘুরব। তারপর নৌকা চলতে থাকবে। আর যতক্ষণ এ নৌকা দাঁড়িয়ে থাকবে ততক্ষণ নীল নদের উপরেই, তার পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকবে।লাক্সর এর পুরনো মিশরীয় নাম হল থীবস। শহরের ঝকঝকে ভাব না থাকলেও মাটির গন্ধ ভাল ভাবেই রয়েছে। আর এটিই হল লাক্সরের বিশেষত্ব। আর মিশরের সব বড় শহরের মত এখানেও, তার প্রাণ কেন্দ্রটি হল নীলনদ। নীল নদের দুই পাড়ে প্রচুর ক্ষেত, আর বড় বড় গাছ। আগে প্রতি বছর নীলনদে যে বন্যা হত, সেই বন্যার ফলে তৈরি হওয়া প্লাবন ভূমিতে চাষ করা হত, আর এখনও তাই হয়। মিশরীয় ভাষায় এই উর্বর মাটিকে বলা হয় কেমেত বা Kemet (land of black soil), আর বাকি মরুভূমি অঞ্চল কে (যা মিশরের প্রায় ৯০%) বলা হয় Land of Red soil ।লাক্সর এসে দেখা গেল, মিশরীয় সেচ ব্যবস্থার চেহারা। আমরা যে রাস্তা দিয়ে চললাম তার পাশ দিয়ে বয়ে চলছিল নীল নদের একটি ক্যানাল। রাস্তার দুই দিকে কুঁড়ে বাড়ি, যা আমাদের দেশের কথাই মনে করায়। তবে কুঁড়ে বাড়ির ছাদটি অন্যরকম। ওদের দেশে ছাদ সমান, আমাদের মত আটচালা style ওখানে নেই। চারিদিকে খেজুরের গাছ। গ্রামের ছোট বাচ্ছারা নিজেদের মধ্যে খেলাধুলা করছে। কখনও কখনও আমাদের উপস্থিতি তে অত্যন্ত বিরক্তও হচ্ছে।এখানে আমাদের থাকার জায়গা , নদীর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বড় নৌকা বা cruise। এটিকে নৌকা না বলে ছোটখাটো একটি শহর বলা উচিত। ঘর, বারান্দা, ছাদ, খাবার ঘর, club, দোকান সব পাওয়া যায় এখানে। ছোট একটা জাহাজের মত। আমাদেরটির নাম ছিল Nile Quest । প্রত্যেকে নিজেরদের ঘরে এসে দেখলাম এলাহি ব্যবস্থা। একটা ভাল হোটেলের ঘরে যা যা থাকে, এখানেও সে সবই আছে। এখানে শুধু মাত্র একটি বোট নয়, বেশ কিছু বোট পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একটির পর একটি পার করে নিজেদের টায় আসতে হয়।ভুল করলে কিন্তু অন্যদের বোটে চলে যাবার সমুহ সম্ভাবনা।প্রতি ঘরে একটি করে জানলাও আছে নদীর দিক করে।তবে সেটি নৌকা চলার পর উপভোগ করা যাবে । প্রথমে তো সেই জানলা খলার চেষ্টা করে প্রায় ভেঙেই দিচ্ছিলাম , পরে বুঝলাম ঘরে A.C চলায় জানলা খোলা রাখা যাবেনা । দুপুরে এলাহি খাবার খেয়ে আমরা রওনা দিলাম কারনাক ও লাক্সরের মন্দিরের উদ্দেশ্যে।কারনাক মন্দিরকারনাক ও লাক্সর এর মন্দির দুটিই মিশরের পুরনো রাজধানী থীবস এ অবস্থিত। প্রাচীন মিশরকে সাধারণ ভাবে দুটি ভাগে ভাগ করা যায় । আপার ও লোয়ার মিশর বা উত্তর ও দক্ষিণ মিশর। আগে এই দুই ভাগ আলাদা আলাদা ভাবে বিচরণ করত, তাদের সব কিছু আলাদাই ছিল। পরে ফারাও মেনেস এই দুই ভাগ কে এক করেন ও সমগ্র মিশরের একটিই রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করেন। এই ঘটনাকে ছবিতে প্রকাশ করা হয়েছে, আপার বা উত্তর মিশরের Symbol হল পদ্ম আর লোয়ার বা দক্ষিণ মিশরের symbol হল প্যপিরাস। এই দুই এর মিলনই হল দুই মিশরের মিলন। এর ছবি দেখলে আমাদের পুরানের সমুদ্র মন্থন এর গল্প বা তার ছবি কল্পনায় ভেসে ওঠে।কারনাক মন্দিরের প্রবেশর পথ, দু দিকে সারি দিয়ে ছাগল জাতীয় পশুর মূর্তিআমরা প্রথমে গেলাম কারনাক এর মন্দিরে। কারনাক মন্দির চত্বরটি অতিকায় এবং বহু বছর ধরে বানান। এখানে বিভিন্ন রাজা বা রানীর কীর্তি আলাদা আলদা করে বোঝা যায়। এঁদের মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য হলেন রামেসিস দ্বিতীয় বা Great Ramesis। এই মন্দিরে ঢোকার রাস্তার দু দিকে সারি সারি Ram বা বড় ছাগল জাতীয় পশুর মূর্তি আছে। আর সেই ছাগল গুলির প্রতিটির সামনে একটি করে ছোট আকারের রাজার মূর্তি আছে। যেন রাজাকে রক্ষা করছে এই পশুটি । রাজা বলে মনে হবার সম্ভাবনা কম ছিল, তবে শুধু হাত এর অবস্থান দেখে বোঝা যায় (অর্থাৎ, হাত দুটি অসিরিস এর মত করে রাখা) । এরপরের প্রশ্ন আসে, কোন রাজার এত মূর্তি গড়া হল? ঐতিহাসিকরা অনেক খুঁজে একটি মাত্র মূর্তির বুকে রাজার নামাঙ্কিত খারতুশ দেখতে পান। এই খারতুশ থেকে প্রমাণ হয় যে মূর্তি গুলি সব ই ফারাও রামেসিস দ্বিতীয়র।এই মূর্তিতেই রাজার বুকে চিহ্নিত খারতিশের মধ্যেই দ্বিতীয় রামেসিসের নাম পাওয়া যায়, খারতুশখারতুশ হল মিশরীয় একটি প্রতীকের মত। ডিম্বাকৃতি আকারের একটি ফলক মত। যার মধ্যে মিশরীয় ভাষায় কিছু বিশেষ নাম বা অর্থ কে লেখা হয়। আজকাল কার দিনে লেখার মধ্যে Highlight করার মত। এই বিশেষ জায়গা গুলতেই সাধারন ভাবে রাজার নাম লেখা থাকত। বিভিন্ন রাজার বিভিন্ন খারতুশ হত। আর কারনাকেও এই খারতুশ দেখেই রামেসিস এর নাম জানা গেছিল।এরপর আমরা একের পর এক চমক পেতে পেতে মন্দিরের ভিতরে যেতে শুরু করলাম। যত এগোতে লাগলাম, তত অবাক হওয়া বাড়তে লাগল। প্রতি কোনায় এমন সব জিনিস রয়েছে যে মনে হচ্ছিল কোন দিকে আগে যাব কোনটায় যাবনা। যাই হোক, শুরুতেই চোখে পড়ল পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট অবেলিস্ক। অবেলিস্ক হচ্ছে, পাথরের তৈরি একটি মিনার বা পিলার। সাধারণ ভাবে এক একটি অবেলিস্ক এক একটি গোটা পাথর থেকে তৈরি হয়। অর্থাৎ সব অবেলিস্ক ই এক একটি monolith। অবেলিস্ক গুলি বানাতে বানাতে যদি কোন ভাবে পাথরে ফাটল দেখা যেত বা ভুল কোন লেখা হয়ে যেত, তাহলে সেই পাথরের পিলারটি সম্পূর্ণ ভাবে বাতিল করা হত। অবেলিস্ক, রাজাদের নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের একটা প্রক্রিয়া মাত্র। যত ক্ষমতাশালী রাজা, তত বড় অবেলিস্ক। অবেলিস্ক সাধারন ভাবে মন্দিরেই থাকত। প্রাচীন ভারতে যেমন মন্দিরের চূড়া বা মসজিদের মিনারকে লম্বা হতে দেখা যায়, তেমনি মিশরে অবেলিস্কের লম্বা হবার রীতি ছিল।এর কারণ অবেলিস্ক কে দূর থেকে দেখে পথ চলতি মানুষ বুঝতে পারবেন যে ওইখানে একটি মন্দির আছে, ফলে রাতে থাকার জায়গা ও খাবার দুই ই পাওয়া যাবে। প্রতিটি অবেলিস্ক কোন রাজা বা রানীকে উৎসর্গ করে তৈরি করা হত। তাঁদের সবার কীর্তি অবেলিস্কে লেখা থাকত।কারনাক মন্দিরে রানী হাতসেপ্সুত ও তাঁর বাবা থুতমস দ্বিতীয়ের অবেলিস্ক রয়েছে। রানী হাতসেপ্সুতের অবেলিস্ক টি আজও এত সুন্দর ও নিখুঁত যে মনে হয়, computer এর print করা মনে হয়। তিনি নিজের বাবাকে সম্মান দেখানোর জন্য, নিজের অবেলিস্কটি একটু ছোট করে তৈরি করেন। অবেলিস্ক গুলি সব গোলাপি রঙের granite পাথরের তৈরি।তাই প্রতিটিই একটু লালচে বা গোলাপি রঙের দেখতে। এই পাথরগুলি খুব সম্ভবত লাক্সরের কাছে আসয়ান বা Aswan থেকে নিয়ে আসা।অবেলিস্ক, কারনাক মন্দিরের ভিতরকারনাক মন্দির যখন তৈরি করা হয় তখন তার ছাদ ছিল। তবে আজ আর সে বর্তমানে নেই, তবে তার কিছু আভাস আজও পাওয়া যায়। ছাদ থাকায় মন্দিরে সরাসরি সূর্যের আলো প্রবেশ করার উপায় ছিলনা, তাই মন্দির দেওয়ালে জানলা করা হত। সাধারন ভাবে মরুভুমি অঞ্চলে বাড়িতে জানলা থাকেনা, তাই কারনাক এর মন্দিরের গায়ে জানলা থাকায় আলো আসার কথাটিই মাথায় আসে। সেই জানলা আজ ও বর্তমান। আর এই জানলাগুলি ছিল অনেক উঁচুতে ফলে আশা করা যায় শুধু আলর জন্যই এগুলি বানানো।এই মন্দিরে বিশাল আকৃতির পিলার দেখতে পাওয়া যায়। তার প্রতিটির মাথায় বিভিন্ন কারুকাজ করা। এই উঁচু পিলার গুলির জন্যই এই মন্দিরকে hypostyle pillar temple বলে। তবে এটিকে শুধু মন্দির না বলে মন্দির গুচ্ছ বলা উচিত।কারনাক মন্দিরে, পিলারের উপরে রঙিন হিয়েরগ্লিফ লেখা।এই মন্দিরের দেওয়ালে, পিলারে বা ছাদে ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় রঙ্গিন ছবি আঁকা ছিল। আজও কিছু অংশে সেই সব ছবি কিছুটা হলেও দেখা যায়।অপূর্ব সব প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার । যা আজ থেকে প্রায় ৪০০০ হাজার বছর আগে আঁকা হলেও অমলীন। আর প্রতি পিলারে হিয়েরগ্লিফের লেখা। এ সব দেখে একটাই প্রশ্ন মাথায় আসে যে, মিশরীয়রা এত কি লিখেছিলেন? এত কি কথা থাকতো বলার জন্য।ছাদের অংশ বিশেষ এতটাই উঁচুতে যে ক্যামেরা বন্দি করা প্রায় অসম্ভব। তবুও চেষ্টা করে গেছি। আর খালি অবাক হয়েছি যে এত সুন্দর রঙের ব্যবহার ওঁরা শিখল কথা থেকে। কি করে বুঝল যে এই সব রঙ লাগালে তা থাকবে হাজার হাজার বছর। জানি না, তবে প্রশ্ন থেকেই যায় মনের মধ্যে।এই সব দেওয়াল চিত্র বা hieroglyph এর মধ্যে একটি চিত্র বার বার চোখে পরতে লাগল । একটি হাঁস জাতীয় পাখির উপর লাল রঙের গোল সূর্য । মিশরীয় ভাষায় যাকে বলে সা-রা (Sa-Ra) । যার প্রকৃত অর্থ Son of God Raa বা সূর্য দেবের পুত্র।প্রাচীন মিশরের প্রধান আরাধ্য দেবতা ছিলেন সূর্যদেব বা রা। তাই মিশরের রাজারা সবাই নিজেদের সেই দেবতার পুত্র বলে পরিচয় দিতেন। এই ধরনের অভ্যাস বোধহয় পৃথিবীর সব সভ্যতাতেই দেখা যায়। যেমন ভারতে সম্রাট অশোক নিজেকে দেবতার প্রিয় , শ্রী প্রিয়দর্শী (Devanam piya , Piyadassi) বলেছেন। বা পরবর্তী সময়ে আরও অনেক সম্রাটদেরই এই রকম পদ্ধতি গ্রহন করতে দেখা যায় । এর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাহল, এর দ্বারা রাজারা প্রজাদের কাছে নিজেদের গ্রহন যোগ্যতা তৈরি করতেন।এই মন্দিরের ভিতরে একটি বড় জলাশয় আছে। মরুভুমির মাঝে অত বর জলাশয় দেখে বঝা যায় যে রাজারা প্রজাদের খেয়াল রাখতেন। এই জলাশয়ের পাশে একটি বড় পাথর আছে , যার আকার খানিকটা Scurb বা মিশরীয় দেবতা খেপরীর মত। লোকমত অনুযায়ী এই খেপরী কে ছুঁয়ে যদি ৭ বার ঘোরা যায় তাহলে মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়, কারন খেপরী হলেন মিশরীয়দের ভাগ্য দেবতা। এর জন্যই যে কোন সমাধি ক্ষেত্রে খেপ্রির ব্যবহার চোখে পরার মত। এর সাথেই দেখা যায় বড় বড় চওড়া দেওয়াল, যাতে অপূর্ব কারুকাজ করা বা লেখা। আসলে মিশরীয়দের হিয়েরগ্লিফ লেখা গুলি ত ছবির মতই দেখতে, তাই কারুকাজ, না ছবি, না লেখা বুঝতে ভুল হয়ে যায়। আর আশ্চর্য হই এই ভেবে যে লৌহ যুগের আগে কিভাবে এত নিখুঁত কাজ করা সম্ভব।কারনাক মন্দিরের দেওয়ালএরপর আমরা পৌঁছলাম লাক্সর মন্দিরে। বর্তমান শহরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এই মন্দির আর মনে হচ্ছে যেন প্রাচীন ও আধুনিক যুগের মধ্যে যোগাযোগ সুত্র তৈরি করছে। সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই এক টানে নিয়ে যাবে ৪০০০ বছর আগে।চোখের সামনে ভেসে উঠবে ফারাওদের সময়কাল। আসলে মিশরে বেড়াতে আসার পুরোটাই যেন Time Machine এ চড়ে ঘুরে বেড়ানো। আর সেই যাত্রায় সাহায্য করবে পাশ দিয়ে বয়ে চলা নীল নদ।লাক্সর মন্দির সন্ধ্যের আলোয়এই মন্দিরে ঢুকতেই দেখতে পেলাম একটি রাস্তার মত অংশ সদ্য আবিষ্কৃত হয়ে পরে রয়েছে। জানলাম এই রাস্তা টিকে বলা হয় স্ফিংক্স রাস্তা বা Sphinx Avenue। এই রাস্তার উপর এখনও ঐতিহাসিকরা কাজ করছেন। রাস্তাটির দুই পাশে আজ অবধি ২৪৮ টি স্ফিংক্স এর মূর্তি পাওয়া গেছে এবং খনন কাজ এখনও চলায় আরও পাবার সম্ভবনা আছে। জানা গেল যে প্রাচীন কালে কারনাক ও লাক্সরের মন্দির দুটি এই রাস্তা দিয়ে যুক্ত ছিল। বছরে একবার উৎসব হত ১৪দিন ধরে। অনুষ্ঠান শুরু হত কারনাক এর মন্দিরে আর শেষ হত লাক্সরে। এই রাস্তা দিয়েই তখন উৎসবের মিছিল চলত। কিন্তু বর্তমানে এর অনেকটা অংশ ঢাকা পরে গেছে, ফলে তার উপর বাড়ি, শহর মানুষজনের বসতি শুরু হয়ে গেছে আর মানুষ ভুলে গেছে এই রাস্তার কথা। হয়ত হাওয়া তে কান পাতলে এখন উৎসবের শব্দ, ছেলে মেয়েদের হাসি শোনা যাবে, তবে আজ আর তাদের কথা শোনার সময় নেই কারোর। নিজেদের স্মৃতি নিয়ে একাই বসে আছে স্ফিংক্সগুলি।মন্দিরে ঢোকার আগেই একটা ছোট মন্দির দেখলাম। একজন দেবী দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু মূর্তির মাথা নেই। দেবীর পোশাক দেখে মনে হয় যে কোন গ্রীক বা রোমান দেবী। শুনলাম দেবী হলেন Aphrodite, গ্রীকদের সৌন্দর্য ও বিদ্যার দেবী। এটি দেখে বোঝা যায় যে, রোমানরা এই অঞ্চলে এসে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছিলেন। মিশরীয় শিল্পের সাথে মিলিয়ে তাদের শিল্পকেও স্থান দেবার চেষ্টা করেছিলেন। তাতে খুব একটা সফল হতে হয়েছিলেন সে কথা বলা শক্ত।লাক্সর মন্দিরের ভিতরলাক্সরের মন্দিরেও রামেসিস দ্বিতীয়র অবদান খুব স্পষ্ট। এই মন্দিরের ভিতরে একটি মসজিদ আছে। এটি বহু পুরনো, যবে থেকে আরবরা এই অঞ্চল দখল করেন, সেই সময় থেকে এটি আছে। আজও সেখানে প্রার্থনা হয়। আমাদের সামনেই শুরু হল সন্ধ্যের আজান। তৈরি হল এক অদ্ভুত অনুভুতি। বাড়ি থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে, সুদূর মিশরে, নীল নদের ধারে ৪০০০ বছর পুরনো লাক্সর মন্দিরে বসে সূর্যাস্ত দেখা আর সাথে মিঠে আজানের সুর। একেই বোধহয় বলে সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের উদাহরণ । পরিবেশ টা হয়ে উঠল মহময়ী। সূর্যাস্তের কমলা আভা সারা আকাশ জুড়ে, আর পূব আকাশে আঁধারের ঘোরে ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে বাঁকা চাঁদ। পাশের নীল নদ সন্ধ্যের কমলা কালো রঙ মেখে বয়ে চলেছে নিজের ঠিকানায়। সেই মুহূর্তে শতাব্দী প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার মন্দির, যাকে পারথেনন বলেও ভুল হয়, সেখানে আজানের সুরে আর পাখির গানে সন্ধ্যে নামছে। আর সারা পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এক সাথে গ্রীক-রোমান, মিশরীয়, ইসলামীয় আচারের মিশ্রণ। কি যে অদ্ভুত এই মিশ্রণ সে না দেখলে বোঝা যাবেনা।লাক্সর মন্দির আমন দেব ও তাঁর স্ত্রী দেবী মুট এর জন্য উৎসর্গিত। এই মন্দিরের মধ্যে ফারাও তুত-আঙ্খ-আমন ও তাঁর স্ত্রী আঙ্খ-সে- আমন এর মূর্তি দেখলাম। মূর্তি দুটি মার্বেল পাথরের তৈরি, তবে সমান উচ্চতার। এর থেকে বোঝা যায় যে রাজা অত্যন্ত উদার মনের। কারন মিশরে পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ বলে রাজা ও রানীর মূর্তিতেও উচ্চতার ফারাক রাখা হত। রানীর মূর্তি হত উচ্চতায় ছোট আর সাধারণ ভাবে রাজার পাশে রানীর বসার ব্যবস্থা থাকতনা।এই মন্দিরে খুব স্পষ্ট দেবী Sashet এর মূর্তি দেখলাম। এই দেবী মিশরীয়দের বিদ্যা আর কারিগরি বিদ্যার দেবী। খানিকটা ভারতীয় দেবী সরস্বতীর মত।এখানে দেখলাম রামেসিস দ্বিতীয়র মূর্তির পিছনে তাঁর অবেলিস্ক টি, মূর্তিটিকে যেন সহায়তা করছে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য। মন্দিরের ভিতরের অংশে রঙ দিয়ে আঁকা ছবি দেখা গেল। কিছু ছবিতে, ইউরোপীয় ধাঁচ লক্ষ্য করা যায়। বোঝা যায় যে রোমানরা এখানে এসে এদের ধর্ম কে মুছে ফেলতে চেয়ে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার করতে চেয়েছেন। তবে কত টা সফল হয়েছে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। শিল্প ও ধর্মের ক্ষেত্রে এই অদ্ভুত আচরণ সারা পৃথিবীতেই বিভিন্ন সময়ে দেখা যায়। মানুষ হয়েও এত বর্বর আচরন ভাবা যায়না। বা হয়ত বলা উচিত মানুষ বলেই এতটা অনাচার করতে পেরেছে ও সহ্য করতেও পেরেছে। তবে আজ আমরা একে যেভাবে দেখছি, সেটি একটি অন্য এক রূপ প্রকাশ করছে। মিশরীয় দেবতার মন্দিরে একদিকে মসজিদে শোনা যায় আজানের সুর, অন্যদিকে যীশু উঁকি দেন দেওয়ালের ফাঁকে। দেবতায়- ঈশ্বরে কোন ভেদ নেই, ভেদাভেদ শুধু মানুষের মনে, আর মনের মধ্যে। তাই বোধহয় দেবতারাও আজ মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছেন আমাদের থেকে।কিছু সুন্দর মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে ফিরে এলাম আমাদের নৌকাতে। মনের মধ্যে শুধু জ্বলতে থাকল লাক্সার মন্দিরের ভিতরের পরিবেশ। মনে হতে লাগল, যদি হতে পারতাম ওদের দলের একজন, থেকে যেতাম এই শহরেই, জীবনের বাকি অংশটা কাটিয়ে যেতাম।

ডিসেম্বর ০৩, ২০২২
নিবন্ধ

নতুন জীবন (ছোট গল্প)

সময় মানুষকে ভাবতে শেখায়, নতুন কিছু করতে শেখায়। জীবনের স্রোতে অনেক আপনজন দূরে সরে যায় আবার অনেক দূরের মানুষ কাছের হয়ে ওঠে। মানুষের মনে অনেক সময় দ্বন্দ্ব চলে আপনজনের দূরে চলে যাওয়ায় দুঃখ করবে না নতুন যাকে আপন করে পেল তাকে নিয়ে আনন্দ করবে।আমার গল্পের প্রধান চরিত্র অসীমা দেবীর মনেও এই মূহুর্তে সেরকমই চলছে।ফোনে কথা বলার পর চুপচাপ বসে আছেন চোখের কোলে জল অথচ মুখে যেন নিজের মত প্রকাশের আনন্দ। এমন সময় তিতাস এসে জিজ্ঞাসা করলো কে ফোন করেছিল মা? দাদা?আবার সেই বাড়ি বিক্রির কথা বলছিল? তুমি আজ বলে দিয়েছো তো? এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।তোর কি মনে হয়? আমি বলতে পারবোনা?আজ আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছি আমাকে নিয়ে তোদের এত চিন্তা করতে হবে না। আমার জন্য টাকাও পাঠানোর দরকার নেই। আমি যেটুকু পেনশন পাই তাই দিয়ে আমার একার চলে যাবে। আর আমার বাড়ি আমি কি করব সেটা আমি বুঝে নেব। তোমাদের ও নিয়ে ভাবতে হবে না।ওরা আসবে দেশে সামনের সপ্তাহে; এবার এখানে থাকবে বলছিল, আমি বলেছি এখন তো ঘর নেই তোমাদের থাকার মত , তোমরা বরং হোটেলেই উঠো না হলে বৌমার বাপের বাড়িতে। আমার সব ঘরে এখন মেয়েরা থাকে। কথা শুনে মনে হল একটু রেগে গেল, তা যাক গে। আমার নামে যখন বাড়ি তখন আমি বুঝে নেব।এই মেয়ে গুলো না থাকলে দুবছর আগে কোরোনা কালে আমার কি হতো একবার ভাব। আর তোর বাবা যখন হঠাৎ রাত্রি বেলা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তখন তো এই মেয়েরাই অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হসপিটাল নিয়ে যাওয়া চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সব করে ছিল। তুই খবর পেয়ে তারপর তো এলি, আর তারা তো টাকা পাঠিয়ে দায়িত্ব মুক্ত। তোর বাবাকে বাঁচাতে পারিনি সেটা অন্য ব্যাপার কিন্তু এরা প্রতি মূহুর্তে আমাকে যেভাবে সাহায্য করছে আমি এদের কাছে ঋনী।তোর মনে আছে তোর দাদা বিদেশ চলে গেল তখনই কেমন ফাঁকা লাগত বাড়িটা? তুই তখন কলেজে পড়ছিলি। সারাদিন কলেজ তারপর পড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকতিস। মাঝে মাঝে তোর বন্ধুরা আসলে আমার খুব ভালো লাগত। তারপর তুই পাশ করে চাকরি নিয়ে চলে গেলি। একে একে তোদের দাদু, ঠাম্মা ও চলে গেলেন তখন বাড়িটা গিলে খেতে আসত। যদিও তোদের বাবা ততদিন রিটায়ার্ড করে গেছে, তবুও দুই বুড়ো বুড়ি আর কতক্ষণ ভালো লাগে। ঠিক সেই সময় তোর বন্ধু বিতানের দিদির কথা তুই আমাকে ফোন করে জানালি। আমার তখন মনে হলো ঈশ্বর যেন ওকে পাঠিয়েছিলেন আমাদের একাকিত্ব কাটানোর জন্য। তখনই আমি আর তোর বাবা ঠিক করলাম আমরা উপরে থাকব আর নিচের ঘর গুলোতে মেয়েদের পেয়িং গেস্ট রাখবো,সেই শুরু। তারপর তোর বাবার অসুখের সময় মেয়ে গুলো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমাকে একমূহূর্ত একা ছাড়েনি। তুই তো দেখেছিস। তোর দাদা তো উনি চলে যাওয়ার পরে এলো।অথচ মানুষ টা ছেলে ছেলে করেই গেল। আর সেই যে ছেলে গেল আর এমুখো হয়নি। আমার যখন গলব্লাডার অপারেশন হলো তখন তো তোরা কেউ ছিলি না। আমাকে তো এই মেয়েরাই পালা করে করেছে সব। মায়ের মুখে এই কথা শোনার পর তিতাসের মুখটা কালো হয়ে গেলো। মাকে জড়িয়ে ধরলো।অসীমা দেবী বলতে থাকেন, এই মেয়েরা না আসলে জীবনের মানেটাই বুঝতাম না। আমারও যে গুন আছে আমিও যে কিছু করতে পারি জানতাম না। তোর দাদু ঠাম্মা তো আমি যে কিছু করতে পারি বোঝেই নি বা বুঝলে ও স্বীকার করেননি। আর তোর বাবাও তাই। আমি সারাজীবন শুনে এলাম আমি নাকি অকম্মা।তোরা ছেলে মেয়েরাও কোনো দিন বলিসনি কিছু। অথচ কোরোনার সময় যখন আমি ওদের রান্না করে খাওয়াই তখন ওরা বলে আমি নাকি অসাধারণ রান্না করি। টিনা বলে যে মেয়েটিকে আমি এখানে থাকতে বলি। হঠাৎ লকডাউন হওয়ার ফলে বাড়ি যেতে পারে নি আবার যেখানে থাকত তারাও থাকতে দেয়নি। আমি তখন ওর বন্ধু দিয়াকে বলি আমার এখানে নিয়ে আসতে।ও এসে আমার রান্নার প্রশংসা শুনে বলে ইউটিউবে চ্যানেল খোলার কথা।সব ওই ব্যবস্থা করে দেয়। প্রতি সপ্তাহে একটা করে রান্না করতে থাকি। না বিশেষ কিছু নয়, আমার ঘরে যা আছে তাই দিয়ে চটজলদি অন্যরকম কিছু রান্না। ওরা সব রেডি করে। আমি শুধু রান্না করি। লকডাউনে অল্প সামগ্রী দিয়ে অনেক কিছু করতে শিখেছি্ আর সেগুলো ইউটিউবে ওরা দিয়েছে। আজ আমার সেই চ্যানেল কত মানুষ দেখে। কতজন কতকিছু শিখতে চায়। আমি নতুন করে বাঁচতে শিখেছি। আমি এসব ছেড়ে সব বিক্রি করে ওদের হাতের পুতুল হতে পারব না।আমি তাই ঠিক করছি নিজের জন্য দুটি ঘর রেখে পুরোটাই মেস করে দেব।আর যারা বাইরে থেকে পড়তে আসছে অথচ টাকার ও অভাব আছে তাদের জন্য আমার এখানে বিশেষ সুবিধা থাকবে।মায়ের এই কথা শুনে তিতাস ও খুব খুশি হয়। মাকে বলে তোমার এই উদ্যোগে আমি তোমার পাশে আছি। এমন সময় পাওলি আর মধুরা আসে। ওরা চাকরি করে। ওরা কিছু টা কথা শুনতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে কিসের উদ্যোগ নিচ্ছেন জেঠিমা?তিতাস ওদের সব খুলে বলে। ওরা তখন বলে আমরাও আছি আপনার সাথে সবসময়।অসীমা দেবীর মুখ আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। ওদের সবাই কে জড়িয়ে ধরে বলেন ওরে কোরোনা অনেকের অনেক ক্ষতি করেছে আর আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে।শ্রীমতি রাখি রায়বর্ধমান

নভেম্বর ২৭, ২০২২
নিবন্ধ

ফারাও এর দেশ ঘুরে... (ভ্রমণ কাহিনী) চতুর্থ পর্ব

আগের রাতের ফালাফেল আর কোশারি খেয়ে রাতে স্বপ্ন দেখলাম আমি ফারাও খুফুর কাছে কাজ করি। আমায় তাঁর পিরামিড বানানর কাজে লাগান হয়েছে। শয়ে শয়ে শ্রমিক কাজ করে চলেছে। ঠিক যেমন Cleopetra ছবিতে দেখান হয়েছিল। আমাকে কি সব শক্ত অঙ্ক করার কাজ দেওয়া হয়েছে, যথারীতি সেটি না পারায় ক্ষুব্ধ খুফু আমার মৃত্যু দণ্ড দিচ্ছেন। এই অবধি দেখেই ভয়ে চোখ খুলে গেল। আর দেখলাম সকাল হয়ে গেছে, বুঝলাম গত রাতে খাবারটি একটু গুরুপাকই হয়েছিল। ভেবে হাসিও পেল আর একবার তখন ইচ্ছেও হল খুফুর সমাধির সামনে গিয়েই না হয় আরেকবার দাঁড়ানো যাক।যা ভাবা তাই কাজ, সকালের আলোতে পিরামিড দেখব বলে চলে গেলাম গিজা চত্ত্বরে। এই বারে অনেক বেশি সময় নিয়ে গেলাম। তবে দ্বিতীয় বারেও উৎসাহ কম হলনা। এবারে খুফু পিরামিডের উপর খানিকটা উঠলাম। যেখান দিয়ে এখন পর্যটক রা ভিতরে যেতে পারেন। তবে এতি মোটেও পিরামিডটির আসল দরজা নয়। এটি বোধকরি ডাকাত বা পিরামিডের লুটেরারা বানিয়েছিল। আসল দরজা অনেকটা উপরে । সেখান পর্যন্ত পৌঁছন বেশ কঠিন। ভাবতে অবাক লাগে যে ওই সময়ে কি করে এত বড় একটা পিরামিড বানাল । আর এটা দেখতে দেখতেই মনের মধ্যে প্রশ্ন পাক খেয়ে ওঠে, যে এত বড় একটা সৌধ সেই সময়ে বানানর জন্য বহু পরিমানে শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। আর খুব অত্যাচারী রাজা না হলে সেই বিশাল সংখ্যক শ্রমিক কে পরিচালনা করাও সম্ভব নয়। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই রাজা খুফু অত্যাচারী ছিলেন।ফারাও খুফুর পিরামিডএরপর আমরা খুফু পিরামিড এর পাশেই তিনটি সোলার বোট রাখার জায়গা দেখতে গেলাম। এর প্রতিটির আকার একদমই নৌকার মত । যা থেকে বোঝা যায় যে ওখানে নৌকাই রাখা হত। তবে এই নৌকা গুলির অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে সেগুলিকে সংরক্ষন করা যায়নি, শুধু মাত্র একটিকে, একটি জাপানী সংস্থা নিয়ে গেছে সংরক্ষন এর চেষ্টায়। খুফু পিরামিডের পিছনেই তিনটি রানিদের পিরামিড আছে। সেগুলির অবস্থা যদিও খুব ভাল নয়, তবুও তার একটির মধ্যে আমরা ঢুকলাম।গিজা চত্ত্বরে রানীদের তিনটি পিরামিদ। প্রায় ভেঙ্গে পরেছে, তাও ভিতরে যাওয়া যায়এগুলিতে ঢোকার জন্য আলাদা টিকিট লাগেনা। এগুলিও এই চত্ত্বরের বাকি পিরামিডগুলির মত ফাঁকা। তবে এর ভিতরে যাবার পথ টি বেশ কঠিন । পথ টি খুব সরু আর অনেকটা নীচে নামতে হয়। নীচে যেখানে দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা, সেখানে গেলে বোঝা যায় যে সেটি পিরামিডের ঠিক মাঝের অংশ। এখানে একটি বেদী মত করা আছহে যেখানে মমি কে রাখা হত। সেই জায়গায় দাঁড়াতে কেমন যেন মনে হল স্বর্গ থেকে রানী নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন তাঁর সমাধিতে আমাদের প্রবেশ।এর পাশেই রানী নেফেরথারির মন্দির রয়েছে । আমরা সেখানে গেলাম। এই মন্দিরে বেশ কয়েকটি ঘর রয়েছে। নেফেরথারি, পুরনো সাম্রাজ্যের একজন প্রধান রানী ছিলেন।মনে হল, যে সব রানীদের পিরামিডগুলি দেখলাম, তার মধ্যে রানী নেফেরথারির পিরামিড নিশ্চয়ই থাকবে। তবে কোন লিখিত কিছু নেই বলে হয়ত বোঝা যাচ্ছেনা।এরপর আমরা আবারো ফারাও খাফ্রেনের পিরামিড এর কাছে গেলাম। এই পিরামিডের সামনেই আছে রাজার mortuary temple । এই মন্দির এর পুরটাই প্রায় ভেঙ্গে গেছে, তবে অতীত এর সাক্ষী রূপে দাঁড়িয়ে আছে তার বড় বড় পিলার গুলো। যখন এর বিশালত্ত্বে অবাক হচ্ছি, তখন শুনলাম যে এই মন্দির বানানোর সময় আগে পিলার গুলি বানিয়ে নেওয়া হত। তারপর পিলার এর মাথা পর্যন্ত বালি দিয়ে ভর্তি করে দেওয়া হত । বালি ভরতি অবস্থায় মন্দিরের ছাদ ঢালাই করা হত। ছাদ শক্ত হয়ে গেলে ভিতরে জমানো বালি সরিয়ে নেওয়া হত। অভিনব পদ্ধতি। আজকের দিনে যেমন ভাড়া বেঁধে ঢালাই হয়, তার ই প্রাচীণ পদ্ধতি মনে হল। তবে এটা ঠিক যে এই সমস্ত কাজের জন্য বিপুল পরিমানে লোকবল থাকা প্রয়োজন। এর থেকেই বোঝা যায় যে মিশরীয় রাজারা প্রচুর সংখ্যায় ক্রীতদাসকে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করত।ফারাও খাফ্রেন এর Mortuary Templeএরপর আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম সেই স্ফিংক্স এর সামনে। আগের দিন বিকেলের আলোতে ওঁর পুরো গরিমা ঠিক বুঝতে পারিনি। আজ পারলাম। এই স্ফিংক্স ই সগর্বে ঘোষণা করেন , I have seen Alexander, I have seen Ceaser, and Napoleon । কি সাংঘাতিক ঘোষণা, তবে প্রতিটি কথাই সত্যি। মিশরীয় মতে এই স্ফিংক্স এর ক্ষমতা প্রচুর।তাই জন্যই সব রাজা বা ক্ষমতাশালী রানী দের স্ফিংক্স মূর্তি পাওয়া যায়। আর পিরামিডের সামনে এর অবস্থানের কারণ হতে পারে পিরামিড কে সুরক্ষিত রাখা। তবে বর্তমানে বোঝা যায় যে রক্ষা করার কাজ টি স্ফিংক্স পারেন নি। কারণ সেখানে বাজে বুদ্ধি সম্পন্য মানুষের দৃষ্টি পরেছিল। এই গ্রেট স্ফিংক্স , রাজা খাফ্রেন এর মুখের আদলে তৈরি হয়েছিল । তবে পরবর্তী সময়ে স্ফিংক্স এর গর্ব কে চূর্ণ করার জন্য কোন এক রাজা তাঁর নাক ও মাথার মুকুট ভেঙে দেন । কিন্তু তাতে কি, সেই রাজা কে আজ হয়ত ইতিহাস বা মানুষ কেউ মনে রাখেনি, রেখেছে স্ফিংক্স কে। আর যত দিন পৃথিবীতে মানুষ থাকবে, ততদিন মানুষ তাঁকেই মনে রাখবে। ইতিহাসের যেন জ্বলন্ত সুত্র এই স্ফিংক্স । শোনা যায় ব্রিটিশরা মিশরে কাজ করার সময়ে নাকি স্ফিংক্স এর নাক টি খুঁজে পান। তারপর সেটি ইংল্যান্ড এ নিয়ে যান ও বর্তমানে সেটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে।গ্রেট স্ফিংক্সস্ফিংক্সকে শেষ বারের মত কুর্নিশ করে আমরা বিদায় নিলাম। প্রতিজ্ঞা করে এলাম যে আবার ফিরে আসব। হতে পারে তার জন্য বছর বছর অপেক্ষা করতে হল। তবে তাতে কি, তাঁর কাছে ফিরে আসার জন্য কোন সময়ই বেশি নয়। আর ফিরে আমায় আসতেই হবে।শ্রেয়া ঘোষ (বর্ধমান)ক্রমশ...

নভেম্বর ২৬, ২০২২
নিবন্ধ

ফারাও এর দেশ ঘুরে... (ভ্রমণ কাহিনী) তৃতীয় পর্ব

পরের দিনের প্রথম গন্ত্যব্য হল Cairo Museum। সত্যি কথা বলতে এত বড় মিউসিয়াম আমি আগে দেখিনি। শুনলাম এই মিউসিয়াম ভাল ভাবে পুরোটা দেখতে হলে প্রায় এক সপ্তাহ লাগবে। অত সময় আমাদের নেই, বোধকরি আমাদের মত যারা এখানে বেড়াতে আসেন তাদের সবার ক্ষেত্রেই এক সমস্যা ঘটে। তাই আমাদেরও ইচ্ছে যে অল্প সময় যতটা বেশি দেখে নেওয়া যায়। এই মিউসিয়াম ১৫০ থেকে ২০০ বছরের পুরনো। এটি দুটি তলায় ভাগ করা। নীচের তলায় সময়কাল ধরে (period wise) ঘর সাজানো রয়েছে, যেমন Old Kingdom, Middle Kingdom, New Kingdom ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় তলায় ঘর সাজান হয়েছে বিভিন্ন বিষয় অনুযায়ী, যেমন sarcophagus room, animal mummy room ইত্যাদি। তার মধ্যে দুটি ঘর হল বিশেষ আকর্ষণীয়, - Pharao Tut-Ankh-Amun এর ঘর, আর Royal Mummy room।কায়রো মিউজিয়ামমমি রুম ভাবতেই মনে পড়ে গেল, একটি বই এ পড়া সেই বিচিত্র অংশটির কথা। তখন ১৯ শতকের সময়। মিশর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ।সেই সময় থেকেই মমির খোঁজ চলছে। রাজা বা ফারও দের মমি না হলেও যে রকমই মমি হোক না কেন তাকে সমাধি থেকে বের করে আনা হচ্ছে, পরীক্ষা করা হবে এই অজুহাতে। জাহাজ ভর্তি মমি ও অন্যান্য সামগ্রী চলে যাচ্ছে ইউরোপ। প্যারিসেও যেত মমি সেই সময়। প্যারিসের বিভিন্ন বাড়িতে সেই মমিকে দেখার জন্য টিকিট কাটা হত। যেন সার্কাস হচ্ছে। ভাবলেই কেমন মনে রাগ জন্মে যে, অসহায় একটি মমি, সে যে মানুষেরই হোক না কেন, শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে আছে, তাকে সবার সামনে দেখানটাই যেন ছিল গর্বের। আবার ইংল্যান্ডে যৌবন ধরে রাখার জন্য কোন মানুষ নাকি বিচার দিয়েছিলেন মমি গুঁড় করে ট্যাবলেট বানিয়ে খাবার। তাই হাজার হাজার মমি ইংল্যান্ড নিয়ে আসতো, তাদের গুঁড়ো করা হত আর বিভিন্ন লতাপাতা মিশিয়ে বড়ি বানিয়ে খেত। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি যে কি পরিমানে ইতিহাসের অবলুপ্তি ঘটেছে সেই সময়, আর কি পরিমান কুসংস্কারে ভরা ছিল তখনকার ইউরপীয়দের মন। কি ভাবে সমস্ত সুত্র কে নষ্ট করা হয়েছে শুধুমাত্র মজার খাতিরে। যেমন নষ্ট হয়েছে আমাদের সাঁচি স্তুপ বা অমরাবতি স্তুপ। তাতেও শিক্ষিত ইউরোপিয়ানরা যা সংগ্রহ করেছেন, তা এই মিউসিয়ামে আছে। মমি রুম এ যাবার আগে তাই বার বার এই কথা গুলোই মনে পড়ছিল।মিউসিয়ামে ঢুকতেই প্রথমেই চোখে পড়ে রসেত্তা পাথরটি। এই পাথরটি খুব সাধরন দেখতে কিন্তু এর ক্ষমতা সত্যি ই অসাধারন। তবে কায়রো মিউজিয়ামে যেটি আছে,সেটি একটি replica, আসল পাথরের অংশটি লন্ডনে আছে। এর গল্প হয়ত অনেকেই জানে। আর যারা জানেনা তাদের জন্য বলি, এই পাথরটি প্রথম আবিষ্কার হয় ১৭৯৯ সালে। সেই সময়ে ফ্রান্সের সম্রাট নেপলিয়ান মিশরে যুদ্ধ করছিলেন। তাঁরই এক সৈন্য এটি খুঁজে পায়। এটি হয়ত তখন রাশিদ বা রসেত্তা নামের একটা শহরের কোন মন্দিরের দেওয়ালে পিলার হিসেবে ছিল। খেয়াল করে দেখা যায় সেখানে কোন একটি বিশেষ বার্তা তিনটি ভাষায় লেখা আছে। প্রথমটি মিশরীয় হিয়েরগ্লিফ, তারপরে দেমতিক (Demotic) আর শেষে গ্রীক। এই পাথরটি আবিষ্কার হবার পরই মিশরের ভাষা কে পাঠ করার চেষ্টা শুরু হল। ফ্রান্সের পর এই অঞ্চল যখন ব্রিটিশদের দখলে আসে তখন তারা এই পাথর নিয়ে লন্ডন চলে যান। আর সেখানেই পাঠোদ্ধার পর্ব শুরু। আর সেই দিন থেকে মানে ১৮০২ সাল থেকে ওই পাথর লন্ডনে আর ১৮২২ নাগাদ একজন ফ্রেঞ্চ লিপি বিশারদ পাঠোদ্ধার সম্পূর্ণ করেন। এই মিউসিয়ামে তার একটা replicaআছে, আরও একটা replica, আলেক্সান্দ্রিয়া তে রাখা আছে, যে অঞ্চল থেকে আসলে এই পাথরটিকে খুঁজে পাওয়া যায়।রসেত্তা পাথরে তিন ভাষার লিপিফারাও Tut-Ankh-Amun এর জন্য একটি বিশেষ ঘর আছে, সেই ঘরটিতে ছবি তোলা নিষেধ। সেই ঘরটিতে Howard Carter এর খুঁজে পাওয়া প্রায় সব জিনিসই আছে। শুধুমাত্র ফারাও এর মমি করা দেহ আর তার একটি কফিন বা সারকাফাগাস রয়ে গেছে আসল সৌধ তে, যা আছে Valley of Kings এ। এই বিশেষ ঘরটি ফারাও এর সৌধ থেকে পাওয়া ৪০৩০ টি জিনিস দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। ফারাও এর মমি করা দেহ থেকে ২০০ রকমের গয়না পাওয়া গেছে। সেগুলির বেশীরভাগই সোনা দিয়ে তৈরি। সোনার সাথে কিছু আধা-মুল্যবান (Semi-Precious) পাথর দিয়ে তৈরি। তার মধ্যে Carnelian বা Lapis Lazuli র ব্যবহার চোখে পড়ার মত। আমাদের হরপ্পা সভ্যতাতেও এই দুই পাথরের ব্যবহার বিশেষ ভাবে চোখে পরে, তার থেকে আবার আমরা এই সত্যে উপনীত হই, যে এই সমকালীন সভ্যতাগুলির মধ্যে যোগাযোগ ভাল ভাবেই রক্ষা করা হত। আজকের দিনে দাঁড়িয়েও অবাক হয়ে যেতে হয় সেই সব গয়নার নকসা ও রঙ সমন্বয় দেখে। এই ঘরেই রয়েছে ফারাও তুত-আঙ্খ-আমন এর সেই বিখ্যাত সোনার মুখোস, যা ১১ কেজি সোনা দিয়ে তৈরি । এই মুখোস দেখলে সত্যিই মনে হয় যে রাজা তুত খুব অল্প বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। এ ছাড়াও আছে রাজার শেষ কফিনটি বা সারকাফাগাস। এটিও নিরেট ৩ টন সোনা দিয়ে বানান হয়েছিল। রাজার ব্যবহৃত দুটি ছুরি আছে, একটি সোনার আর একটি লোহার ।এই ছুরি দুটি নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে, কারণ লোহা দিয়ে তৈরি ছুরি কি ভাবে লৌহ যুগের আগে পাওয়া যেতে পারে? এর কোন উত্তর সঠিক ভাবে জানা যায়না। কেউ বলে তখন লোহা ছিল, তখন প্রশ্ন জাগে তাহলে বাকি কোথাও তার ব্যবহার নেই কেন বা উল্লেখ ও নেই কেন? আবার কেউ বলেন পরে লৌহ যুগে কেউ আবার করে সমাধি খুলে সেই ছুরি রেখে আসেন। এও এক প্রকারে অসম্ভব, কারন মিশরীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী সমাধিস্ত হয়ে গেলে সেই সমাধি আর খোলা হবেনা কারণ তাতে আভিশাপ লাগবে। আর যদি কেউ খোলে সে হবে সমাধি চোর। সে সব জিনিস রেখে আবার একটা নতুন অপূর্ব ছুরি রেখে সমাধি বন্ধ করে বেরিয়ে আসবেনা। কারণ কার্টার যখন সমাধি আবিষ্কার করেন তখন তার মধ্যে প্রায় সবই সাজানো ছিল আর এও বিশ্বাস করা হয় যে তা আগে কখনই বের করা হয়নি।ফারাও, তুত-আঙ্খ-আমন এর দুটি ছুরিএছাড়াও আছে রাজার রাজমুকুট, যেখানে উচ্চ মিশর ও নিম্ন মিশরের দুই রক্ষাকর্তা দেবতার মুখ বসানো। এরা হলেন একজন কোবরা সাপ ও অন্যজন শকুনি পাখি । এদের চোখ গুলি স্ফটিক দিয়ে বানানো, আজও এতটাই উজ্জ্বল যে মনে হয় আমার দিকেই তাকিয়ে আছে যেন। আর সেই দৃষ্টি যেন অত্যন্ত রোষ পূর্ণ। তীব্র রাগ জমা করা আছে সেই চোখ গুলির মধ্যে।রাজা তুত এর প্রতিটি আঙ্গুল সোনার পাত দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছিলো, এই ঘরে সেগুলিও শোভা পাচ্ছে। এর সাথে আছে রাজার বুকের উপর বসানো ছিল একটি সৌভাগ্যের প্রতীক, যা একটি গুবরে পোকার আদলে তৈরি । যাকে স্কারাব (Scarab) বা খেপ্রিও (Khepri) বলা হয়ে থাকে।Scarab বা Khepri, মিশরীয়দের সৌভাগ্যের প্রতীকএই ঘরের ঠিক বাইরে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রাজার সব কটি সারকাফাগাস। সব কটি সারকাফাগাস ই সোনার পাত দিয়ে মোড়া, ভিতরে হয় পাথর বা কাঠ দিয়ে তৈরি। আর একটি আছে নিরেট সোনার। যার ওজন ৩ টন। অসম্ভব সুন্দর দেখতে সেটি আর আজও সমান উজ্জ্বল।ফারাও, তুত-আঙ্খ-আমনের গয়না ও রাজমুকুটএ সবের সাথে আছে রাজার ব্যবহার করা একটি সোনার চেয়ার। চেয়ারটিতে সোনা ও আধা-মুল্যবান পাথর আর ফিয়ান্স (Fience an art material made from burnt silica and natural colours, specially used in ancient Egypt, Mesopotamia and Harappa) দিয়ে খোদাই করা এক অপূর্ব চিত্র। সেই চিত্রতে দেখা যাচ্ছে, রাজা তুত বসে আছেন আর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর রানী আঙ্খ-সনামন। রানীর হাতে সুগন্ধীর পাত্র। হয়ত সেই সুগন্ধী রানী লাগিয়ে দিচ্ছেন রাজার গায়ে, পরম যত্নে ও ভালবাসায়। কি সুন্দর একটি ভালবাসার ছবি ধরা রয়েছে সেই চেয়ারটিতে। আজ সেই ছবির মানুষ দুজন কেউ ই নেই, একদিন ছিলেন, তবু তাদের ভালবাসার ছবি রয়ে গেছে, যুগ যুগান্তর ধরে।সোনার সারকফাগাসএর সাথেও আছে আলাবাস্টর পাথরের তৈরি ৪ টি ক্যানোপিক জার, যার মধ্যে রাজার দেহের কিছু অঙ্গ ভরে রাখা আছে, আর সেই জার গুলিকে পাহারা দিচ্ছেন স্বয়ং দেবী ইসিস।ফারাও তুত-আঙ্খ-আমনের সোনার চেয়াররাজার সব কটি সারকাফাগাস ভাল ভাবে বন্ধ করার পর সৌধ তে বসানো ছিল, একটি কালো পাথরের বেদীর উপর, কালো পাথর ও সোনা দিয়ে তৈরি আনুবিস বা শেয়াল দেবতা। এই দেবতা হলেন পরবর্তী জীবনে যাবার দেবতা। এই হল সত্যজিতের সেই শেয়াল দেবতা।ফারাও এর সোনার সারকফাগাসের মুখHoward Carter বলেছেন যে, রাজা তুত এর সৌধতে প্রথম বার প্রবেশের সময় হঠাৎ করে আনুবিসের এই মূর্তি দেখে তিনি এক রকম ভাবে ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন। আনুবিস, রাজার পরবর্তী জীবনে প্রবেশের পথ কে সুগম ও সুনিশ্চিত করতে পাহারায় বসেছেন। সেখানে তাঁর নির্দেশ অমান্য করে, কার সাধ্যি। তবে সেই সাহস যখন কার্টার দেখিয়েছেন, সেটি যেন মোটেই আনুবিস পছন্দ করছেন না।আলাবাস্টার পাথরের ক্যানপিক জারএরপর আমরা Royal Mummy Room গেলাম। এই ঘরে ঢোকার জন্য আলাদা টিকিট লাগে। এখানে বর্তমানে ১২ টি রাজবংশীয় মমি রাখা আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ফারাও রামাসেস দ্বিতীয়, রানী হাতসেপ্সুট, বা ফারাও আমনহটেপ এর। প্রতিটি মমিই খুব সুন্দর করে সংরক্ষণ করা। কাঁচের লম্বা বাক্সের মধ্যে রাখা। বুক থেকে পা অবধি পাতলা সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। কাপড়টি দিয়েই কোন কালে সেই মমি কে বেঁধে রাখা হয়েছিল, তার ফলে কাপড়টি বেশ মলিন হয়ে উঠেছে। এই ঘরে কথা বলা নিষেধ , ছবি তোলা ত বটেই। ঘুমন্ত রাজাদের সম্মান প্রদর্শনের জন্য। এখানে ঢুকে একটা অন্য রকম অনুভূতি হয়। হাজার হাজার বছর আগেকার রাজা, সম্রাটরা আমার সামনে পরম শান্তিতে, পরম বিশ্বাসের সাথে ঘুমিয়ে আছেন। একদিন যারা সমগ্র মিশর রাজত্ব করেছেন, আজ আমার সামনে শুয়ে। ইতিহাসকে এভাবে কোনদিন চোখে দেখা সম্ভব, ভাবতে পারিনি। বিজ্ঞান ও ইতিহাস এর এত সুন্দর মেল বন্ধন দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। অবাক হবার ঘোর কাটতে একটু সময় লাগল। তারপর ঘর টি ঘুরে দেখতে লাগলাম।দেবতা আনুবিস, যিনি ফারাও তুতকে পাহারা দিচ্ছিলেনসব থেকে সুন্দর ভাবে আছে ফারাও রামাসেস দ্বিতীয়ের মমি। তাঁর সাদা চেহারা, সাদা চুল তাঁকে সত্যিই গ্রীক দেবতার সাথে তুলনা করাতে বাধ্য করে। সত্যি মনে হয় যে এমন একজন মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে রাজত্ব করলে কি অসাধারণ হবে ব্যাপারখানা। চোখের উজ্জ্বলতাতেই ভক্তি এসে যেতে বাধ্য। এখানে একটা মজার ব্যাপার জানলাম। ফারাও রামেসেস এর হাত দুটি যেন একটু খোলা অবস্থায় রয়েছে, বুকের উপর লাগানো নেই। শোনা গেল যে, ফরাসী প্রত্নত্বত্তবিদের দল যখন এই মমি আবিষ্কার করেন ও সংরক্ষণের কাজ করছিলেন, তখন হঠাৎ রাজার হাত দুটি খুলে গিয়ে সোজা হয়ে যাবার চেষ্টা করে। প্রথমে সবাই খুব পেয়ে যান, তবে পরে বোঝা যায় যে, হয়ত রাজার দেহকে মমি প্রক্রিয়া শুরু হতে দেরী হয়, তাতে মৃত শরীর শক্ত (Rigor Mortis) হয়ে যেতে থাকে।প্রত্যেকটি মমি অত্যন্ত সুন্দর ভাবে সংরক্ষিত। প্রায় প্রত্যেকটি মমির চুল, দাঁত, হাত-পা, নখ এতটাই স্পষ্ট আর পরিষ্কার যে মনেই হয়না তারা হাজার হাজার বছর আগে মৃত। এই রাজা, রানীদের দেখে বার বার একটা কথা খুব মনে হচ্ছিল যে, আমাদের দেশের ইতিহাসেও তো কত রাজা রানীর কথা পড়েছি শুনেছি। কিন্তু নিজের চোখে তাদের দেখার সুযোগ তো হয়নি বা ঘটার ও কথা নয়। তবে এই ঘরে শুয়ে থাকা রাজারা প্রত্যেকে ৪০০০ হাজার বছর আগে দাপটের সাথে রাজত্ব করেছেন, অথচ নিজের চোখের সামনে তাদের দেখতে পাচ্ছি। এই অনুভূতিটা খুব অন্য ধরনের। এই ঘরে এসে আবার যেন সময়ের হিসেব টা গুলিয়ে গেল। বার বার মনে হতে লাগল যে আমি বোধহয় টাইম মেসিনে চেপে ঘুড়ে বেড়াচ্ছি।এছাড়াও সারা মিউসিয়াম জুড়ে অসংখ্য সারকফাগাস, অসংখ্য মূর্তি দেখতে পেলাম। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রানী হাতসেপ্সুতের স্ফিংক্স মূর্তি। রাজা খুফুর একমাত্র ছোট্ট একটি মূর্তি। আর সেই রাজার মূর্তি যিনি পুরনো সাম্রাজ্যের পর উত্তর ও দক্ষিণ মিশর কে আবার এক সাথে যুক্ত করেছেন।আর আছে অসংখ্য আঁকা ছবি। তার মধ্যে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য ও আমার প্রিয় একটি আপনাদের দেখার জন্য দিচ্ছি।এত সুন্দর রঙ এর ব্যবহার এত বছর আগে হতে পারে, এ যেন ধারনার বাইরেএই ঘর থেকে বেরিয়ে আমরা আরও অনেক ঘরে গেলাম। সেখানে কোথাও পশু পাখির মমি করে রাখা আছে, কোথাও আছে হরেক রকম গয়না। আর অনেক মমির মুখোস দেখলাম। সেগুলি অনেক গুলি ই সোনার তৈরি। গয়নার নকসা দেখলে সত্যি ভাবতে ইচ্ছে করে যে মিশরীয়রা অপূর্ব গুণের অধিকারী ছিলেন।কায়রো মিউসিয়াম থেকে বেরিয়ে আমরা চললাম ঝুলন্ত চার্চ দেখতে। মিশরীয়দের পর খ্রিষ্টানরা মিশরের দখল নেয়, আর তারও পরে মুসলিম রা। বাইবেলের গল্প অনুযায়ী, ছোট্ট যীশুকে বাঁচানোর জন্য মা মেরী পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। সেই সময় কায়রোতে একটি ছোট্ট গুহাতে বেশ কিছু দিন ছিলেন। সেই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে এই চার্চ। মিশরে, এই খ্রিষ্টানদের বলে কপটিক খ্রিষ্টান। চার্চটি অপূর্ব ।দেখে বোঝা যায় যে অনেক দিনের পুরনো চার্চ। ভিতরের সমস্ত আসবাব পত্র কাঠ ও হাতির দাঁতের। রঙিন কাঁচের কাজও খুব সুন্দর।ঝুলন্ত চার্চচার্চ থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম Citadel of Salah-i-Din দেখতে। ইসলামিক শাসনে আসার পর মিশরকে রক্ষা করার দায়িত্ব আসে মুসলিম সুলতানদের হাতে। তারা সব সময় ধর্ম যুদ্ধ (crusade) বা খ্রিষ্টান দের হাত থেকে মিশর কে বাঁচাতে চেয়েছে। এর জন্যই সুলতান সালাহ দিন পাঁচিল দিয়ে পুর শহরকে ঘিরে ফেলতে চান। আর তার ফলেই তৈরি হয় নতুন শহর বা সিটাডেল। বর্তমানে এই অঞ্চলটি মিশরের সামরিক বাহিনীর হাতে তবে এই সিটাডেলের মধ্যে থাকা দুটি মসজিদ, মহম্মদ আলি মসজিদ ও আলাবাস্টার মসজিদ পর্যটকদের জন্য খুলে রাখা হয়েছে। অপূর্ব সুন্দর মসজিদ দুটি। রঙ্গিন কাঁচের কাজ, পাথরের কাজ সব মিলিয়ে অনবদ্য। Alabaster মসজিদ এর আকৃতি ঠিক যেন ইস্তাম্বুলের blue mosque এর মত।আলাবাস্টার মসজিদএই মসজিদ দুটিই পুরনো কায়রো শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে। আর অনেকটা উঁচুতে। লোক মুখে শোনা যায় যে গিজার পিরামিডের গা থেকে পাথর খুলে নিয়ে এই মসজিদ তৈরি হয়েছে। তবে সত্যি টা কি সেটা বোধহয় কেউ ই জানেনা। তবে এ কথা ঠিক যে পিরামিড ও এই মসজিদ সবই এক ধরনের পাথর দিয়ে তৈরি।এই মসজিদের উপর থেকে গোটা শহরটাকে দেখা যায় আর সেটা খুব সুন্দর দেখতে লাগে। ধূসর রঙের বাড়ির সারি, দূরে কালো রঙের নীল নদ, ও আর দূরে আকাশ ভেদ করে পরপর উচ্চতা অনুযায়ী দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর এক আশ্চর্য। ভাষায় সে দৃশ্য বর্ণনা করা হয়ত আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যেন চোখের সামনে স্বপ্ন নগরী ভেসে উঠছে।এখান থেকে আমরা গেলাম khan-e-Khalil বাজারে। এই বাজারটিও প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। এই বাজারে এলেই মনে হবে কলকাতার ধর্মতলায় এসে গেছি। জিনিসপত্রের দোকান ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন খাবারের দোকান। এখানে বেশ গড়গড়া টানার প্রচলন দেখতে পাওয়া গেল। মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে দোকানে বসে গড়গড়া টানা এখানকার রীতি। সন্ধ্যে হতেই ঝলমলিয়ে উঠল বাজার। কেউ গান গাইছে, কেউ ফেরী করছে জিনিস, কেউ মেহেন্দি পরাচ্ছে। সব মিলিয়ে বেশ জমজমাট। নির্ভেজাল মিশরীয় স্বাদ পেতে অবশ্যই এই বাজারে আসতে হবে। চারিদিকে মিশরীয় খাবারের গন্ধ ছড়াচ্ছে। ভোজন রসিকরা এখানে এসে বেশ তৃপ্ত হবেন।খান-এ-খালিল বাজারআমরা প্রথমেই বসে গেলাম turkish coffee নিয়ে। সেটা কিছুটা হলেও আমাদের filter coffee-র মতই খেতে। কি সুন্দর ছোট ছোট স্টিলের কফি পটের মধ্যে করে দিয়ে গেল। সাথে কাপ। ঢালো আর খাও। এরপর খানিক বাজার করতে যাওয়া হল। এখানে সব রকম জিনিস পাওয়া যায়। দরদাম করতে পারলে কেল্লা ফতেহ। আর এসে দেখালাম মিশরীয়রা খুব বলিউডের ভক্ত। ফলে শাহ্রুখ খান বা আমিতাভ বচ্চন বলে আপনাকে সাদর আমন্ত্রন জানাবে। দেশে ফিরে বন্ধুদের উপহার দেবার জন্য কিছু কেনার হলে এইখানেই কেনা ভাল কারণ গিজা চত্ত্বরে বা অন্য কোথাও দাম বেশি হবার সম্ভাবনা।খান-এ-খালিল বাজারে পসরাএরপর আমরা আবার রাতের জন্য মিশরীয় খাবার-ই পছন্দ করলাম। ফালাফেল বা কোশারি ওখানকার খুব নাম করা পদ। খানিক টা আমাদের বিরিয়ানির মত, তাতে এত কিছু থাকে যে আমাদের একজনের পক্ষে তা একটু বেশীই হয়ে গেছিল। আর ফালাফেল আমাদের ডালের বড়ার মত খেতে। এরসাথে না না রকম চাটনি ইত্যাদি ও ছিল। ওখানে বসে খলা আকাশের নীচে মিশরীয় গান শুনতে শুনতে আমেজ টা ভালই আসছিল। তবে কায়রোর ট্রাফিক এর কথা মনে পড়াতে বাড়ি ফেরার রাস্তা ধরলাম........শ্রেয়া ঘোষ (বর্ধমান)ক্রমশ...

নভেম্বর ১৯, ২০২২
নিবন্ধ

ফারাও এর দেশ ঘুরে... (ভ্রমণ কাহিনী) দ্বিতীয় পর্ব

আমাদের মিশর সফর কায়রো থেকে শুরু হয়ে কায়রোতেই শেষ হবে। আর আজ সেই দিন যে দিন আমরা বিশ্বের প্রাচীন বিস্ময়ের সামনে দাঁড়াব। আজ আমাদের পিরামিড দেখার দিন। গাড়ি করে রওনা দিলাম চরম আগ্রহ নিয়ে।আমাদের প্রথম গন্তব্য সাক্কারা। সাক্কারা হল মিশরের প্রাচীনতম Royal Necropolis বা রাজধানী। সাক্কারা তে প্রাচীন কবরস্থানও দেখা যায়। এই অঞ্চলের সব পিরামিড বা tomb গুলির সময়কাল প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্ব। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৫০১৯ বছর আগেকার। এই এত বছরের হিসেবটা চট করে আমাদের মাথায় আসেনা। আমাদের মত সাধারন মাপের মানুষ জন বুঝতেই পারেনা যে, এটা ঠিক কত বছর আগে হতে পারে, আর তখন কার সাথে আজকের পার্থক্যটাই বা কতটা সেটাও বুঝতে বেশ অসুবিধা হয়। তবে সেই সব স্থাপত্যের সামনে গিয়ে বেশি কিছু বোঝার থাকেনা। শুধু বিস্ময়ে হকবাক হয়ে যাওয়া ছাড়া। তাদের অস্তিত্ব্যের সামনে নিজেকে খানিকটা হাস্যকর মনে হয়।কায়রো শহর থেকে একটু দূরে সাক্কারা। Old Kingdom বা পুরনো রাজবংশের মিশরীয় রাজারা বা Pharaoh রা বিভিন্ন ভাবে পিরামিড তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। কেউ ধাপে ধাপে করে, কেউ ৪৫ ডিগ্রী কোণ করে। কোনটি আবার শুধু মাত্র ঢিবি হয়ে রয়ে গেছে। কোনটি আবার বানানোর পর ভেঙ্গে পরেছে যাদের আজকাল বলা হয় Collapsed Pyramid। সাক্কারা চত্তরে কাছে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেই সব বিভিন্ন রকমের পিরামিড এরই নমুনা।পিরামিড কথাটি এসেছে পুরনো মিশরীয় শব্দ pey-raa-mid থেকে। যার অর্থ স্বর্গে যাবার সিঁড়ি বা ভগবান রা এর কাছে যাবার সিঁড়ি। এই রা দেবতা হলেন মিশরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেবতা, যিনি অন্য অর্থে সূর্য দেবতা। প্রাচীন মিশরীয়রা সূর্য দেব কে পূজা করতেন, কারণ তারাও মনে করতেন যে, সর্ব শক্তির আধার, প্রাণের আধার। পৃথিবীর সব প্রান্তেই, সব প্রাচীন সভ্যতাতে সূর্য দেবতার পূজা দেখে অবাক হতে হয়। দক্ষিণ আমেরিকার মায়া সভ্যতায় Kinich Ahau, মিশরীয় দের Raa, গ্রীকদের Apollo Helious বা ভারতীয়দের সূর্যদেব। এর থেকেই বিশ্বাস জন্মে যে, পৃথিবীর সব জায়গায় মানুষের ভাবনা চিন্তা এক ধরনের বা তার প্রকৃতিগত সুত্রপাত এক জায়গা থেকেই।সাক্কারা তে যে সব tomb আমরা দেখতে গেলাম সে সব ই রাজা, রানী, পুরোহিত না উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের। মিশরীয় রা বিশ্বাস করত যে, মৃত্যুর পরের জীবনই আসল জীবন। তাই এই মানুষ জীবনে যাই হোক না কেন, পরের জীবন কে সুন্দর করে তুলতে হবে। আর সেই কাজই ছিল তাদের প্রধান কাজ। তাই জন্যই তারা এই পিরামিড বানাত। আর পিরামিড কে সব উপায়ে সুন্দর করার চেষ্টা করত। সাক্কারা তে আমরা একটি পিরামিড এ ঢুকলাম। সেটা রাজা বা ফারাও তিতির। বেশ ৫০-৬০ ফুট নীচে নামতে হল। ঘাড় নীচু করে কোমর বেঁকিয়ে নামলাম নীচে। এবার অবাক হবার পালা। পিরামিডটির সাদা দেওয়াল জুড়ে প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় লেখা যাকে বলে hieroglyph writings. লেখা না বলে আঁকা বললেই বোধহয় ঠিক হবে। সব শেষে গেলাম সেই জায়গায় যেখানে মমি রাখা হত। এই ঘর কে বলে sarcophagus room। ভাবার চেষ্টা করতে লাগলাম যে কি করে অত বছর আগে প্রাচীন মিশরের মানুষ কি করে এই সব বানিয়েছিলেন আর কি করেই বা কি করতেন তারা।হিয়েরগ্লিফ লেখা, সাক্কারা পিরামিডের ভিতরেএই সব আঁকা বা লেখা কতবার ই তো ছবির বইতে দেখেছি। কিন্তু সামনে দেখার যে অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা সে লেখার ভাষা আমার নেই। অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। মনে হল যে আজ থেকে প্রায় ৪০০০ বছর আগে, সদ্য মৃত কোন প্রিয় ফারাও কে চোখের জলে শেষ বিদায় জানিয়ে এই পিরামিডে চিরনিদ্রায় ঘুম পারিয়েছিল তার রাজ্যবাসী। যত ভেবেছি তত অবাক হয়েছি। এরপর গেলাম সেই চত্বরেই অন্য একটি পিরামিড-এ। সেখানে দেওয়াল চিত্র আরও বেশি স্পষ্ট, ভাবাই যায়না যে সেগুলি এত বছর আগেকার। এখানে দেওয়াল এর বাইরের অংশের লেখা বা আঁকা দেওয়ালে গর্ত করে করে লেখা হত। আর দেওয়ালের ভিতরের অংশ এ wedged out পদ্ধতিতে, অর্থাৎ শুধু লেখা অংশ টিকে রেখে দিয়ে বাকি অংশ চেঁচে ফেলে দেওয়া হত। এর কারন ও খুব স্পষ্ট, বাইরের দিকের দেওয়াল রোদ বৃষ্টি গরম সব সহ্য করবে তাই ক্ষয় হয়ে যাবার সম্ভাবনা বেশি তাই গর্ত করে করে লেখা হত, আর দ্বিতীয়ত দূর থেকে এই ধরনের লেখা হলে দেখতে সুবিধা হবে। আর ভিতরের দেওয়ালে কোন অসুবিধা নেই, তাই যে ভাবে খুশি ছবি আঁকা হয়েছে আর সুন্দর করা হয়েছে।প্রাচীন মিশরীয় যে কোন ছবিতে দেখা যায় যে পুরুষ ও মহিলাদের গায়ের রঙ আলাদা। পুরুষ দের গায়ের রঙ হত গাঢ় মেরুন বা খয়েরি বা একদম কালো আর মহিলাদের গায়ের রঙ হত হালকা যেমন হলুদ বা সাদা। এর কারন হিসেবে বলা যেতে পারে যে সমাজের নিয়ম অনুসারে পুরুষ রা বাইরে কাজে যান তাই তাদের গায়ের রঙ গাঢ় হয়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে যে সেই অত বছর আগেও এত শক্ত সামাজিক ধারণা মিশরীয়দের ছিল। মিশরীয় সমাজে দেবীই হোক বা সাধারণ নারী সবাই গৃহ বধুর তকমা পেত। তাদের মধ্যেও এই ধরনের বিভেদ দেখে বেশ অবাক হতে হয়। আর এতেই ধারণা আরও স্থির হল যে মানুষের ভাবনা চিন্তা সব সময়ই স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে একই ধরনের হয়ে থাকে।স্টেপ পিরামিদ, সাক্কারাএখান থেকে আমরা গেলাম সেই বিখ্যাত স্টেপ পিরামিড দেখতে। archeological কাজ চলার জন্য একদম কাছে যাওয়া হল না আর ভিতরে ঢোকা গেলনা। মিশরের প্রধান স্থপতি ইমহতেপ (Imhotep) এই পিরামিডটি সবার প্রথমে বানান। এই পিরামিড টি তখন কার ফারাও Djoser এর জন্য গঠন করা হয়।এই পিরামিডটির প্রায় ৬ টি ধাপ আছে, যা মাটি থেকে ক্রমশ ছোট হতে হতে উপর দিকে উঠেছে। এই পিরামিড টিও হলুদ রঙ এর বেলে পাথর বা sand stone দিয়ে তৈরি। হলুদ রঙের, বিশাল এক স্থাপত্য ৪০০০ বছর ধরে ক্রমশ ধীরে ধীরে স্বর্গের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে মিশরীয় সভ্যতাকে সেই স্বর্গের উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।Papyrus এ আঁকা রাজা অসিরিসের শেষ বিচার সভাএই পিরামিড চত্বরেই আমরা দেখলাম ফারাও Djoser এর mortuary temple। এই temple বা মন্দির মানুষের মৃত্যুর পর মমি তৈরি করার জায়গা। মিশরীয়দের নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুর পর ৭০ দিন ধরে মমি তৈরির কাজ চলে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী মৃত্যুর দেবতা Anubis বা শেয়াল দেবতা এই পদ্ধতি শুরু করেন। প্রথা অনুসারে মৃতের দেহ থেকে প্রথমে যকৃৎ (liver) , শ্বাসযন্ত্র বা ফুস্ফুস (lungs) , পাকস্থলী (stomach) , ও অন্ত্র (intestine) বের করে নেওয়া হত। এই অঙ্গ গুলিকে এক একটি কৌটো এর মধ্যে ভরে রাখা হত কিছু রাসায়নিক তরলের মধ্যে, যার রহস্য আজও অজানা। আর এই কৌটো গুলি বিভিন্ন জন্তুর মুখের ছবি দেওয়া হত। এই ধরণের কৌটো গুলি কে বলা হয় canopic jars। মস্তিষ্ক বের করে আনা হত নাসারন্ধ্র দিয়ে। মস্তিষ্ককে সংরক্ষণ করা হত না। হৃদয় রেখে দেওয়া হত শরীরের মধ্যে। মিশরীয় রা বিশ্বাস করত যে মানুষের দেহে হৃদয়ই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এই হৃদয় বা মিশরীয় ভাষায় Ba এর বিচার, মানুষের জীবনের শেষ দিনে, ভগবান Osiris এর দরবারে হবে। সেই খানেই স্থির হবে যে এই মানুষটি স্বর্গে যাবার উপযোগী কিনা। যদি উপযোগী হয়, তাহলে Ba রূপ বদলে হয়ে যাবে কা (Ka),যা অবিনশ্বর।Papyrus এ আঁকা আনুবিস শেষ বিচার করছেন ছবি ইন্টারনেটFinal judgement বা শেষ বিচার হয় দেবতাদের রাজা বা মিশরীয়দের প্রধান দেবতা অসিরিস বা Osiris এর দরবারে। সেখানে ১২ জন দেবী (যারা দিনের ১২ ঘণ্টার প্রতিনিধি) মানুষের আত্মাকে প্রশ্ন করেন ১২ টি প্রশ্ন। এর মধ্যে সব প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হলে স্বর্গে যাবার সুযোগ ঘটে। যেমন উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রাজা অসিরিস, চেয়ারে বসে বিচার করছেন। আনুবিস দাঁড়িপাল্লাতে বা কে ওজন করে দেখছেন। অন্যান্য দেবতারা সেই বিচারের ফলাফল আবার অসিরিস কে জানাচ্ছেন। কি চমৎকার দর্শন, কি সুন্দর সহজ চিন্তাধারা ।আর এই ছবিতেও আনুবিস কে সেই বিচার কাজে সাহাজ্য করতে দেখা যাচ্ছে। এই স্টেপ পিরামিড চত্বর থেকেই দূরে মরুভুমির মধ্যে দেখা গেল bent pyramid, red pyramid আর আরও দূরে Great Pyramid বা Giza.Step Pyramid ঘুরে আমরা গেলাম প্যাপিরাস কারখানাতে। সেখানে প্যাপিরাস তৈরি করা দেখলাম। পদ্ধতি টা বেশ সুন্দর ও সহজ। প্যাপিরাস আসলে এক ধরনের ঘাস জাতীয় গুল্ম। সেই গাছের নরম ডাল কেটে জলে ভিজিয়ে রাখলে, পাট গাছের মতই তার পাতলা আস্তরণ বেরিয়ে আসে। এবার সেই আস্তরণ গুলিকে লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি, তাঁত বোনার মত করে রেখে কোন ভারি বস্তু দিয়ে চেপে রাখতে হয় অনেক্ষন। এই ভাবে চাপে রাখার ফলে তৈরি হয় প্যাপিরাস বা paper। এই পাপিরাস থেকেই পেপার শব্দটি এসেছে, পেপার ও বর্তমানে তৈরি হয় খানিকটা এই পদ্ধতি ধরেই। আশ্চর্যের বিষয় অত বছর আগে মিশরীয়রা কি করে এই প্রথা আবিষ্কার করেন। এই কারখানায় আদর আপ্পায়নের ব্যাপার ই আলাদা। সেখানে যেতেই আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হল আমরা hibiscus tea খাব কিনা? আর খেলে কেমন খাব? ঠাণ্ডা না গরম। জবার চা হয় জানতাম না, গরম ও ছিল ভাবলাম ঠাণ্ডাই খাই। যেমনি বলা ওমনি এসে গেল ছোট গ্লাসে করে লাল রঙ এর পানীয়। বেশ ঠাণ্ডা । জবার চা মানে লাল ত হবেই, তবে চা সুলভ কোন গন্ধ নেই। চেখে দেখলাম, বেশ টক মিষ্টি খেতে আর গরমের মধ্যে মনে হল অমৃত। সেই চা খেয়ে এতটাই আপ্লূত হলাম যে দেশে ফিরে Amazon থেকে খুঁজে order দিয়ে দিলাম। এখনও সে চা বাড়িতে আছে আর গরম কালে খেতে ভালই লাগে।Papyrus গাছদুপুরে খাবার পর আমরা Giza যাবার রাস্তা ধরলাম। তখনও নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারিনি। বেশ কিছুটা traffic jam কাটিয়ে পৌঁছলাম Giza চত্বরে । রাস্তায় একটা বাঁক নিয়ে গাড়ি যখন ঘুরলো, দেখতে পেলাম রাজা খুফুর পিরামিডকে। পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতমকে। দূর থেকে দেখেই তার বিশালত্বে কেমন যেন ঘাবড়ে গেছিলাম। তারপর মনে হল স্বপ্ন দেখছি । নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে সত্যি ই আমি Great Pyramid এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এতদিন এর স্বপ্ন দেখার চূড়ান্ত পরিনতি আমার সামনে। পৃথিবীর প্রাচীনতম ইতিহাস এর সাক্ষীর সামনে আমি।Giza হল রাজা বা ফারাও খুফুর সমাধি বা পিরামিড। এই ফারাও আজ থেকে প্রায় ৪০০০ বছর আগে মিশরে রাজত্ব করেন। তাঁর সময়কাল প্রায় ৫০ বছরের। মিশরের ইতিহাস এ এই সময়টিকে পুরানো রাজত্বকাল বা old kingdom বলে। ফারাও খুফু Cheops নামেই পরিচিত ছিলেন। শোনা যায় এই নাম তাকে গ্রীক ঐতিহাসিকরা দিয়েছিলেন।Great Pyramid, ফারাও খুফুর পিরামিডখুফুর ;পিরামিড প্রায় ৪৮১ ফুট উঁচু, আর এটি যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছে, তার দৈর্ঘ্য ৭৫৬ ফুট। মোটামুটি ভাবে ২৫৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এটি বানানো শেষ হয়। এই পিরামিড এর গায়ে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন পাথর আছে , যার এক একটির ওজন ৩ টন । এই পিরামিড এর হলুদ পাথরের উপর আগে চুনা পাথরের প্রলেপ ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেটি আর নেই। সাদা চুনা পাথরের প্রলেপ এর জন্যই এই পিরামিড এর আসল রঙ ছিল ধবধবে সাদা। সাহারা মরুভুমির মধ্যে এই বিশাল আকৃতির সৌধটি যখন রোদের আলোয় ঝলমল করত , তখন তাকে ঠিক এক টুকরো হীরে বলেই মনে হত। এর মাথার উপরে আরও ১৪ ফুট উঁচু একটি অংশ ছিল। আজ যা আর দেখতে পাওয়া যায়না । সেই উচ্চতা যোগ করলে আজও এই পিরামিডটি পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ সৌধ, যা মানুষের হাতে তৈরি। তবে তা সত্ত্বেও এর বিশালতা ও গঠন আজও মানুষকে অবাক করে।একসাথে তিনটি পিরামিড, গিজাফারাও খুফুর পিরামিড এর পাশেই আছে ফারাও খাফ্রেন (Khafrain) এর পিরামিড। এই রাজাও old Kingdom এর সময়ই রাজত্ব করেছিলেন। এই পিরামিডটির একদম উপরের অংশে সাদা চুনা পাথরের প্রলেপ কিছুটা হলেও আছে। এটি গিজার থেকে উচ্চতায় একটু ছোট। তবে গিজা পিরামিডের উপরের ১৪ ফুট অংশ না থাকায় এটিকে অনেক সময়ই বেশি উঁচু বলে মনে হয়। তবে যে পরিমান ভুমির উপর পিরামিড দুটি বানান হয়েছে সেটি লক্ষ্য করলেই সেই ভুল ভাঙে।ফারাও মানকুরের পিরামিড, গিজাএই পিরামিডটির পিছনে আছে আরও একটি ছোট মাপের পিরামিড। এই ছোটটি ফারাও মানকুরের (Mankure)। যে কোন পিরামিডের ভিতরেই ঢোকা যায়, তবে তার জন্য আলাদা টিকিট এর ব্যবস্থা আছে। খুফুর পিরামিড সারা বছর পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে আর বাকি দুটি ৬ মাস করে এক একটি। তবে এই পিরামিড গুলির ভিতরে কিছুই নেই। না আছে কোন ছবি, লেখা, না কোন জিনিস পত্র। সব ই সেগুলি জাদুঘর এ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা মানকুরে পিরামিডের জন্য আলাদা টিকিট কেটে তার ভিতরে গেলাম। এখানেও প্রায় ৫০ ফুট নীচে নামতে হল। তবে আগের বারের অভ্যেস থাকায় খুব অসুবিধা হয়নি। ভিতরে গিয়ে প্রধান ঘরটিতে দাঁড়ালাম, সামনে একটি পাথরের বাঁধানো জায়গা, যেখানে শোয়ানো ছিল ফারাও মানকুরের সারকোফাগাস।মিশরে পিরামিড তৈরি হবার সময় থেকেই পিরামিডের ধন সম্পত্তি লুঠ করার প্রবনতা দেখা যায়। ফারাও রা অনেক চেষ্টা করেও সেই সব চোরদের আটকাতে পারেননি। মিশরের মানুষ জানত যে পিরামিদের মধ্যেই লুকানো আছে ফারাওদের সব ধন সম্পত্তি। তাই পরজন্মে বিশ্বাস থাকলেও চুরি করতে তাদের বাঁধেনি। তারাই পিরামিডগুলিকে নষ্ট করেছে বেশি। পরের দিকে ফারাওরা বুঝতে পেরে, পিরামিড বানান বন্ধ করে অন্য রকম ভাবে তাদের সৌধ বানাতে থাকেন। তবে তাতেও যে কত টা চুরি আটকানো গেছে, সেটা সবার অজানা।এখান থেকে আমরা গেলাম solar boat museum বা সৌর নৌকা দেখতে। এই সৌর নৌকা কিসে কাজে লাগে সে বিষয়ে পরে আসছি। সৌধ গুলির পাশে নৌকা থাকার কয়েকটি কারণ আছে। মিশরীয়দের মতে মৃত্যুর পর স্বর্গে যাবার রাস্তা দুটি, পায়ে হেঁটে বা নৌকা চড়ে। তাই প্রতি পিরামিড এর পাশে একটি করে নৌকা রাখার জায়গা ও কিছু নৌকার ধ্বংসাবশেষও পাওয়া গেছে। সেগুলির মধ্যে অবশ্যই ফারাও খুফুর টি সব থেকে বড়। নীচের ছবিটিতে সেই সৌর নৌকা রাখার গর্ত খানি দেখা যাচ্ছে।সৌর নৌকা রাখার গর্তএই নৌকাটি বর্তমানে পাশেই তৈরি একটি মিউজিয়ামে আছে। এই নৌকাটি এতটাই বড় যে এর ছবি তোলা প্রায় অসম্ভব। আর এই museum এ ছবি তুলতেও দেয়না। তাই মনের ক্যামেরাতেই সেই ছবি ধরে রাখতে হল। নীচের ছবি টি ইন্টারনেট এর সৌজন্যে। তবে সেখানেও পুরো নৌকা টি বোঝা যাচ্ছেনা।নৌকা থাকার আরও একটি কারণ আছে। মিশরীয় পুরাণ অনুযায়ী, তাদের প্রধান দেবতা অসিরিস যিনি অধোলোক এর দেবতা, ভবিষ্যৎ জীবনের দেবতা ও ফলশালিত্বের দেবতা। তাঁর মৃত্যু হয় তাঁর ভাই সেথ এর হাতে। সেথ হলেন মিশরীয়দের মন্দ দেবতা। সেথ অসিরিসকে হত্যা করবার পর তাঁর দেহকে ১৮ টি টুকরো করে মিশরের সব প্রান্তে ছড়িয়ে দেন। তার থেকে জন্ম নেয় মিশরের ১৮ টি রাজ্য। অসিরিস এর স্ত্রী দেবী ইসিস, যিনি জাদুর দেবী, তিনি তখন সেই ১৮ দেহাংশ খুঁজে নিয়ে, জোড়া দিয়ে আবার অসিরিস এর দেহ সম্পূর্ণ করেন। অবশেষে ফারাও অসিরিসের মৃতদেহ নিয়ে মমি প্রক্রিয়া শুরু হয়। দেবী ইসিস (Isis) যিনি জাদু,সৌন্দর্য, ও প্রেমের দেবী, স্বামী অসিরিস এর মমি তৈরি হয়ে গেলে সৌর নৌকা করে স্বর্গে যাত্রার অনুমতি দেন। নৌকার একদিকে দেবী ইসিস ও অন্যদিকে দেবী নেপথিস (যিনি অসিরিস এর দ্বিতীয় স্ত্রী ও সৎ বোন) বসেন, দেবীরা অসিরিস কে এই ভাবেই পরবর্তী জীবনে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই ভাবেই এটি একটি নিয়ম হয়ে যায় যে, মৃত্যুর পর মমি হওয়া দেহ নৌকা করে পিরামিডে যাবে। এই যাত্রায় ফারাও এর সঙ্গে থাকবেন তাঁর একান্ত আপন পরিবার বর্গ। বিশেষ করে দু জন মহিলা আত্মীয়াকে থাকতেই হবে। আর এই ছবিও খুবই পবিত্র মনে করা হত। এই গল্প শুনে কেমন আমাদের পুরাণের সতী দেবী ও মহাদেব এর গল্প মনে পরে যায়। সেখানেও সতী দেবীর দেহাবশেষ দিয়ে তৈরি ৫১ টি ধর্মীয় স্থান। ভারতীয় জীবনেও এই স্থানের গুরুত্ব যথেষ্ট।নৌকাটি এতটাই বড় যে এর ছবি তোলা প্রায় অসম্ভবফারাও খুফুর সেই সৌর নৌকা মাটির তলায় প্রায় ৩০ ফুট নীচে বড় বড় পাথরের চাঁই দিয়ে ঢাকা ছিল। এই নৌকার দৈর্ঘ্য ১৪৩ ফুট ও প্রস্থ ১৯.৫ ফুট।এটিকে পৃথিবীর সবথেকে পুরনো জাহাজ আখ্যা দিয়েছেন ঐতিহাসিকরা। এই নৌকাটি অনেকগুলো কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল এই জাহাজ এ একটিও পেরেক নেই। নৌকা টির ১২২৪ টি ছোট ছোট টুকরো খুলে নিয়ে, ১৯৫৪ সালে জাহাজটিকে আবার নতুন করে বানানো হয়। বিশাল একটি মিউসিয়াম করে এখন সেটিকে সংরক্ষন করা হয়েছে।সৌর নৌকার মডেল, কায়রো মিউজিয়ামসৌর নৌকা দেখে আমরা গেলাম সেই স্ফিংক্স দেখতে। বিকেল হয়ে গেছিল বলে পুরপুরি সামনে থেকে দেখতে পাওয়া গেলনা। সত্যি তার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল যে সময় হয়ত থেমে গেছে। এক দৌড়ে আমি যেন পৌঁছে গেছি বহু হাজার বছর পিছনে। আরও মনে হচ্ছিল যে কত তুচ্ছ আমাদের এই একটা জীবন। এই স্ফিংক্স পিরামিডকে পাহারা দেয় বছরের পর বছর আর বর্তমান যুগের মানুষদের জানান দেয়, World fears time, and time fears pyramid।ফারাও অসিরিস ও তাঁর দুই রানী, দেবী ইসিস ও দেবী নেপথিস, কায়রো মিউজিয়ামস্ফিংক্সের মূর্তিতে সবসময়ই মুখটি হয় মানুষের আর দেহ হয় সিংহ এর। এর পিছনেও মিশরীয় দের কারণ আছে। মানুষ এর বুদ্ধি ও সিংহ এর শক্তি নিয়ে যদি সত্যি কোন প্রানী তৈরি করা যায় তাহলে সেই প্রানীই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর এমন শক্তিশালী প্রানীরাই পারে পৃথিবীতে রাজত্ব করতে। মিশরীয় সভ্যতায়, সব ফারাও ও রানীদের স্ফিংক্স মূর্তি তৈরি হত। প্রজা বা সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য। এই Great Sphinx হল ফারাও খাফ্রেন এর।পড়ন্ত বেলায় গ্রেট স্ফিংক্সস্ফিংক্স দেখে আমাদের সকালের সফর শেষ হল। সন্ধ্যের সময় আবার স্ফিংক্স এর সামনে এলাম light and sound প্রদর্শন দেখতে। অসম্ভব সুন্দর সেই প্রদর্শনী দেখতে দেখতে যেন আমরাও ইতিহাসকে আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত দেখতে পেতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল আমরাও যেন সেই সময় এরই সাক্ষী। স্ফিংক্স যেন সত্যই, কথা বলছে। আমিও যেন দেখতে পাচ্ছিলাম সম্রাট নেপলিয়ান বা আলেকজান্ডার এসে স্ফিংক্সের সামনে নতজানু। ইতিহাস এর শুরুই তো এখান থেকে। আর সেই ইতিহাস সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে আজকের দিন পর্যন্ত স্ফিংক্স সব দেখেছে নিজের চোখে। সে যদি সত্যি কথা বলতে পারত তাহলে বলত গল্প, ছোটবেলার গল্প দাদুদের মত, তাহলে কত গল্পই না বলত সে। নির্বাক শ্রোতা হয়ে শুধু দেখে চলেছে সে। ভুত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান সবই যেন তার হাতের মুঠোতে। সব পরিবর্তনকে সহ্য করে সাহারা মরুভুমির বুকে দাঁড়িয়ে আছে স্ফিংক্স। আর থাকবেও আরও অনেক অনেক বছর, যখন আমরা কেউ থাকবনা। সেই দিনও সে একই ভাবে সবাইকে ইতিহাস শোনাবে স্ফিংক্স।গ্রেট স্ফিংক্সআজকের দিনের যাত্রা এখানেই শেষ করে হোটেল মুখি হলাম, সঙ্গে রইল স্ফিংক্স এর বলা গল্প আর রাতের আলোয় দেখা পিরামিড এর স্মৃতি।শ্রেয়া ঘোষ (বর্ধমান)ক্রমশ...

নভেম্বর ১৩, ২০২২
নিবন্ধ

স্বপ্ন পূরণ (ছোট গল্প)

এখনও পাঁচালির আওয়াজ কানে বাজছে দীপ্তর। সেই ছোটো থেকে দেখে আসা স্বপ্নটা আজ সত্যি হলো।কোজাগরী পূজো রাত; রূপোর থালার মত চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে জগত সংসার। এই রাতে নিজেকে সব থেকে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে ওর। অথচ কিছু মাস আগেও উল্টো ছিল। আজ দশ বছর পর গ্রামের বাড়িতে এসেছে লক্ষ্মী পূজো উপলক্ষে। এতদিন কলকাতায় আসলেও গ্রামের বাড়িতে আসে নি। এতদিন পরে মনের গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে রাখা স্বপ্ন গুলো প্রকাশ করার সাহস পেয়েছে।গ্রামের ছেলে দীপ্ত, মা বাবাকে হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় হারিয়ে শহরে মামার বাড়িতে যখন আসে তখন ও ক্লাস এইট। একে তো এই বয়স তারপর মা বাবাকে হারানো;সব মিলিয়ে দীপ্ত যেন একদম চুপচাপ হয়ে গেছিলো। ওর মামাতো দিদি দীয়া ওকে আগলে রাখতো সবসময়। দীপ্ত দীয়ার থেকে বছর পাঁচের ছোটো কিন্তু মনে হত অনেক ছোটো। দীয়ার সাহচর্যে ও আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। দিদিভাইকে দীপ্ত সহজেই সব কথা বলতে পারত অকপটে। এই বয়সের যেসব পরিবর্তন সেসব কথাও দিদিকেই বলত। কারণ দিদি ছাড়া ওরকম করে ওকে কেউই বুঝত না। যদিও মামীমা খুবই স্নেহ করতেন। গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা হলেও দিদিকেই বলত। এইভাবে ও বড়ো হতে থাকলো।দীপ্ত যেবার উচ্চ মাধ্যমিক দেবে ওর দিদির বিয়ে হয়ে গেল। আবার দীপ্ত একা হয়ে গেল। এইসময় ওদের পাশের বাড়িতে একটি পরিবার ভাড়া এল। যতীন কাকু ও স্বপ্না কাকী মা আর ওনাদের মেয়ে রিমা। কাকীমাকে প্রথম থেকেই দীপ্তর মনে হয়েছিল ওর মায়ের মত দেখতে অনেকটা। ওর খালি ইচ্ছা করত ওনার কাছে যেতে। মামীমার সাথে খুব অল্প দিনের মধ্যেই ওনার বেশ ভাব হয়ে গেল। মাঝে মাঝেই এটা ওটা দিয়ে দীপ্ত ওদের বাড়িতে যেত আবার রিমাও আসত ওদের বাড়িতে। ওরা আসাতে দীপ্তর একাকীত্ব যেন একটু লাঘব হলো। যদিও ও রিমা কে একটু এড়িয়ে চলত কারণ ওর মনে হত মেয়েটা বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পাকা। রিমা তখন ক্লাস এইট। কাকী মা বলাতে মাঝে মাঝে রিমা কে পড়া দেখিয়ে দিতে হত। যদিও রিমার ভাব কায়দা ভালো লাগতো না। এইভাবেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেই পাশ করে কলেজে ভর্তি হলো।সেবার দূর্গা পূজোর অষ্টমীর দিন পাড়ার পূজোতে অঞ্জলি দেবার সময় শাড়ি পড়ে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়ে রিমা এমনভাবে তাকালো যে দীপ্ত একটু অবাক হলো, কিন্তু বয়সের তুলনায় বাড়ন্ত রিমা কে সেদিন এত সুন্দর লাগছিল যে দীপ্তও ঘায়েল হয়েই গেল। আড়ালে বসে মদনদেব হাসলেন। তার শরে বিদ্ধ হলো দুটি হৃদয়। যদিও এর প্রকাশ ঘটেনি পরস্পরের কাছে। কিন্তু কতদিন আর ওইভাবে চলে। এসে গেল বাঙালীর ভ্যালেন্টাইন ডে সরস্বতী পূজা। দীপ্ত কলেজ যাবে বলে তৈরি হচ্ছে এমন সময় রিমা এসে ওর মামীমার কাছে বায়না ধরে দীপ্তর সাথে কলেজে যাবে। মামীমা রিমা কে খুব ভালোবাসেন তাই দীপ্তকে বলেন রিমা কে নিয়ে যেতে। তখনও কি ঘটতে চলেছে দীপ্তর আন্দাজ ছিল না। রিমা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বলে কলেজ না ও যেখানে বলবে সেখানে যেতে হবে। এই বলে দীপ্তকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। যেখানে দুজনে মদন শরে বিদ্ধ হয়, দুটি মনের মিলন ঘটে, অধরে অধরে মিলনের সাথে সাথে। সবার সামনে কিন্তু সবার অজ্ঞাতেই চলল দুজনের প্রেম।রিমা মাধ্যমিক পাশ করল মোটামুটি রেজাল্ট করে। দীপ্ত গ্রাজুয়েশন করে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেল; সেখানে যা জমি জমা আছে চাষ করবে বলে। আর সাথে চলল চাকরির জন্য পরীক্ষা দেওয়া। মামা মামীমা খুব আপত্তি জানিয়ে ছিলেন, কিন্তু দীপ্তর গ্রামের প্রতি টানটা যায়নি। মাঝে মাঝে মামার কাছে আসে। এর একবছর পর হঠাৎ দিদিভাইয়ের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের সূত্রে একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে একটা চাকরি পেল। মামার চাপে পরে বাধ্য হলো চাকরিটা করতে। চলে গেল আমেদাবাদ।এবার সবার চোখে রিমার পরিবর্তন ধরা পড়তে লাগল। সেই প্রাণোচ্ছল মেয়েটা যেন কেমন চুপচাপ হয়ে গেল। আসতে আসতে দীপ্তদের বাড়িতে যাওয়া কমতে লাগলো। হঠাৎ দীপ্তর মামীমা খেয়াল করলেন যে রিমার মা আগের মত মেলামেশা করছে না। দীপ্ত ওর দিদিকেই সবটা জানাল। সব জেনে দীয়া গেল রিমার মায়ের সাথে কথা বলতে ওদের ব্যাপারে। রিমার মা দীয়াকে অনেক কথা শুনিয়ে দিলেন। এরপর ওর মামা মামীমা ও দীপ্তর কথা ভেবে কথা বলতে গেলে ওনাদের খুব অপমান করেন রিমার মা বাবা। এটা দীপ্ত মেনে নিতে পারে না। রিমা কে প্রস্তাব দেয় বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বিয়ে করতে হবে। কিন্তু রিমা রাজী হয় না। দুজনের মধ্যে চলতে লাগল টানাপোড়েন। এইভাবে চলতে চলতে হঠাৎ রিমারা চলে গেল। দীপ্তর সাথে কোনো রকম যোগাযোগ করল না। পরে বন্ধু মারফত শুনে ছিল রিমার বিয়ে হয়ে গেছে।এরপর দীপ্ত শুধু নিজের কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। চাকরিতে যাতে আরও উন্নতি হয় সেদিকে মনপ্রাণ লাগিয়ে দিল। ওর সততা আর সরলতা সবার মন জয় করে নিল। তরতর করে উন্নতি হতে লাগল। দীপ্ত যখন যার অধীনে কাজ করে সেই ওকে খুব ভালোবেসে ফেলে। কাজের উন্নতির সাথে সাথে বাড়ি আসা কমতে থাকে। এদিকে মামা মামীমা বিয়ের জন্য ক্রমশ জোর দিতে থাকে। বারবার এড়িয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত দিদিভাইয়ের কাছে হার মেনে বিয়ে করতে রাজি হয়। দীপ্তর গ্রামের বাড়ির পাশের গ্রামের এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে মধুমিতার সাথে বিয়ে হয় দীপ্তর। মধুমিতা গ্রামের মেয়ে ও গরিবের মেয়ে হলেও খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল। তবুও বিয়ের পর দুটো বছর বেশ ভালো কাটল। তারপর ওদের মাঝে এল ওদের ছেলে অন্বয়, যাকে ওরা কুট্টুস বলে। কুট্টুস তখন দুবছরের হঠাৎই মধুমিতার ব্যবহারে যেন অনেক পরিবর্তন আসতে থাকে। সারাক্ষণ ফোন নিয়ে বসে থাকে, ছেলেকেও সেভাবে যত্ন করে না। কথায় কথায় দীপ্তর বয়স নিয়ে, যোগ্যতা নিয়ে অপমানজনক কথা বলে। দীপ্তর সাথে ওর বয়সের ফারাক অনেক বেশি বলে হঠাৎ করে ওর দীপ্ত কে নিয়ে ওর মধ্যে সমস্যা দেখা যায়। দীপ্ত প্রথম প্রথম খুব একটা পাত্তা না দিলেও শেষ পর্যন্ত পারে না।শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা প্রায় ডিভোর্সের পর্যায়ে চলে যায়; কিন্তু দীপ্ত ছেলে ছেড়ে থাকতে পারবে না এটা বুঝতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় বাপের বাড়িতে রেখে দিলেও শেষ পর্যন্ত ওদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় কাজের জায়গায়। সেখানে আরেক অশান্তি শুরু হয়। সমস্যা যখন বেশ সমাধান হতে শুরু করে ঠিক সেই সময় দীপ্তর এক পিসতুতো ভাই মানস কাজের সূত্রে ওদের ওখানে গিয়ে ওঠে। সে প্রায় মধুমিতার কাছাকাছি বয়সের। তার নজর পরে মধুমিতার ওপর। তাই দীপ্ত আর মধুমিতার মধ্যে আবার বিবাদ লাগানোর জন্য রিমার কথা অনেক বেশি বেশি করে বাড়িয়ে বলে মধুমিতার কাছে। মধুমিতার মনে আবার ঝড় ওঠে। এই সময় মানস সুযোগ নিতে চায়। কিন্তু মধুমিতার মনে মানসের জন্য তো কোনো জায়গা ছিল না তাই ও মানসের এই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারে না। ও দীপ্তর কাছে সব বলে। এবং মানস যাতে আর না আসে সে ব্যবস্থা করতে বলে দীপ্ত কে।দীপ্ত বোঝে এই মেয়ের সাথে ঝগড়া করে হবে না আস্তে আস্তে বুঝিয়ে ঠিক করতে হবে। ও এই ব্যাপারে দিদিভাইয়ের সাহায্য নেয়। আস্তে আস্তে মধুমিতার মধ্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ওর শুধু একটাই রাগ রিমার কথা দীপ্ত কেন ওকে বলেনি। দীপ্ত ওকে বোঝায় রিমার কথা ও মনে করতে চায়না; ওটা ওর একটা বেদনাময় অংশ ছিল। যেদিন থেকে মধুমিতার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় সেদিন থেকে ও শুধু মধুমিতার। দীপ্ত শেষ পর্যন্ত বোঝাতে সক্ষম হয়। আস্তে আস্তে মধুমিতা নিজের ভুল বুঝতে পারে। তারপর থেকে মন দিয়ে সংসার করতে চেষ্টা করে। দীপ্ত আর মধুমিতার মধ্যে সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়। ওদের মধ্যে আরেক অতিথি আসে মাস তিনেক আগে। ওদের মেয়ে অন্বেষা।এই আনন্দের সময় দীপ্তর মনে পড়ে ওর মায়ের কথা। একদিন কথাপ্রসঙ্গে মধুমিতার কাছে ও বলে আমার স্বপ্ন ছিল আমার স্ত্রী আমার মায়ের মত করে বাড়িতে লক্ষ্মী পূজো করবে। মধুমিতা সেকথা শুনে রাজী হয়ে যায়। আনন্দের সাথে এবার গ্রামের বাড়িতে এসে এবার দীপ্তর কথা মতো একদম লাল পাড়ে শাড়ি, পায়ে আলতা পড়ে লক্ষ্মী পূজো করে আর শেষে পাঁচালি পড়ে একদম মায়ের মতো করে।দীপ্তর মনে পড়ে যায় হারিয়ে যাওয়া মায়ের সাথে বসে লক্ষ্মী পূজো দেখার কথা। আজ আনন্দে দীপ্তর চোখে ঘুম নেই। ঘরের মধ্যে ছেলে মেয়ে নিয়ে মধুমিতা ঘুমিয়ে পড়েছে, সারাদিন খাটাখাটনি করে ক্লান্ত হয়ে। দীপ্ত ব্যালকনিতে আনন্দের জ্যোৎস্নায় স্নান করছে। আজ যে ওর মনে বাসা বেঁধে ছিল যে স্বপ্ন তা পূরন হয়েছে।শ্রীমতি রাখি রায়বর্ধমান

নভেম্বর ০৬, ২০২২
নিবন্ধ

ফারাও এর দেশ ঘুরে... (ভ্রমণ কাহিনী) প্রথম পর্ব

শুরুর কথাইতিহাসের ছাত্রী হয়েছি অনেক বড় বয়সে। ছোটবেলায় ইতিহাস নিয়ে পড়ার কথা খুব একটা ভাবিও নি। তবে যেটা ছোট বেলা থেকেই আকর্ষণ করত, তা হল গল্প। গল্প শুনতে বা পড়তে তখন ও ভালো লাগত আজও লাগে। বিভিন্ন দেশের গল্প, বিভিন্ন সময়ের গল্প। বাবা অনেক দেশের বই কিনে দিতেন আর মা পড়ে শোনাতেন। একটু বড় হতে নিজেই পড়তে থাকতাম সে সব। পুরাণ, রুপকথা, ইতিহাস ছোটোদের মতন করে লেখা বই সব। আর সেই রকম ই একটা বই আমার ছিল, Wonders of the World। এই বইটার হাত ধরেই প্রথম পরিচয় হল পিরামিড এর সাথে। এতটাই আশ্চর্য হয়ে গেছিলাম যে বলার নয়। পিরামিড, হিয়েরগ্লিফ, ফারাও তুত, সব মিলিয়ে কেমন ঘোর লেগে গেল। তখনও বুঝিনি যে এই ঘোর অনেক দিন ধরে তাড়া করে বেড়াবে আমায়।বড় হতে লাগলাম এই স্বপ্ন নিয়ে যে একদিন যাব, দেখব, বুঝব মিশরকে। বাবার কাছে মিশর সংক্রান্ত অনেক বই ছিল। খালি ঘাঁটতাম। একদিন আনন্দমেলা বা কোন একটা মাসিক পত্রিকা থেকে জেনে ফেললাম কার্টার ও কারনারভান এর আভিশাপ এর গল্প। সত্যজিৎ নিয়ে গেলেন শেয়াল দেবতার কাছে। জেনে ফেললাম আনুবিস কি ভয়ঙ্কর শক্তিশালী। মিশর রহস্য তে সুনীল গাঙ্গুলী প্রথম ভাল ভাবে সেখালেন হিয়েরগ্লিফ কাকে বলে আর কি ভাবেই বা সেতা লেখা বা পড়া হয়। কাকাবাবুর আর সন্তু কে যেন স্বপ্নে দেখতে পেতাম আর ভাবতাম অদের সাথে আমিও চলেছি রহস্যের সমাধানে। ইংরেজি ছবির হাত ধরে The Mummy দেখে জানার চেষ্টা করলাম মিশরীয় ভাবনা চিন্তা। এ সব ই যেন আমায় মিশরের সাথে আর বেশী করে জুড়ে দিচ্ছিল। আর চোখের সামনে মিশর দেখার স্বপ্ন টাকে তৈরি করতে সাহায্য করছিল।ইতিহাস নিয়ে যখন পড়তে শুরু করলাম, পৃথিবীর ইতিহাস syllabus এ ছিলনা। তবুও বোঝার চেষ্টা করতাম যে আমাদের সাথে অদের কি মিল, কথায় মিল। আমাদের দেশের পুরাণ বা কিংবদন্তির সাথে ওদের এত সাযুজ্য কেন। যেমন Geranldine Pinch বলেছেন many definitions have been proposed সেই থেকেই ধরে নিতে থাকি যে ওরা আর আমরা মানুষ বলেই এত সাযুজ্য। তবে পরে ভুল ভাঙে আর বুঝতে পারি যে ওরা, মিশরীয় রা আমাদের থেকেও অনেকটাই উন্নত মানের মানুষ ছিলেন।পড়া শেষে, ইতিহাস এর শিক্ষিকা হয়ে স্কুলে যোগ দিলাম। বার্ষিক প্রদর্শনী হিসেবে মিশরকে বেছে নিলাম আর অদম্য উৎসাহে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে নেমে পরলাম গবেষণার কাজে। Internet এর যুগে মিশর যেন নিজেকে উজার করে দিতে লাগল আমাদের কাছে। আর বহু দিনের সেই ছুঁতে চাওয়ার ইচ্ছে টাকে বার বার উশকে দিতে লাগল। এর সঙ্গে যোগ হল বাবার উৎসাহ। বিভিন্ন পর্যটন মেলা ঘুরে মিশরে বেড়াতে যাওয়া নিয়ে তথ্য যোগার করে বেড়াতো। আর তাঁর সাথে যুক্ত হল আমার বর। তারও বহুদিনের সখ আর স্বপ্ন যেন মিশে গেল। তারপর আর কি, যেমন ভাবা তেমন কাজ। জীবনসঙ্গীকে আর বাড়ির সবাইকে সঙ্গে করে ২০১৮ এর পূজার ছুটি তে পাড়ি দিলাম মিশর। সঙ্গে অনেক না দেখা স্বপ্ন, কিছু বই , ক্যামেরা আর লেখার খাতা কে নিয়ে। নীলনদের পাড়ে , ফারাও এর দেশে।যা কিছু দেখে এলাম তা ভোলার নয়। তবুও যেন একটা না পাওয়া থেকেই গেল, খালি মনে হতে লাগল যে সব শেষ হল না। তাও যা দেখলাম তাও মন্দ কি।**ফারাও এর দেশ ঘুরে**স্থানীয় সময় দুপুর ১২ টায় আমরা কায়রোর মাটিতে নামলাম। শুরু হল স্বাপ্নের দেশে যাত্রা। ইতিহাস এর ছাত্রী হিসেবে মিশর সব সময়ই প্রিয় বিষয় ছিল। আর স্বপ্ন ও দেখতাম কোন এক দিন ঠিক যাবো সেই দেশ এ। তবে সত্যি সেটা সম্ভব হবে ভাবিনি কোনদিন। নিজের চোখ কে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না যে মিশর আমার সামনে। কায়রোর সুন্দর বিমান বন্দর ছাড়িয়ে যখন বেরলাম মনের মধ্যে এক অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। গাড়ি তে করে রওনা হলাম নিজেদের হোটেলের দিকে। আর অন্য দিকে যেন স্বপ্ন আস্তে আস্তে তার রঙ দেখাতে লাগল। মিশর আসার আগেই ঠিক করে ছিলাম মনে মনে যে, এই কদিন এ যা দেখব সব ক্যামেরা বন্দি করা যাবেনা। তাই চোখের দায়িত্ব বাড়বে অনেকটাই। দেখতে লাগলাম প্রাণ ভরে কায়রো শহর। ধূসর রঙের শহর কায়রো। মরুভুমির কাছে বলে বাতাসে আর্দ্রতা বেশ কম আর তার ফলে নীল আকাশ ঝক ঝক করছে। নীল আকাশের সাথে ধূসর রঙের ঘর বাড়ি এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য তৈরি করেছে।কায়রো কে এক ঝলক দেখলে মনে হবে নিজের দেশেই আছি। মরুভূমির দেশ বলে এখানে বাড়ির রঙ ধূসর বা হাল্কা। চড়া রঙের ব্যাবহার এরা জানেনা। আসলে এদের দেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাস এতটাই বর্ণময় যে অন্য কোথাও রঙ ব্যাবহারের প্রয়োজন হয়না। তবে একটা ব্যাপার বোঝা গেল সহজে, যে এই দেশেরও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আসতে সময় লাগবে । সামাজিক উন্নয়ন ও অনেকটাই পিছিয়ে বলে মনে হল। রাস্তায় ভাল রকম ট্রাফিক জ্যাম পেতে হল তবে অবশেষে আমরা আমাদের হোটেলে এসে উপস্থিত হলাম। দীর্ঘ যাত্রা ও অপেক্ষার অবসান হল।রাস্তায় আসার পথে একটা ব্যাপার দেখে খুব মজা লাগল যে, প্রতিটি বাড়ির ছাদ আবর্জনায় ভর্তি। বাড়ির যত বাতিল জিনিষ পত্র দিয়ে ছাদ বোঝাই। এর কারণ ঠিক বোঝা গেলনা তবে পরে বুঝেছিলাম যে এটা সমগ্র মিশরের ই চরিত্র। যে কোন শহরেই এই এক ব্যাপার। আর কায়রো রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও একটা অদ্ভুত গ্রাম্য চরিত্র আছে, হয়ত সেটা শিকড়ের টানের চটেই।বিমানে আসার কোন ক্লান্তিই যেন আমাদের দমাতে পারছিল না। শুধু মাত্র দুপুরটুকু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধেবেলার আয়োজন নিয়ে মেতে উঠলাম। সন্ধ্যের কায়রোর মধ্যে দিয়ে আমরা চললাম Nile Cruise এ রাতের খাবার খেতে। মানে নীল নদের উপর নৌকা বিহার ও তার সাথে খানা পিনা। নীল নদের সামনে দাঁড়িয়ে মনে পরে যেতে লাগল স্কুলের ভূগোল বই এর প্রশ্ন মিশর কে কোন নদীর দান বলা হয়? বা পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীর নাম লেখ। সেই প্রশের উত্তরে ভুল কখনও করিনি তবে এটাও ভাবিনি যে একদিন সেই নদীর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারব। চওড়া নদী, রাতের অন্ধকারেও তার গভীরতা সম্মন্ধে যথেষ্ট ধারণা করা যায়। শহরের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া সত্ত্বেও নংরা আবর্জনা নদীর ধারে নেই। নদীর দুই পাশ সুন্দর করে বাঁধিয়ে দেওয়া আছে। শহরের বিভিন্ন আলো নীল নদ কে ছুঁয়ে যেন নিজেদের ধন্য করে নেবার চেষ্টা করছে। এত বিশাল সেই নদীর সামনে দাঁড়িয়ে আমার কেমন যেন মনে হল যে, এই যে সব কিছু হচ্ছে তাতে নীল এর কিছু এসে যায়না। সে যেন আপন তালে আপন ছন্দে ও গতি তে বয়ে চলেছে, বয়ে চলাটাই তার এক মাত্র কাজ, যা সে জীবনের শুরু থেকে করে আসছে। এত কিছু ঘটেছে তার চোখের সামনে, সব কিছুর সাক্ষী সে। তাই এই সব মানুষ জন দের বেশি উৎসাহ নিয়ে তার কোন মাথাব্যাথা নেই।আমরা Nile Pharaoh নামের একটি নৌকা বা cruise এ উঠলাম। নৌকার সামনেটা খুব সুন্দর করে সাজানো। পুরো নৌকা টাই ট্র্যাডিশনাল মিশরীয় ধাঁচে সাজানো। মিশরীয় solar boat এর আদলে। নৌকায় প্রবেশের মুখ পাহারা দিচ্ছে রাজার প্রহরীরা। নৌকার ভিতরে অনেক টেবিল সাজানো আর তার এক পাশে একটি মঞ্চ, সেখানে নাকি নাচ গান হবে। নৌকার ছাদেও যাওয়া যায় সেখানেও টেবিল পাতা আছে।Nile Pharoa, বোট, কায়রোছাদে গিয়ে বেশ শীত শীত করছিল। নীল নদের উপর দিয়ে বয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়ার চোটে। নৌকা চলতে শুরু করল রাত ৮ টায়। আর তার সাথে শুরু হল সেই খালি মঞ্চে বেলি ড্যান্স belly dance আর সুফি গানের অনুষ্ঠান। বিভিন্ন রকম খাবারের মধ্যে দিয়ে শুরু হল রাতের খাওয়া। খাওয়া শেষ করে গেলাম নৌকার ছাদে। নীল নদের কালো জল ঠেলে এগিয়ে চলেছে নৌকা। গোটা শহরটাকে দেখা যাচ্ছে নদী থেকে। জলের আসা যাওয়া দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল যে, এই সেই নীল নদ। যাকে নিয়ে পৃথিবী জুড়ে গল্প বা রোমাঞ্চের শেষ নেই। যার তৈরি প্লাবন ভূমিতে তৈরি হয়েছে পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শন তার উপর দিয়ে বয়ে চলা নৌকাতে চলেছি আমি। আর আজও, এত আধুনিক যুগেও মিশরের জন্য এই নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। রাত প্রায় ১০.৩০ নাগাদ আমাদের নৌকা ভ্রমণ শেষ হল আর ক্লান্ত শরীরে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। রাতে ভাল ঘুম আমাদের সবার অত্যন্ত প্রয়োজন কারণ পরের দিনের জন্য নিজেদের তৈরি করতে হবে।শ্রেয়া ঘোষ (বর্ধমান)ক্রমশ...

নভেম্বর ০৫, ২০২২
নিবন্ধ

শহরের কোলাহলের বাইরে এ যেন মনে গাঁথা ভিন্ন পৃথিবী

মোড়াটা বসতে দে। চেয়ার তো নেই। বিনয়ের সঙ্গে পরিতোষ বললেন, ওটাতেই বসতে হবে। মোড়াটা এগিয়ে দিল বিনু। ছিন্নভিন্ন খড়ের চাল যেন মাটি ছুঁয়ে ফেলেছে। মাটির দাওয়া। ঘরে-বাইরে চারিদিক অগোছাল। এদিক-ওদিক ঝুলছে কাপড়-জামা। প্রতি পদে দারিদ্রতার স্পষ্ট ছাপ। তবু আথিতেয়তায় যেন কোনও খামতি নেই পরিতোষ হেমব্রমের। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর আবস্থা। দিনমজুরি করেই সংসার টেনে চলেছেন বছর পঞ্চাশের পরিতোষ। কলকাতা থেকে বাঁকুড়ার রাণীবাঁধে গ্রাম দেখতে গিয়েছে রকিরা। আসলে তাঁদের গন্তব্য ছিল মুকুটমনিপুর। বর্ষায় প্রকৃতির অসাধারণ শোভা দেখতে সেখানে যাওয়া। এরই ফাঁকে আদিবাসীদের গ্রাম দেখতে ইচ্ছে হয় উৎকল ও রেশমির। শহরের দূষণে জীবন জেরবার। তাই নির্মল গ্রামের সন্ধানে জঙ্গলমহল। সেই উদ্দেশ্যে ৫ বছরের ছেলে রাহুলকে নিয়ে পরিতোষদের বাড়িতে তিনজনেই হাজির। রাহুলের ডাক নাম রকি। আগে থেকেই কিছুটা পরিচয় ছিল পরিতোষের সঙ্গে। প্রথমবারের সাক্ষাতে আথিতেয়তায় মুগ্ধ উৎকল-রেশমিরা। পায়ের সামনে ঘটিতে জল রেখে প্রণাম করে পরিতোষের স্ত্রী। পাল্টা নমস্কার করে উৎকল-রেশিমি। অতিথিদের চা-বিস্কুট খেতে দিল রানি, পরিতোষের স্ত্রী। রানি তাঁদের দুপুরের আহারের করার জন্যও আবদার করতে থাকে। না খেয়ে এখান থেকে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই, বলে রানি। প্রত্যন্ত গ্রামে আদিবাসীদের ব্যবহারে মুগ্ধতার কথা বলেই ফেলল রেশমি। সে বলে ওঠে, আমরা এসেছি গ্রাম দেখতে। জঙ্গলমহলের আদিবাসী মানুষজনের জীবন-জীবীকা, জীবনবোধ, পরিবেশ দেখার অসীম আগ্রহ নিয়েই এসেছি এখানে। কিন্তু ব্যবহারে এমন আন্তরিকতা পেতে পারি তা আশাই করতে পারিনি। এঁদের সঙ্গে না রক্তের সম্পর্ক না আগে কোনও দিন দেখা হয়েছে। একথা ভেবে মনের মধ্যে বির বির করতে থাকে রেশমি। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ওই পরিবারের সদস্যদের দিকে। পরিতোষের মেয়ে ঝুমুরও জোরাজুরি করছে। অথচ এঁরা কেউ কাউকে দেখা তো দূরের কথা তাঁদের সম্পর্কে কোনও কথাই শোনেনি। অযাচিত অতিথিকে আদিবাসীরা এতটা আপন করে নেয়, ভাবতে থাকে উৎকল। যেটুকু পরিচয় ওই পরিতোষের সঙ্গে উৎকলের। তাও এক বন্ধুর মারফৎ। সেই সূত্রে পরিতোষদের বাড়িতে চলে আসা।কনভেন্টে পড়াশুনা করে রাহুল। এবার রেশমিদের মনে উদ্রেক হয় পরিতোষের মেয়ে কী আদৌ পড়াশুনা করে? এমন প্রত্যন্ত গ্রাম, তারওপর সংসারের বেহাল দশা। নুন আনতে সত্যি সত্যি পান্তা ফুরানোর অবস্থা। পোষাক-পরিচ্ছদেও তার স্পষ্ট ছাপ। জিজ্ঞাসা করা ঠিক হবে কীনা ভাবতে থাকে রেশমি। কিন্তু কৌতুহল বেশিক্ষণ চাপা থাকেনি। শেষমেষ রানিকে জিজ্ঞেস করে রেশমি। মেয়ে কোন ক্লাসে পড়ছে? রানি বলে, সংস্কৃতিতে অনার্স গ্রাজুয়েট হল এবছরই। জানি না চাকরি-বাকরি পাবে কিনা। সরকারি চাকরি পাওয়ার আশা তো না করাই ভাল। তাছাড়া আমাদের টাকা-পয়সাও নেই। যাক ওই পড়াশুনাটা তো হয়েছে। এই আর কি। আসলে মেয়ের চেহারা স্লিম ঠিক নয়, একেবারেই রুগ্ন। দেখলে মনে হবে ক্লাস এইট-নাইনের ছাত্রী। দরিদ্র আদিবাসী পরিবারে যাঁদের অন্নের সংস্থান করতেই ঘাম ছুটছে, সেই বাড়ির মেয়ে অনার্স গ্রাজুয়েট। পড়াশুনা করতে যেতে হত ৪০ কিলোমিটার দূরের বাঁকুড়া শহরে। শিক্ষকও নেই গ্রামে। এসব শুনে মনপ্রাণ জুড়ে যায় রেশমির। শহরের মানুষের অহঙ্কারের কথা ভেবে নিজেকেই ছোট ভাবতে থাকে রেশমি। এমন প্রত্যন্ত গ্রাম, বাড়িতে অর্থের সংস্থান নেই, পরিবারের কেউ কলেজ কেন স্কুলের গন্ডিও পার করেনি। অথচ সেই বাড়িতে অনার্স গ্রাজুয়েট। পড়াশুনার জন্য কত লড়াই! কথা-বার্তায় সেটুকুও বোঝার উপায় নেই। রেশমি ভাবতে থাকে, অথচ এদের কোনও চাকরিও জুটবে না। এসটি কোটা থাকলেও কী যায় আসে।চা বিস্কুট খেয়ে, ভাল-মন্দ গল্পগুজবকে সঙ্গী করে পরিতোষদের বাড়ি ছাড়ে উৎকল-রেশমিরা। তার মধ্যে ছোট্ট রাহুল বায়না ধরে লালঝুটি মোরগ নেবে বলে। রেশমিরা যখন গল্পে মত্ত তখন রাহুল ছুটে বেরিয়েছে ছাগল, মোরগদের পিছনে। এই অনাবিল আনন্দ তো আর শহরে পাবে না। সেখানে তো কৃত্তিমতায় ভরা। চরম আত্মকেন্দ্রীক সমাজ। দুই পরিবেশে বিস্তর তারতম্য উপলব্ধি করতে থাকে উৎকলরা। পরিতোষদের বাড়িতে দুটো গরু, গোটা চরেক ছাগল, ১৯-২০টা মোরগ-মুরগি আছে। এসব দিয়ে কিছু অর্থের সংস্থান হয় আর কী। রানি বলে, মোরগ নিয়ে গেলে নিয়ে যান। কিন্তু তা-তো আর সম্ভব নয়। ঘন্টাখানেক পরিতোষদের বাড়িতে ছিল ওরা। কিন্তু যেন তারই মধ্যে এমন টান জন্মে গিয়েছে পরিবারটির প্রতি উঠতেও যেন তাঁদের মন করছে না। মানুষ তাহলে এখনও আছে। শিক্ষার জন্য গরীব মানুষের লড়াই আছে। আর্থিক দৈন্যতা সত্বেও আন্তরিকতা আছে পূর্ণমাত্রায়। অজানা পরিবারেও আত্মার টানের উপলব্ধি আছে। এসব ভেবেই বিহ্বল হয়ে উঠল রেশমি। যদিও কলকাতায় পাশের ফ্ল্য়াটের লোকজন কেউ কারও খবর রাখে না। দেনা-পাওনার হিসেবেই সবাই ব্যস্ত। তাঁর কাছে এ যেন শহরের বাইরে এক নতুন পৃথিবী। নয়া জগত।আদিবাসী গ্রাম থেকে ফের মুকুটমনিপুরের অতিথিশালায় গিয়ে ওঠে উৎকলরা। পড়ন্ত বিকেলে কংসাবতীর ড্যাম দেখতে অতিসুন্দর। তারওপর বর্ষাকালে টইটুম্বুর জলে আকর্ষণ বেড় গিয়েছে আরও বেশ কয়েকগুন। লকগেট থেকে মাঝে-মধ্যে জলও ছাড়া হচ্ছে। মহানগরের কোলাহল থেকে মাথার চাপ হালকা করতে এভাবে হঠাৎ হঠাৎ অনেকেই ছুটে যান পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্রে। স্বল্প সময়ে অল্প পরিচিত পরিতোষ হেমব্রমের পরিবারের আদর-আপ্যায়ন, মেয়ের পড়াশুনার খবরে উৎকল-রেশমির মন যেন অজানা আনন্দে ভরে গিয়েছে। কংসাবতীর ড্যামের সৌন্দর্যও যেন তার থেকে ম্লান। ফুরফুরে বাতাসে শ্বাস আর বাড়তি কনফিডেন্স নিয়ে কলকাতায় ফিরে ফের কাজে মন দিল উৎকলরা। কিন্তু ভোলেনি বাঁকুড়ার রানিবাঁধে হেমব্রমদের। তা যে মনে গেঁথে আছে।

অক্টোবর ৩০, ২০২২
নিবন্ধ

'রামের মূর্তি' কিছুতেই সরানো গেলনা রানীর শয়ন কক্ষ থেকে, জানুন বুন্দেলখন্ডের ইতিহাস

বুন্দেলখন্ড, ভারতের মানচিত্রে অতি প্রাচীন ভুখন্ড বলে পরিচিত। বিন্ধ্য পর্বতমালার দক্ষিণে, শাল, সেগুন, পলাশের জঙ্গলের মধ্যে বেতোয়া নদীর ধারে অবস্থিত এই রাজ্য। বুন্দেল রাজারা প্রায় ২০০ বছর এই রাজ্যে রাজত্ব করেছিলেন, যার রাজধানী ছিল ওরছা। সারা রাজ্য জুড়ে বিভিন্ন ভাঙা পাঁচিল, বাড়ি, বাড়ির দেওয়াল, কুলুঙ্গি সেই গৌরবময় দিনের সাক্ষী । বেতোয়া নদীর ধারে এই বংশের রাজাদের স্মৃতি সৌধ দেখলে তাদের সৌর্য বীর্যের কথা বোঝা যায়। এই স্মৃতি সৌধ গুলো কে বলা হয়, ছত্রী। কথিত আছে, কিংবদন্তি রাজা মধুকর শাহ ছিলেন কৃষ্ণ ভক্ত, তাঁর রানী গণেশ কুমারী ছিলেন রাম ভক্ত। রানী অযোধ্যা থেকে রামের মূর্তি নিয়ে এলেন পুজোর জন্য। রামের জন্য বানানো হলো চতুর্ভুজ মন্দির। মন্দির তো হলো, তবে রামের মূর্তি রানীর শয়ন কক্ষ থেকে সরানো গেলনা কিছুতেই। ফলে রাজা রানীর মহলকেই মন্দির বানিয়ে দিলেন তার নাম হলো রাজারাম মন্দির, এখানেই একমাত্র শ্রী রাম পূজিত হন রাজা রাম হিসেবে। রানী চলে গেলেন অন্য মহলে। আর চতুর্ভুজ মন্দিরে পরে প্রতিষ্ঠিত হলেন বিষ্ণু।বুন্দেলা বংশের সব থেকে উল্লেখ্যযোগ্য রাজা ছিলেন বীর সিং বুন্দেলা। তিন প্রজন্ম ধরে তৈরী হতে থাকা রাজপ্রাসাদ, শেষ করলেন তিনি, নাম দিলেন রাজা মহল। বীর সিংয়ের সময়ে দিল্লীতে রাজত্ব করছেন বাদশা আকবর।বারবার বুন্দেলাদের আক্রমণ করে ক্ষত বিক্ষত করার চেষ্টা করছেন,কিন্তু হার মানবার পাত্র ছিলেন না বীর সিং। খুঁজে বের করলেন আকবরকে জব্দ করার কৌশল। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিক, বাদশা আকবরের পুত্র, রাজকুমার সেলিম বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে আগ্রা ছেড়েছেন, আশ্রয় নিয়েছেন, বেনারসের কেল্লায়। বীর সিং, বন্ধুত্বের হাত বাড়ালেন সেলিমের দিকে। দুজনে মিলে, আকবরের বিশ্বস্ত আবুল ফজল কে হত্যা করার ফন্দি করলেন, বারে বারে আকবর এঁদের আঘাতে আহত হতে থাকলেন।ভারতের মানচিত্রে অতি প্রাচীন ভুখন্ড বুন্দেলখন্ডশেষে ১৬০৫ এ আকবরের মৃত্যুর পর, সেলিম, জাহাঙ্গীর নাম নিয়ে মুঘল সিংহাসনে বসলেন। তবে বন্ধু বীর সিং কে জাহাঙ্গীর মনে রেখেছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত। বাদশা হবার পর বীর সিং এর নিমন্ত্রণ রক্ষার জন্য একবার তিনি ওরছা আসেন। তাই তৈরি করা হয় অপূর্ব পাঁচ মহলা জাহাঙ্গীর মহল। অপূর্ব তার নকশা আর অপূর্ব তার স্থাপত্য পরিকল্পনা। রাজপুত ও ইসলামীয় রীতি মিশিয়ে এক অনন্য সৃষ্টি। বুন্দেলা রীতি অনুযায়ী প্রতি ঘরে বা দেওয়ালে অসংখ্য কুলুঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। ছাদ থেকে গোটা ওরছা শহরটাকে বড়ো সুন্দর দেখতে লাগে। পাথরের জাফরির কাজ যে কি অদ্ভুত হতে পারে, তা এই প্রাসাদ না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ভাবতে অবাক লাগে, এই সাত মহলা প্রাসাদে কেউ কোনোদিন থাকেনি। পরবর্তী কালে এটি শুধু অতিথি শালা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে আজ এই বিশাল রাজধানী আজ সবার কাছে অবাঞ্ছিত। সেই দিনের জাক জমক আজ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে কালের চাকায়।শ্রেয়া ঘোষ, (বর্ধমান)

অক্টোবর ২৬, ২০২২
নিবন্ধ

খাজুরাহো মন্দিরের ভাস্কর্য ও স্থাপত্য চান্দেলা রাজবংশের অনন্য কীর্তি

চান্দেলা রাজ বংশের অমর কীর্তি খাজুরাহের মন্দির সমূহ। ভাস্কর্য, স্থপতি শিল্প, ধর্ম, পুরাকথা আর ভারতীয় সংস্কৃতির এত সুন্দর মেল বন্ধন ভারতের আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় বলে মনে হয় না। পশ্চিম,পূর্ব, ও দক্ষিণ মন্দির সমুহ মিলে অপূর্ব এক গ্রন্থি বন্ধন করে খাজুরাহতে। প্রতিটি মন্দির ভারতীয় শাস্ত্রীয় স্থাপত্য শিল্পের রীতি মেনে, মণ্ডপ,অর্ধ মণ্ডপ,মহা মণ্ডপ, অন্তরলয়, গর্ভগৃহ এই ভাবে বিভক্ত। প্রধান মন্দির গুলি হলো, লক্ষণ মন্দির,বরাহ মন্দির, কান্ডারিয়া মহাদেব মন্দির,জগদম্বি মন্দির,চিত্রগুপ্ত মন্দির,বিশ্বনাথ মন্দির, জাভেরি মন্দির, বামন মন্দির, ব্রহ্মা মন্দির, আদিনাথ মন্দির ও পার্স্বনাথ মন্দির। এর মধ্যে শেষের দুটি জৈন মন্দির হলেও এর মধ্যেও খাজুরাহ শৈলী লক্ষ্য করা যায়। খাজুরাহ মন্দিরের বিশেষত্ব হলো অপূর্ব সুন্দর ভাস্কর্য। চান্দেলা রাজবংশের অনন্য কীর্তিসারা পৃথিবীর কাছে এর আকর্ষণ হলো কামোত্তেজক বা যৌন আবেদন মূলক মূর্তি। তবে বলে রাখা ভালো যে তার সংখ্যা এতটাই কম যে সেটি নিয়ে মাতামাতি করা শোভা পায়না। ঐতিহাসিক মতে ওই মূর্তি গুলি, তান্ত্রিক চর্চা থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। নবম - দশম শতাব্দী তে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরোধিতা করে তান্ত্রিক ও ভক্তি ধারার ব্যাপক প্রচার ঘটে। সেই প্রভাব থেকেই এই ধরনের প্রতিবাদী ধারার প্রচলন বলে মনে হয়। পশ্চিম মন্দির সমূহের মধ্যে সব চেয়ে বড় হলো কান্ডারিয়া মহাদেব মন্দির। এই মন্দিরে শিব পূজিত হন। এটিতে ৮৪ টি শিখর লক্ষ্য করা যায়,যাতে ১০০০ কাছাকাছি অপ্সরা মূর্তি, দশ দিকের দশ দিকপালের মূর্তি ও বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা ও চন্দেলা বংশের প্রতীক সিংহ মূর্তি দেখা যায়। এটি চান্দেল রাজ বিদ্যাধর বানিয়েছিলেন। এর এক চত্বরে আছে জগদম্বী মায়ের মন্দির। যা নবরাত্রি চলাকালীন প্রাণ পায়,ভক্তদের আনাগোনায়। এই কদিন সেখানে অবাধ যাতায়াত করা যায়, দেবীর দর্শনের জন্য।প্রতিটি মন্দির উত্তর ভারতীয় ঘরানাতে বা নাগরা শৈলী তে বানানোএই মন্দিরটি আগে বিষ্ণুর মন্দির ছিল, পরে এটি দেবীকে উৎসর্গ করা হয়। প্রতিটি মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজার শোভিত রয়েছেন দুই দেবী - গঙ্গা যার বাহন মকর আর যমুনা যার বাহন কচ্ছপ। এই দুই দেবী একাধারে পবিত্রতার প্রতীক তার সাথে হিমালয়ের প্রতীক। মন্দির গুলির ভার বহন করছে হাতির দল,যা শক্তি আর বুদ্ধির প্রতীক।এই মন্দিরগুলি সাধারণ ভাবে বেলেপাথর দিয়ে তৈরি,তবুও পাথরে রঙের বৈচিত্র্যতা লক্ষ্য করা যায়। যত গাঢ় রঙের পাথর ততোধিক শক্ত, যত হালকা তত নরম। ফলে প্রায় ১০০০ বছর ধরে ক্ষয় হয়েছে হালকা রঙের পাথরের মূর্তি। তার সাথে চুরিও হয়েছে আরো অনেক। তবুও ভাবতে অবাক লাগে, যে এত বছর আগে শুধু মাত্র ছেনি আর হাতুড়ি দিয়ে এই অপূর্ব সৃষ্টি কি ভাবে সম্ভব হলো!প্রতিটি মন্দির উত্তর ভারতীয় ঘরানাতে বা নাগরা শৈলী তে বানানো। এই মন্দির প্রতিষ্ঠার পৃষ্ঠপোষক হিসাবে নাম নেওয়া যেতে পারে, চান্দেল রাজ যোশবর্মন এবং বিদ্যাধর এর। তাদের সময়ে চন্দেল রাজবংশ প্রভাব ও প্রতিপত্তি তে অনেক বড় হয়ে ওঠে। তারই ফল স্বরূপ এই মন্দিরের স্থাপনা। যা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের গৌরবময় ইতিহাসের কথা। কিছু মন্দিরে ইসলামি স্থাপত্যের ও ছোঁয়া দেখা যায়,যা আবারো আমাদের সম্প্রীতির কথা মনে পরিয়ে দেয়। এক কথায় ,যেমন এখনকার মানুষ জন বলে থাকেন,যে খাজুরাহ এর মন্দিরে শিল্পীরা গোটা ব্রহ্মাণ্ড কে ধরার চেষ্টা করেছেন, ঠিক তেমনই বলা যায় ভারতবর্ষ কেও ধরা আছে এই খাজুরাহর প্রতি টি মন্দিরের কোনায় কোনায়।শ্রেয়া ঘোষ (শিক্ষিকা)বর্ধমান

অক্টোবর ০৭, ২০২২
নিবন্ধ

স্বীকারোক্তি (ছোট গল্প)

গাড়িটা গ্রামের পথ ধরতেই মনটা যেন কেমন ভেসে গেল শরতের আকাশে সাদা মেঘের মত। দুপাশে সবুজ ধানক্ষেতের পাশে সাদা কালো ফুলের বন কতদিন পর দেখে মনটা নেচে উঠল। কতদিন পরে গ্রামের মাটির গন্ধ নিল বুক ভরে । প্রায় পনেরো বছর গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে গেছে চেতনা। আর প্রায় আট বছর দেশ ছাড়া। গ্রামের দূর্গা পূজো দেখেনি কতদিন। গ্রামের এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। রাস্তা ঘাট আর আগের এবড়োখেবড়ো নেই, সামান্য বৃষ্টির জলে যেখানে সাঁতার কাটা যেত। স্কুল থেকে ফেরার পথে ওই জমা জলে লাফিয়ে খেলা করে জামা ভিজিয়ে বাড়ি গিয়ে মায়ের কাছে বকা খেয়েছে কতদিন। গ্রামে ঢোকার মুখে গাড়ি থামিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠের সামনে দাঁড়িয়ে মনের জানালা দিয়ে উঁকি দিতে লাগল চেতনার ছেলেবেলা। মেধা আর চেতনা দুই বন্ধু। গ্রামের লোকে বলত হরিহর আত্মা। মেধার মা ছিল না, তাই চেতনার মা ওকে খুব স্নেহ করতেন। চেতনা মাঝে মাঝে ওর মাকে বলত, তুমি আমার থেকে মেধাকে বেশি ভালোবাসো। অন্যদিকে মেধার বাবা চেতনা কে বলতেন তুই আমার আরেক মেয়ে। এইভাবে উভয়ের বাড়িতে উভয়েই ভালোবাসা পেয়েছে। এই ভাবে বড় হতে থাকে দুজনে। চেতনা বরাবর পড়াশোনায় খুব ভালো আর মেধা মোটামুটি। কিন্তু কোনো দিন চেতনাকে হিংসা করেনি। বরং ও খুব খুশি হত চেতনার রেজাল্টে। বলত , কার বন্ধু দেখতে হবে তো। চেতনা মাধ্যমিক পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করলো। ওর ইচ্ছা ছিল কোনো ভালো স্কুলে পড়ার কিন্তু ওর বাবার সামর্থ্যের বাইরে তা, তাই কাছাকাছি জেলার স্কুলে ভর্তি হলো। মেধা ও একই স্কুলে ভর্তি হলো। যদিও চাইলেই অন্য আরও বড়ো স্কুলে ভর্তি হতে পারতো কিছুতেই যে দুজনে আলাদা হবে না। একই জায়গায় মেডিকেল কলেজে পড়ত ওই গ্রামেরই ছেলে তড়িৎ। ওই ওদের ভর্তির সব ব্যবস্থা করে। তিনজন এক সাথে যাতায়াত করে। পড়াশোনার বিভিন্ন বিষয়ে সাহায্য করে চেতনাকে। চেতনা স্বপ্ন দেখে অনেক বড় ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু ভাবে কি করে সম্ভব? ওদের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। বাবা গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করেন আর কিছু জমি জায়গা আছে। আজকের দিনে হয়ত অনেক কিন্তু তখন ওটা সামান্যই ছিল। জানে যে জেলা মানে মেধার বাবা সবরকম সাহায্য করবে ও চাইলে কিন্তু ও চায়না সেটা। ও নিজের স্কলারশিপের টাকাতেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। তাই পড়াশোনা খুব মন দিয়ে করে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করত হবে। জয়েন্টে ভালো ফল করতে না পারলে সরকারি কলেজে ভর্তি হতে পারবে না। পড়াশোনা হবে না এইসব ভেবে দিনরাত পরিশ্রম করে আর ওকে সাহায্য করে যায় তড়িৎ। এইভাবে কখন যে দুটি মন কাছাকাছি এসে যায় নিজেরাই বুঝতে পারে না। জানে শুধু মেধা। ওই ওদের মধ্যে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে। এরপর জয়েন্টে খুব ভালো ফল করে চেতনা শিবপুরে পড়তে চলে যায়। মেধা ওখানেই ইকনমিক্স নিয়ে ভর্তি হয়। মেধার বাবা চেতনাকে পড়াশোনা করতে সাহায্য করতে চান। কিন্তু চেতনার বাবা নিজের জমিজমা বিক্রি করে মেয়েকে পড়াবেন ঠিক করেন। তড়িৎ আর মেধা মাঝে মাঝে যায় চেতনার সাথে দেখা করতে। ছুটি ছাটা য় চেতনা চলে আসে গ্রামে। এইভাবে চলতে থাকে ওদের ছাত্র জীবন। তারপর হঠাৎ হয় ছন্দপতন। মেধার গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হতেই জানতে পারে ওর বিয়ের কথা। মেধার বাবা একদিন ফোন করে বিয়ের বাজার করার জন্য। আর সেই সময় যে ধাক্কা টা খায় আজও তার রেশ রয়ে গেছে। গাড়িতে তড়িৎ কে দেখে অবাক হয়ে বলে, তুমি! মেধার জন্য শাড়ি কী তুমি পছন্দ করবে? তখন জেঠুর উত্তর শুনে চমকে ওঠে। জেঠু মানে মেধার বাবা বলেন ও না থাকলে বরের পোশাক পছন্দ করবে কে? আচ্ছা তাই বলো। আমি ভাবলাম ---বলে ও চুপ করে যায়। মেধা তখন বলে ওঠ ওঠ গাড়িতে ওঠ। পরে সব জানবি। চেতনা বুঝতে পারে না কি ঘটছে। চেতনা কোনোরকমে ওদের সঙ্গ দেয়। ওকে হোস্টেলে ছাড়ার সময় মেধা বলে আগামী অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম সপ্তাহে আমার বিয়ে। তোকে কিন্তু দুই তিন দিন আগে আসতে হবে। তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল? ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওদের গাড়ি ছেড়ে দেয়। চেতনা যেন খুশি হতে পারছে না মেধার বিয়ের কথা শুনে। মনে হচ্ছে কি যেন আড়ালে রাখতে চাইছে মেধা। তড়িৎ কে ফোন করলে ফোন ধরে না। চেতনা আরও উতলা হয়ে পড়ে। ওর রুমমেট সুদেষ্ণা বোঝে কিছু একটা চলছে ওর মধ্যে। বারবার জানতে চায় চেতনার কাছে যে কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা? কিন্তু কি করে বলবে ও নিজেই তো কিছু বুঝতে পারছে না। এগিয়ে আসে মেধার বিয়ে। দুদিন আগে না বিয়ের আগের দিন বিকেলে গিয়ে পৌঁছায় বাড়িতে। ও তখনই মেধার বাড়িতে যেতে চাইলে মা বলে কতদিন পরে এলি, আজ আর যেতে হবে না, একদম কাল সকালে যাবি। মায়ের কথা শুনে অবাক হয় চেতনা। যে মা ওকে সবসময় মেধার সাথে থাকতে বলত আজ সেই কিনা বলছে কাল যাবি! বিস্মিত হয় ও। বিস্ময়ের আরও বাকি ছিল যা বিয়ের দিন ঘটতে থাকে। আর একটা ব্যাপার খুব অবাক লাগে মেধা সেই থেকে আর ওর সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি। ওর বাবা আবার ফোন করে চেতনা কে আসতে বলেন। সকাল বেলা ওদের বাড়িতে যায় ওকে দেখে খুব খুশি হয় মেধার বাবা। মেধা ও রাগ দেখিয়ে বলে এতক্ষণে আসার সময় হলো তোর? চেতনা কিছু বলে না কাজে লেগে পরে। ওদের বাড়ির আত্মীয়স্বজন সবাই চেতনা কে চেনে। তাই ও সহজেই কাজে লেগে যায়। এক ফাঁকে শুধু জিজ্ঞাসা করে তড়িৎ দা আসবে না? মেধা বলে সময় হলেই আসবে। যেন না আসলেও হয় আরকি। চেতনা আর কিছু বলে না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয় চেতনা মেধাকে সাজাতে বসে, সাজানো হয়ে গেলে বাড়ি যায় নিজে তৈরি হতে। মা, বাবা ওনাদের সাথেই চেতনা কে যেতে বলেন। ও একটু বিশ্রাম করে তৈরি হয়ে মা, বাবার সাথে ওদের বাড়িতে ঢোকে। কে যেন হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় বর আসনের কাছে। বরকে দেখে ও বাকরূদ্ধ হয়ে যায়। এ কাকে দেখছে ও! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ও প্রায় পড়েই যেত ওর বাবা এসে না ধরলে। নিজেকে কোনো রকমে সামলে মেধার কাছে যায়। তখন রাগে, দুঃখে, অভিমানে ঠিক রাখতে পারছিল না। ওর মা, বাবা ওকে ধরে রাখেন। মা হয়ত কিছু আন্দাজ করেছিলেন। মেধা কে অভিনন্দন জানিয়ে কোনো রকমে বাড়ি ফিরে আসে। তিনজনের কিছু খাওয়া হয়না। মেধার বাবা অনুরোধ করেন কিন্তু চেতনা শরীর খারাপ লাগছে বলে চলে আসে। মায়ের কাছে খুবই কাঁদে। মুখে কিছু না বললেও মা সব বোঝেন! পরেরদিন ভোর হতেই চলে যায় কলেজে। সুদেষ্ণা ওকে দেখে অবাক হয়। বোঝে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। জানতে চাইলে চেতনা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সব বলে সুদেষ্ণাকে। সুদেষ্ণা ওকে বলে আগে তুই কেঁদে হালকা হয়ে নে তারপর কথা বলব। দুদিন চেতনা বিছানা থেকে ওঠে না। সুদেষ্ণা খাবার এনে ওকে খাওয়ায়। তৃতীয় দিনে ওকে সুদেষ্ণা বলে শোনা তোর ভবিষ্যৎ সামনে। কলেজ ক্যাম্পাসিং এ ভালো ভালো কোম্পানি আসবে তার জন্য তৈরি হতে হবে। ওরা তোর সাথে কী করেছে সেটা ভেবে তুই তোর স্বপ্নটাকে নষ্ট করে দিতে পারিস না। আমি সব মেনে নিতাম যদি এটা মেধা না হয়ে অন্য কেউ হতো। কিন্তু মেধা! আমি ভাবতে পারছি না এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা ও কি করে করল? তাও আমার সাথে। যে কোনো দিন আমাকে হিংসা করেনি! আমি কিছু বুঝতে পারছি না। এই সময় সুদেষ্ণা পাশে না থাকলে হয়তো চেতনার জীবনটা নষ্ট হয়ে যেত। অনেক কষ্টে আবার পড়াশোনাতে মন দেয়। পাশ করার আগেই ভালো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব পেয়ে যায়। প্রথম যায় ব্যাঙ্গালোর, তারপর মুম্বাই আর সেখান থেকে আমেরিকা। এর মধ্যে মা বাবাকে কোলকাতায় নিয়ে চলে আসে। গ্রামের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। দেশে ফিরলেও সুদেষ্ণা ছাড়া কারও সাথে যোগাযোগ রাখেনি।। মহালয়ার কদিন আগে যখন ফোন টা আসে একটু ঘাবড়ে গেছিল অচেনা নম্বর দেখে। ইন্ডিয়ার কল বোঝে, তাই ভাবে মা, বাবার আবার কিছু হলো বোধহয়। কিন্তু ফোন ধরে বুঝতে পারে বৃন্দাবন জেঠু। বলেন, মা আমার একটা অনুরোধ, তুই একবার গ্রামে আয়, মেধা তোকে দেখতে চায়, ও খুব অসুস্থ, মৃত্যু শয্যায়। একথা শুনে চেতনার মনে যত অভিমান ছিল এক নিমেষে কোথায় চলে গেল। রাগ তো কবেই পড়ে গেছে। সোজা দেশে আসার ব্যবস্থা করে;মা, বাবাকেও কিছু জানায়নি। এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি নিয়ে সোজা গ্রামে। মেধা দের বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই জেঠু বেরিয়ে এলেন। যেন ওর জন্যই অপেক্ষায় ছিলেন। হাত ধরে নিয়ে যান সোজা মেধার কাছে। ওর ঘরে ঢুকে দেখে একদম বিছানার সাথে লেগে আছে প্রানবন্ত মেধা। আয় তনি আমার কাছে আয় বলে কৃশ হাত বাড়িয়ে দেয়। তনি নামটি কতদিন পর শুনল চেতনা। এটা ছিল মেধার দেওয়া নাম। ওর এই অবস্থা দেখে খুব কষ্ট হয় চেতনার। ও ছুটে গিয়ে হাতটা ধরে। কি হয়েছে তোর? তুই ঠিক ভালো হয়ে যাবি। আমি এসে গেছি আর কিছু হবে না তোর। চেতনার চোখে জল। তুই আমার জন্য কাঁদছিল কেন? আমার তো এটাই হবার ছিল। আমি তোর সাথে যেটা করছি সেটা যে মহাপাপ। বিশ্বাস ঘাতকতা করেছি তোর মত বন্ধুর সাথে। আমার পাপের শাস্তি ভোগ করছি। কেন এমন বলছিস? তুই চুপ কর। বলে চেতনা। আমাকে আজ বলতে দে। আজ তোর কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করবো বলেই আমার প্রাণ রয়েছে এখনো। চেতনা অস্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করে জেঠু কি হয়েছে ওর? তড়িৎ সামনে আসে, বলে ওকে বলতে দাও কথাগুলো নাহলে ও মুক্তি পাবে না। আমাকে আগে কেন খবর দাওনি তোমরা? কি করে দিতাম? তোমাদের কোনো ঠিকানা জানা ছিল না। তোমাকে যেদিন জানালাম ওই দিন কলকাতায় একটা কাজে গেছিলাম, সেখানেই কাকুর সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। সব জানাই ঠাকুরের। কাকু তোমার নম্বর দেন। চেতনা চুপ করে থাকে। ক্ষীণ গলায় মেধা বলে, বন্ধু হয়ে আমি যা করেছি তার কোনো ক্ষমা হয়না জানি। আমাকে না তড়িৎ কে পারলে ক্ষমা করিস সব শোনার পর। বলতে থাকে মেধা, আমরা তিনজন যখন একসাথে যাতায়াত করতাম করুন আর তড়িৎ বিজ্ঞান বিভাগের হওয়ায় পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করতে খুব। আমি সেখানে চুপচাপ থাকতাম। ধীরে তড়িৎ তোকে পছন্দ করতে শুরু করে আমিই প্রথম সেটা আন্দাজ করি। আমি নিজে অনুঘটকের কাজটা করি। কিন্তু কোথায় একটা খিচ ছিল মনে। তাই তুই যখন পড়তে চলে গেলি আমরা একসাথে যাতায়াত করতাম ঠিক কিন্তু ওর মুখে সবসময় তোর কথা, তোদের ভবিষ্যতের কল্পনা লেগে থাকত। যে আমি তোকে কোনো দিন হিংসা করিনি, তোর রেজাল্ট ভালো হলে আমি পাড়া মাথায় করেছি আনন্দের চোটে সেই আমার মনে তখন হিংসা বাসা বাঁধে। মনে মনে ভাবি কি করে তড়িৎ আমার হবে। ঠিক সেই সময় সূযোগ পেয়ে যাই। তড়িৎ বিদেশি ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চ শিক্ষা নিতে চায় কিন্তু টাকার জন্য আটকে যাচ্ছে। আমি তখন বাবাকে বললাম টাকা টা দিতে, বাবা এককথায় রাজী হয়ে গেল । জানিস তো আমি কিছু চাইলে বাবা না করে না। আমিই তখন বাবা কে বললাম তুমি শুধু তড়িৎ এর বাবার থেকে আমার আর তড়িৎ এর বিয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসবে। বাবা আমার কথায় কোনো প্রশ্ন না করে রাজী হয়ে গেল এবং কাজটা করেও ফেলল। কিন্তু তড়িৎ যখন এসব জানতে পারল তখন ও সবাইকে সব বললো। ওর মা বাবা কে এবং আমার বাবা কে। আমার বাবা প্রথমে বিশ্বাস করেনি কারণ আমি বাবা কে বলেছিলাম আমরা পরস্পর কে ভালোবাসি। তড়িৎ যখন কিছুতেই বিয়ে করতে চায় না তখন বাবা বুঝতে পারে আমি কোন ফন্দি করছি, বাবা আমাকে অনেক বোঝায় কিন্তু তখন তো আমার মাথায় শয়তান বাসা বেঁধে আছে। আমি আত্মহত্যার হুমকি দিই। ব্যস সবাই চুপচাপ বিয়ে তে রাজী হয়ে যায়। কিন্তু আজ পর্যন্ত ও আমাকে স্ত্রী বলে স্বীকার করাতো দুর আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টাও থাকে না। আমি কিছু দিনের মধ্যেই নিজের ভুল বুঝতে পারি। কিন্তু লোকসমাজের জন্য আলাদা হতে পারিনি। আমার একটা ভুল আমাদের তিনটি জীবন নষ্ট করে দিল। আমি তোর কাছে ক্ষমা চাইবো না। শুধু তড়িৎ কে তুই আর ভুল বুঝিস না। ওর কোনো দোষ ছিল না। এই সত্য টা বলব বলেই আমি বেঁচে আছি। এবার আমি নিশ্চিন্তে মরব। এই বলে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে মেধা। আর তখনই চন্ডী মন্ডপে বেজে ওঠে বিসর্জনের বাজনা। ঘরে নীরবতা ছেয়ে যায়। চেতনার চোখ থেকে বসু ধারা বয়ে যায়। তড়িৎ নীরবে তাকিয়ে থাকে মেধার মুখ পানে। আর ওর বাবা শুধু বলেন মেধার স্বীকারোক্তি আজ ওকে কষ্টের জীবন থেকে মুক্তি দিল।

অক্টোবর ০৭, ২০২২
নিবন্ধ

দুর্ঘটনায় স্বামীর অকালমৃত্যুর পর হারিয়ে গেল নবমীসন্ধ্যার এই আনন্দবাসর ছেড়

ওং নমো বিষ্ণু নমো বিষ্ণু নমো বিষ্ণু/নমো, অপবিত্র পবিত্রবা/ সর্বাবস্থা গতহপিবা/ যৎস্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং সবাহ্যাঃ অভ্যন্তরশুচি/ ওং নমো বিষ্ণু নমো বিষ্ণু নমো বিষ্ণু।হাতের তালুতে গঙ্গাজল নিয়ে মুখে ছিটিয়ে রোজকার মতো অঞ্জলি শুরু হলো আজও। দেহমন শুচি করে নিয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে আত্মনিবেদন... তাঁর করুণা-আনুকূল্য প্রার্থনা... সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলির আনুষ্ঠানিকতা--- সব নিয়েই সমাধা হলো মহানবমীর সকালের পুষ্পাঞ্জলি। হালকা রোদ... ফুরফুরে হাওয়া... নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলায় শরৎ আজ মনহারানো খুশী নিয়ে এসে হাজির। আজ মূল পুজো দুপুরে। আমাদের গ্রামের অপেক্ষাকৃত বড় (আকারে ও জনসংখ্যায়) বর্ণহিন্দুপাড়াটি গ্রামের পশ্চিমাংশে। আমরা তাকে ওপাড়া বলে থাকি। সেখানে একটি বারোয়ারীপুজো হয়, গ্রামের অধিষ্ঠাত্রীদেবী মা তারা-র মন্দিরের কাছেই। মহানবমীর দুপুরে ছাগবলী হয় সেখানে। এপাড়া ওপাড়ার পুজোর চার ঢাকী একযোগে দ্রিমিদ্রিমি বোল তোলে সেখানে, সঙ্গে জুটে যায় পুজোর সেরা নতুন পোশাকটি চাপিয়ে গাঁয়ের ছেলে-মেয়ে-বৌ-ঝি-তরুণ-যুবকের দল। মহাপূজার সবচেয়ে জমজমাটি সময় এই গ্রামে নবমীর দুপুরটিই--- অনেক দুমফটাস -ফিসফিস-খিলখিল-রহস্যময়ীহাসির ঝিলিক এর ভাঁজে ভাঁজে!বলি শেষ হতেই বাজনা বাজাতে বাজাতে সবাই হৈ হৈ করে চলে আসে এপাড়ায়। চাতোর-এ ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে আরতি। ভিড়ে ভিড়াক্কার পুজোতলা.. ঢাকঢোলকাঁসরঘণ্টায় কান ঝালাপালা... অনেকক্ষণ ধরে আরতি। চলে যায় ওপাড়ার মানুষরা... শুরু হয় হোম... সুকৌশলে ছোট ছোট কাঠের টুকরো পাঁজা করে সাজিয়ে অগ্নিসংযোগ... একটানা সুরেলা মন্ত্রোচ্চারণসহ ফুল-বেলপাতা-ঘৃতাহুতি... হোম-এর ফোঁটা... শান্তিজল...সকালে অঞ্জলির পর গুছিয়ে নাস্তা হোলো মুড়ি-ঘুগনি-বোঁদে-চা দিয়ে। ঢালা বিছানায় একটু গড়াগড়ি। বর্ধমান থেকে গাড়ি হাঁকিয়ে এসে গেল অনীক-চিত্রা-সুকন্যা-বাদশাদা। খানিক গল্পগুজব করে ঠাকুর প্রণাম সেরে সবাই মিলে রওনা দিলাম পাশের গ্রাম রতনপুর-এর উদ্দেশে।নারায়ণপুর থেকে মাত্র দুকি.মি. দূরে রতনপুর। বেশ বর্ধিষ্ণু এই গ্রামে আছে এক সাধুবাবার আশ্রম। এঅঞ্চলে প্রখ্যাত এই সাধুবাবার উল্লেখ আছে ভারতের সাধক-এও । বছরে ছমাস তিনি থাকতেন রতনপুরে , বাকি ছমাস বোলপুরের শ্রীনিকেতনে ওনার আরেক আশ্রমে। লোকে বলতো দুশো-র বেশী বয়স ওনার। খুব ছোটবেলায় একবার এসেছিলাম এখানে । বিশাল বটগাছের ছায়ায় এক খুব বুড়োমানুষের মুখ মনে পড়ে আবছা ।মূল সড়ক থেকে গাঁয়ের পথে কি.মি.খানেক ঢুকে নিরালা এক প্রাচীরঘেরা আশ্রম। সুবিশাল এক বটবৃক্ষ পিতামহ ভীষ্মের মতো তার অসংখ্য ডাল ও ঝুরি মেলে ছায়ায় ঢেকে রেখেছে সম্পূর্ণ এলাকা। বটমূলে বাঁধানো বেদী, পাশেই ছোট্ট দোচালা ঘরে সাধুবাবার প্রতিকৃতি সাজানো; একমনে পুজো করছেন এক শ্বেতবস্ত্রধারী ভক্ত। গুটিকয় বাচ্চা সঙ্গ দিল আমাদের... ঘুরে ঘুরে ছবি তুললাম সেই মহাবটচ্ছায়ে... দাঁড়ালাম গিয়ে পিছনের নিরালা পুকুরের বাঁধানো ঘাটে... দেখে এলাম আরো পিছনে বাঁধানো চত্বরের প্রান্তে সাধুবাবার সুন্দর মূর্তি... কথা বললাম আশ্রমের দায়িত্বে থাকা সত্তরোর্ধ্ব মানুষটির সঙ্গে।আষাঢ়-এর গুরুপূর্ণিমায় অনুষ্ঠান হয় আশ্রমে, আর চৈত্রমাসে তিনদিনের হরিসংকীর্তনে পাত পড়ে হাজার হাজার মানুষের। কোনো ভক্ত বা স্থায়ী আশ্রমিকের বাস নেই এখানে; সাধুবাবাও দেহ রেখেছেন সেই ৮৫ সালে, তবু সেই হাস্যমুখ যোগীপুরুষের অদৃশ্য উপস্থিতি আজও যেন রয়ে গেছে এই ছায়াসুনিবিড়শান্তিরনীড়-এর প্রতিটি ডালে ডালে পাতায় পাতায়!ফিরে এলাম নারায়ণপুর। ওরা বিদায় নিল মধ্যাহ্নভোজ-এর সনির্বন্ধ অনুরোধে কান না দিয়ে। ততক্ষণে জ্যেঠতুতো দাদা-র সম্বন্ধী জয় এসে গেছে বর্ধমান থেকে দুই বন্ধু বন্ধন আর অভিজিতকে নিয়ে। সবাই একসঙ্গে বসে গল্পগুজব-গানবাজনা করতে করতেই ওপাড়া থেকে জগঝম্প সহযোগে পুজোর ভিড় এসে হাজির। হৈ হৈ করে শুরু হয়ে গেল আরতি, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আকাশ ভেঙে নামলো বৃষ্টি।সেই বৃষ্টিতে ঠাকুরঘর-মণ্ডপের ছাউনি-ছাতার তলায় ঠাসাঠাসি করে আমরা সবাই--- পাকাচুল প্রৌঢ়.. নুয়ে পড়া বৃদ্ধা.. টেরিবাগানো নবযুবক.. সালঙ্কারা নবোঢ়া তরুণী.. ফিটফাট গাঁয়ের জামাই.. সিকনি-গড়ানো বাচ্চা। একসময় বাদলধারা হলো সারা; হোম-শান্তিজল-ফোঁটা শেষ করে ফিরে এসে বিছানায় বডি ফেললাম তিনটে নাগাদ।আমাদের ছোটবেলায় নবমীর বিকেলে পাড়ায় নারকেল-কাড়াকাড়ি খেলা হতো। অনেকটা রাগবী খেলার স্টাইলে, একটা ঝুনো নারকেল নিয়ে পনেরো-বিশজন যুবকের টানাটানি, কে সেটা কুক্ষিগত করতে পারে। ঢাকঢোলকাঁসরের আবহসঙ্গীতে দারুন জমতো সেই নির্দোষ বলপ্রয়োগের খেলা। বহুদিন হলো উঠে গেছে সেই রীতি।তবে এখনও আছে নবমীর সন্ধ্যায় আরতি-র পর চাতোর-এ সিঁদুরখেলা। শুরু হয় সামাজিক প্রথা অনুযায়ী সধবাদের একে অন্যকে সিঁদুর পরানো দিয়ে, আর শেষ হয় হোলি-র মতো মুখে-গালে জবরদস্তি সিঁদুর মাখিয়ে দেওয়ার দুষ্টুমি দিয়ে। বেশ মজা লাগে দেখে; কিন্তু বছরকয়েক আগে এখানকার সিঁদুরখেলায় সবচেয়ে প্রাণোচ্ছল এক বৌদি, দুর্ঘটনায় স্বামীর অকালমৃত্যুর পর হারিয়ে গেল নবমীসন্ধ্যার এই আনন্দবাসর ছেড় --- তারপর থেকেই সিঁদুরখেলার আনন্দ-উচ্ছ্বাস-উচ্ছলতার আড়ালে বেশ কিছু দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাই যেন!ডঃ সুজন সরকারবর্ধমান।

অক্টোবর ০৫, ২০২২
নিবন্ধ

সেই ঘচাংফু দেখতে আগে কচিকাঁচাদের ভিড়ে জুটে যেতাম আমিও

ঘুম ভেঙেছে অনেকক্ষণ, তাও এপাশ ওপাশ করতে করতে শেষতক যখন বিছানা ছাড়লাম, ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছাড়িয়েছে। আদা-চা খেয়ে সংক্ষিপ্ত স্নান... নতুন পাঞ্জাবী... মেয়েকে টেনে তুলে স্নান করানো... তারপর সোজা মণ্ডপে।বুড়োদা-নুপুরদার যুগলবন্দীতে মহাষ্টমীর সকালের পুজো তখন মাঝপথে। বুড়োদা-র বাবা স্বর্গত ব্রজরাখাল মুখোপাধ্যায় আমাদের কুলপুরোহিত ছিলেন। দীর্ঘকায় কৃশ মানুষটিকে দাদামশাই বলতাম আমরা। পরিণত বয়সেও ঈষৎ ঝুঁকে দাঁড়িয়ে একহাতে ঘণ্টা নেড়ে তাঁর আরতি করা মনে পরে আজও।বাবার পর পুজোর দায়িত্ব নিল বুড়োদা, বংশীধর মুখোপাধ্যায়-- সেও হয়ে গেল তিন দশকের ওপর। স্বল্পভাষী প্রচারবিমুখ নির্লোভ মানুষটিকে বড় ভাল লাগে আমার; কী নিষ্ঠাভরে একমনে কোনো হাঁকডাক ছাড়াই পুজো করে যান, এই মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে-মার্কা আধুনিক দুনিয়ার সামনে তা একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে!তন্ত্রীধারক পুরোহিত, অর্থাৎ যিনি পুঁথি দেখে মন্ত্রপাঠ করেন--- সেই ভূমিকায় দূরশৈশবে দেখতাম স্বর্গত প্রভাকর ভট্টাচার্য ওরফে হদেভটচাজ -কে। আবছা আবছা মনে পড়া সেই বৃদ্ধ মানুষটি আত্মহত্যা করার পর বহুবছর দায়িত্বে ছিলেন স্বঃ অজিত ভট্টাচার্য। তাঁর অবর্তমানে নুপুরদা, সে হবে বছরকুড়ি।চাতোর-এ বসে মন্ত্রোচ্চারণ শুনছি --অং মম হৃদয়ে, তং মম বাহুমূলে, নং মম জিহবায়, সং মম নাসিকায়...ইত্যাদি। মাথার ওপর অশ্বত্থগাছের পাতায় হাওয়া বইছে ঝিরঝিরিয়ে... পুবের আকাশে ঘনাচ্ছে ধূসর-কালো মেঘ... রোদ ওঠেনি এখনো... একসার প্যাঁকপেঁকে হাঁস পচাকাকার বাড়ি থেকে বেরিয়ে হেলেদুলে চলে গেল পাশের পুকুরের দিকে...কাছে বসা বিনুদা-র সাথে টুকটাক গল্প জুড়ে দিলাম। বিনুদা প্রতিবেশী, বছর আষ্টেক বড় আমার চেয়ে। সেলস-এর কাজে ছিল বর্ধমান-এর এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। সুদীর্ঘ কর্মজীবন ছেড়ে ইদানীং বসে গেছে গাঁয়ে। ছেলে সম্প্রতি দুর্গাপুরে কাজ পেয়ে চলে গেছে... মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে সে-ও বছরসাতেক হোলো... গ্রামে সময় কাটে না... লোকজন নেই... কথা বলার তেমন কেউ নেই...ঘরে বসেই টুকটাক কাজ করো না কেন বিনুদা?দূর দূর! ধারবাকিতেই খেয়ে নেবে সব।ঢাক বেজে উঠলো ঝমঝমিয়ে, সঙ্গে কাঁসরঘন্টা। সকালের আরতি শুরু। আশপাশের মেয়ে-বৌরা জুটতে লাগলো পুজোতলায় । বাটি হাতে রঙিন পুঁচকে... সদ্যতরুণী মায়ের কোলে ছটফটে বাচ্চা... স্খলিত পায়ে আমার বাবা-মায়ের মতো জনাকয় বয়স্ক মানুষ...উঠে দাঁড়ালাম গিয়ে ঢাকীর ঠিক পিছনে, এখান থেকে প্রদীপের আলোয় চকচকে মায়ের মুখ ভালো দেখা যায়।আরতি শেষ হতেই সকালের পুষ্পাঞ্জলি। পুজোর ঘরে ঢুকে পড়ে রূপা-তিস্তা-আমি বসে পড়লাম দেওয়াল ঘেঁষে। ঠাসাঠাসি ভীড়। হাতে হাতে গঙ্গাজল.. ফুল.. বেলপাতা। মন্ত্র বেশীরভাগই মুখস্থ হয়ে গেছে এত বছরে, বাকিটা কান খাড়া করে শুনে যা মনে আসে বলে দিলাম। মা নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন!এক ব্যাচে সব কুলোলো না, আরেক ব্যাচ ঢুকলো ঘরে। পুরোহিত ঠাকুরকে প্রণাম করে বেরিয়ে এসে সিদ্ধান্ত হোলো: রূপা ডায়াবেটিক, তাই উপবাস আর দীর্ঘায়িত করবে না; মহাভক্ত তিস্তা আর আমি মহাষ্টমীর উপবাস টেনে দেব বিকেলে সন্ধিপুজা অবধি। আর সদা-উপবাসী আমার মা তো আছেই !সন্ধিক্ষণ আজ বিকেল সাড়ে তিনটেয়। আমাদের পুজো বৈষ্ণবমতে, তাই বলি নেই। তবে পাড়ার একপ্রান্তে সিংহবাড়ির পুজোয় (ওঁরা প্রতিমা ছাড়াই, শুধু মণ্ডপে মঙ্গলঘট স্থাপন করে পুজো করেন) চালকুমড়ো বলি হয়। সেই ঘচাংফু দেখতে আগে কচিকাঁচাদের ভিড়ে জুটে যেতাম আমিও।যুগ যুগ ধরে বর্ধমান শহরের প্রসিদ্ধ সর্বমঙ্গলা মায়ের মন্দিরের সামনের চক-এ রাখা কামান দাগা হোতো সন্ধিক্ষণে। সেই কামান-নির্ঘোষ শুনে আশপাশের সমস্ত গ্রামগঞ্জে সন্ধিপুজোর সূচনা হোতো। গত শতাব্দীর শেষের দিকে একবার কামান দাগার সময় দুর্ঘটনা ঘটে-- কামানটি ফেটে গিয়ে দুজন প্রাণ হারান। সেই ঘটনার পর থেকে বন্ধ হয়ে গেছে ধর্মীয় কারণে কামান দাগার রেওয়াজ--- বর্ধমানে তো বটেই, পরবর্তীকালে বাংলার অন্যত্রও। এখন ঘড়ির কাঁটাই নির্দেশ দেয় -- কোন মুহূর্তে কোথাও সন্ধিপুজোর আরতিতে ঢাকে কাঠি পড়বে, বা ঝলসে উঠবে বলির খড়গ অন্য কোথাও!দুপুরবেলা পুণ্যকামী চিত্তে উপোসী পাকস্থলী থেকে মনকে সরানোর প্রয়াস পাচ্ছি, এমন সময় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। সেই শুরু; অঝোরধারায় বর্ষণ চললো দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আকাশের মুখ ঢাকা, ধোঁয়ামাখা চারিধার...দুলছে বাঁশবন, কলার ঝাড়...পাশের বাড়ির টিনের চালে অবিরাম ঝমাঝম... উঠোন জুড়ে জলের ধারা... ছাদ থেকে দৃশ্যমান দূরে হারানো সবুজ খেতের সর্বাঙ্গে বৃষ্টির ধূসর চাদর ...ডানপিটে বৃষ্টির মধ্যে শেষ পর্যন্ত ছাতা নিয়েই ঠাকুরতলায়। পুজোপাঠের পর শুরু হলো আরতি। এই দুর্যোগেও এসেছেন অনেকেই --- ঠাকুরঘরের বারান্দায়-ছাউনিতে-ছাতামাথায় গাছতলাতেও! জোড়া ঢাক- জোড়া কাঁসর -পেটাই ঘণ্টার সমবেত গুরুনাদে চাপা পড়ে গেছে বর্ষণগীত। ধুপধুনোর মৃদু ধূম্রজালের মধ্যে দিয়ে প্রদীপের আলো ঝিকমিক করছে মায়ের মুকুটে.. কানপাশায়.. ডাকের সাজে।বহুক্ষণ চললো আরতি। বৃষ্টি ধরে এলো ক্রমে; কমে আসছে দিনের আলোও। ততক্ষণে চোখ বুজে জোড়হাতে চেয়ে ফেলেছি সবার জন্য অনেক কিছু। রুপোর চামর দুলিয়ে আরতি শেষ করলো বুড়োদা। আমরাও জলকাদা-মাখা পা চাতোর-এর টিউবওয়েলে ধুয়ে এসে বসে পড়লাম পুষ্পাঞ্জলি দিতে। অঞ্জলির শেষে নতুন করে চাওয়ার মতো কিছু আর মনে এলো না। শুধু মনে মনে বললাম বারবার-- মা, আমাদের সবাইকে দেখো, ভালো রেখো , রক্ষা কোরো।ডঃ সুজন সরকার,বর্ধমান।

অক্টোবর ০৪, ২০২২
নিবন্ধ

এলো রে এলো পুজো এলো, ঢ্যামকুড়াকুড় ... মা-আ-আ-তলো রে-এ-এ ভুবন...

সকাল দশটা। স্কুটার নিয়ে ছুটছি কর্মস্থলে। ভাঙাচোরা রাস্তা... কানফাটানো হর্ন... সর্বব্যাপী ধোঁয়া-ধুলো... অসহিষ্ণু টোটো... দিগ্বিদিকজ্ঞানশূণ্য পথচারী... মাইকে ঢ্যামকুড়াকুড় ... মা-আ-আ-তলো রে-এ-এ ভুবন...বৃষ্টি এখন এই আছি এই নেই আমি যেন পাখি মেলি পাখনা! আজ সকাল থেকে চারদিক আলোঝলমল। এক আকাশ নরম শরতের রোদ ঝাঁপিয়ে পড়েছে বর্ধমান শহরের ওপর; মিঠে আদর মাখিয়ে দিচ্ছে আমার কাঁধে.. পিঠে .. কমতে থাকা চুলের ফাঁকে!চারদিকে ফ্লেক্স-ফেস্টুন-ফাটা হোর্ডিংয়ে পুজোর সোচ্চার ঘোষণা। মণ্ডপে মণ্ডপে বাঁশ-শালবল্লার কঙ্কাল দ্রুত ঢাকা পরছে ত্রিপল-পলিথিন-প্লাইউডের ঘেরাটোপে। তাদের পর্দাঢাকা অন্দরমহলে শেষ কদিনের রহস্যময় তৎপরতা। কিছু কুচোকাঁচার হুটোপাটি তার আশেপাশে।বিকেলের দিকে মাঝেমাঝেই দেখি বিচিত্র সব শোভাযাত্রা--- ফর্সা ধুতিগেঞ্জি পরা ঢাকী... রণপা চড়ে টলমলিয়ে হাঁটতে থাকা তালঢ্যাঙা মানুষ, গা থেকে তাদের লুটিয়ে পড়ছে বড় শোরুম বা শপিংমলের নামাঙ্কিত লম্বা আঙরাখা... পিছুপিছু রঙবেরঙের প্ল্যাকার্ড বাগিয়ে ধরে সারিবদ্ধ পদযাত্রীরা। খবরকাগজের পাতায়ও লোভনীয় সব শারদীয়া অফার--- পাতাজোড়া বিজ্ঞাপনে সুশোভিতা সুন্দরীদের পণ্যবাহী আহ্বান!কেমন হুট করে যেন পুজো এসে গেল এবার! টুপটাপ করে বিনা সোরগোলে বেরিয়ে গেল একটার পর একটা পুজোবার্ষিকী ... দেখতে দেখতে মণ্ডপ গজিয়ে উঠলো এখানে সেখানে ... ঢাউস ঢাউস পোশাকের মল-গুলোতে সম্বৎসরের ভিড় শুধু যেন বেড়ে গেল একটুখানি... সমস্ত ট্রেনের টিকিট প্রত্যাশীদের চোখের সামনে লম্বা লম্বা ওয়েটিং লিস্ট ঝুলে গেল কোন অলক্ষ্যে।নাকি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি আমিই! চোখ মেলে দেখছি না সোনা সোনা আকাশ আর সবুজ সবুজ মাটির দিকে! নতুন রঙের ছোঁয়ায় হৃদয় মাতছে না আর, আলোর জোয়ারে খুশীর বাঁধ ভাঙতেও গেছে ভুলে !বিকেলে কর্তাগিন্নী তাই বেরিয়ে পড়লাম। লড়ঝড়ে স্কুটারটা নিয়ে টলমল করতে করতে বাঁধ পেরিয়ে নেমে এলাম দামোদর-এর ধারে। আদিগন্ত দুধসাদা কাশফুলের চাদরে গা ঢেকে দুলছে দু পাড়। পাশে শেষবর্ষার ভরা স্রোত বয়ে চলেছে আপন বেগে। একমানুষ উঁচু কাশবন... ভিজে বালি... দুতিনটে উল্টানো নৌকা... জলের ওপাড়ে বাতাসে ভাসছে ইনি-মিনি-টাপা-টিনি-টানা-টুনি-টাসা...আকাশে শেষ বিকেলের রঙের খেলা... সন্ধ্যে নেমে আসছে উড়ন্ত চিলের ডানায় রোদের গন্ধ মুছে দিয়ে... ছোটো ছোটো কালচে পাখিগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে উড়ছে কাশফুলের মাথায় মাথায়... কৌতুহলী চোখে আমাদের মাপতে মাপতে চলে গেল দুতিনটে প্যাংলা ছেলে।আজ রাত পেরোলেই মহালয়ার ভোর; অখিল বিমানে বেজে উঠবে তাঁর জয়গান। আগমনী আলো আকাশ জুড়ে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে আবাহন করবে দূর্গা দূর্গতিনাশিনীর। বাঙালীর ঘরে ঘরে স্নেহময়ী মা উমা হয়ে বিরাজ করবেন সিংহস্থা শশীশেখরা মরকতপ্রেক্ষা জগজ্জননী মহামায়া।এ দ্যুলোক মধুময় হোক, মধুময় হোক পৃথিবীর ধুলি।সবাই সুস্থ থাকুক, আনন্দে থাকুক। মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াক।ডঃ সুজন সরকার,বর্ধমান।

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২
নিবন্ধ

অপরাজেয় (ছোট গল্প)

আজ অনিন্দ্য আর অপরাজেয় দুজনের জীবনের এক বিশেষ দিন। সারা ভারতের নতুন শিল্পীদের যে প্রতিযোগিতা হচ্ছে আজ ছিল তার ফাইনাল। সেখানে টুবাই অর্থাৎ অপরাজেয় প্রথম হয়েছে। অনিন্দ্য সিঙ্গেল ফাদার হিসাবে আজ সফল। কে বলে বাবারা কিছু পারেনা; মা না থাকলে সন্তান সঠিক ভাবে মানুষ হয়না!! আজ সেই সব কথা কে ভুল প্রমাণিত করে দিয়েছে অনিন্দ্য। এতে অবশ্যই ওর মা বাবার ভূমিকা ও আছে। আর সব থেকে বড় যে সেই টুবাই সব সময় বাবার কথা শুনে চলেছে। ওদের বাবা ছেলের মধ্যে বোঝাপড়া খুব সুন্দর। টুবাই এর সব বন্ধুরা ও খুব ভালোবাসে অনিন্দ্যকে। এবং বলে কপাল করে বাবা পেয়েছে অপরাজেয়। তবে অনিন্দ্য র চলার পথটা যে এরকম হবে সেটা বোধহয় ও নিজেও কখনো ভাবেনি। পারমিতা আর অনিন্দ্য একই কলেজে পড়তো। কলেজের অ্যানুয়াল প্রোগ্রামের দিন সিনিয়র অনিন্দ্যর মঞ্চে গান গাইতে উঠে চোখ আটকে যায় হরিণ নয়না পারমিতার দিকে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে নতুন ভর্তি হয়েছে ওদের কলেজে। অনিন্দ্যর ব্যাচের একটি মেয়ের মাধ্যমে পরিচয় তার থেকে বন্ধুত্ব। কলেজ শেষের পর বুঝতে পারে দুজনেই যে বন্ধুত্ব পরিণত হয়েছে ভালোবাসায়। দুজন দুজনকে ছেড়ে থাকতে পারবে না। অনিন্দ্য তখন একটা কলেজ ক্যাম্পাসিং এ একটা ভালো কোম্পানিতে জয়েন করেছে আর পারমিতার ফাইনাল ইয়ার। অনিন্দ্য পারমিতাকে বলে ওর পরীক্ষা হয়ে গেলে বাড়িতে বিয়ের কথা বলবে। কিন্তু পারমিতার ইচ্ছা বিয়ে টা পরে করবে। তাই অনিন্দ্য আর এগোয় না। অনিন্দ্য অফিস আর পারমিতা কলেজ সামলে নিজেদের জন্য সময় বের করে দেখা করে। এইভাবে কাটতে থাকে সময়। অনিন্দ্য এরমধ্যে একটা ব্যাপার বোঝে পারমিতা খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ও আরও পড়তে চায়,মাস্টার্সে ভর্তি হয়। পারমিতা চায় অনিন্দ্য এম বি এ করে আরও উন্নতি করুক চাকরিতে। কিন্তু অনিন্দ্য ভালোবাসে গান। তাই ও বেশি উন্নতি চায় না। বলে কি হবে বেশি উন্নতি করে , যদি নিজের মত করে বাঁচতেই না পারলাম। পারমিতা নানাভাবে বোঝায় কিন্তু অনিন্দ্য একইভাবে বলে। আসলে ছোটো থেকে গান নিয়ে বেড়ে ওঠা অনিন্দ্য গান ছাড়া ভাবতে পারে না। তাই মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেটা চাকরির ইঁদুর দৌড়ে সামিলহয় না। পারমিতা মাস্টার্স করার পর একটা খুব ভালো চাকরি পায়। এর মাঝে ওরা রেজিস্ট্রি টা করে নিয়ে ছিল। পারমিতা চাকরি পাওয়ার পর ওর বিত্তশালী বাবা যখন বিয়ের জন্য বলেন তখন পারমিতা বাবাকে সব বলে। বাবা রাজী হয় না। পারমিতা ও খুব জেদি, ও একদিন অনিন্দ্যর কাছে চলে আসে। অনিন্দ্যর মা বাবা ওকে আদর করে ঘরে তোলেন। একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠান করে ওদের বিয়ে টা হয়ে যায়। ধনীর দুলালী পারমিতার অনেক অসুবিধা হয় ওদের ওখানে; প্রথম প্রথম মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেনি যে তা নয়। কিন্তু পার্থক্য বেশি হলে মানিয়ে নেওয়া কঠিন। পারমিতার সেরকম সমস্যা হত থাকে বিয়ের এক বছরের মধ্যে। অনিন্দ্য বুঝতে পারে তাই ও চেষ্টা করে পারমিতার জন্য একটু অন্যরকম করে ভাবতে। পারমিতা যেন এক বছরের মধ্যে হাঁপিয়ে ওঠে। ওর অভ্যাস গুলো যে অন্যরকম। ওর মত করে যাতে থাকতে পারে অনিন্দ্য সে জন্য কোম্পানির ফ্ল্যাটে চলে যায় ওকে নিয়ে।দেখতে দেখতে বিয়ের পাঁচ বছর হয়ে যায়। এমন সময় একদিন পারমিতা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তার দেখালে জানতে পারে ও মা হতে চলেছে। এই খবর শুনে অনিন্দ্য খুব খুশি হয়। ওর মা বাবাও খুব খুশি হয়। অনিন্দ্য এই খবরটা পারমিতার মাকে জানায়। ওনার সব ভুলে আনন্দে মেতে ওঠেন। কিন্তু পারমিতা খুশি হতে পারে না। ও বলে এই বাচ্চা ও চায় না। ওর কেরিয়ারের এখন উন্নতির সময় ও ঝামেলা নিতে চায় না। কিন্তু সবাই ওকে অনেক বোঝায়, আর তাতে ও রাজী হয় তবে একটা শর্তে। বাচ্চার ছমাস হয়ে গেলে আর কোনো দায়িত্ব ও নেবে না। তাতেই অনিন্দ্য রাজী হয়। অনিন্দ্য ভাবতে থাকে এ্ কোন পারমিতা! যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল এ তো সে নয়। বাচ্চাকে দেখতে সারাদিনের আয়া রাখলো। বাচ্চার দিকে যেন পারমিতার খেয়াল নেই। ছেলের যখন দুবছর বয়স তখন কর্মসূত্রে বিদেশ চলে গেল পারমিতা। যাবার আগে শুধু বলে গেল অনিন্দ্য কে তোমার ছেলে কে তোমার মত করে মানুষ করো। সেই থেকে আজ পর্যন্ত অনিন্দ্য, ওর ছেলে টুবাই এর সব। অবশ্য ওর মা বাবা র অবদান কম নয়। পারমিতার চলে যাবার খবর পেয়ে অনিন্দ্য র মা বাবা ওর কাছে চলে আসেন নাতি কে সামলাতে। পারমিতার মা বাবা ও আসতেন। মেয়ের এই ব্যবহার ওনাদের ও কষ্ট দিয়েছিল। অনিন্দ্য ছেলেকে যখন সঙ্গীত জগতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় তখন ওর শ্বশুর মশায় আপত্তি জানায়। তারপর থেকে যোগাযোগ আবার কমে যায়। এইভাবে অনিন্দ্য র লড়াই শুরু হয়। টুবাই অর্থাৎ অপরাজেয় একটু বড়ো হয়ে যখন মায়ের কথা জানতে পারে আত্মীয়দের মাধ্যমে তখন থেকেই ও ঠিক করে জীবনে কিছু করতে হবে যাতে মা কে বোঝানো যায় বাবা সঠিক ভাবে ওকে মানুষ করেছে। পড়াশোনায় যথেষ্ট ভালো , তার সাথে বাবার মতো গান করে খুব ভালো। ও পড়াশোনার সাথে গানটাকে ও সমান গুরুত্ব দেয়। আর ওর এই কাজে সবসময় ওর পাশে থাকে ওর বাবা। তাই স্কুলে ওর সব শিক্ষকরা ওকে খুব স্নেহ করেন। ক্লাসে প্রতি বছর প্রথম হয় তার সাথে যেকোনো সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা মানেই অপরাজেয় থাকবেই আর নাম সার্থক করে আসবে পুরস্কার হাতে নিয়ে। আজকের দিনটিও সেই রকমই একটা দিন। যেখানে বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে ও প্রথম হয়েছে। গত কয়েক মাস বাড়ির বাইরে থেকেছে মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছে এই সফলতা পাবার আশায়। আজ ও সফল হয়ে। আজ সবাই এসেছে এই অনুষ্ঠানে। নাম করা একটা চ্যানেল লাইভ দেখাচ্ছে প্রোগ্রামটা। স্টেজে যখন ওর নাম ঘোষণা করা হয় তখন অনিন্দ্যর চোখে জল আসে আনন্দ আর উত্তেজনায়। অপরাজেয় রুদ্র কে যখন কিছু বলতে বলা হয়। পনের বছর বয়সের ছেলেটা যেন হঠাৎ করেই অনেক বড়ো হয়ে ওঠে। ও বলে আজ আমি যার জন্য এই সাফল্য পেয়েছি আগে তাকে ডেকে নিতে চাই, আমার বাবা শ্রী অনিন্দ্য রুদ্রকে। যার আত্ম ত্যাগ আর আমার প্রতি বিশ্বাস আজ আমাকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। অপরাজেয় র সাথে স্টেজের অ্যাঙ্কর ডাকতে থাকে অনিন্দ্য কে; আর অগনিত দর্শক করতালি দিয়ে বাবা ছেলের এই সাফল্যকে অভিনন্দন জানায়। অন্যদিকে পনেরো বছর বিদেশে থেকে দুদিন আগে দেশে ফিরে যখন এই অনুষ্ঠানের কথা জানতে পারে, নিজেকে আটকাতে পারে না। অনুষ্ঠানের স্পনসর হওয়ার দরুন সূযোগ ছিল তার সদ্ব্যবহার করে এক মা যে একসময় নিজের কেরিয়ারের জন্য শিশু সন্তান কে ফেলে বিদেশে পাড়ি দিয়ে ছিল। আজ অনুষ্ঠানের শেষে যখন সবাই বাবা আর ছেলেকে অভিনন্দন জানাচ্ছে তখন কর্মজীবনে সফলতার শিখর ছুঁয়েও ভীষণভাবে নিঃসঙ্গ, হতাশাগ্রস্ত পারমিতা চোখ ভর্তি জল নিয়ে একা নিজের গাড়িতে ওঠে। আজ চাইলেও আর যেতে পারে না নিজের ফেলে আসা ঘরে। তবে এটা আজ পারমিতা নিজের কাছে স্বীকার করে যে অনিন্দ্য ঠিক ছিল আর আজও ওই সঠিক। ও ঠিকই বলত যে সফলতা তাকেই বলে যে কাজ করে আমি এবং আমাকে ঘিরে থাকা সবাইকে খুশি করতে পারব। অর্থ আর ক্ষমতাই সব নয়। অর্থবান আর ক্ষমতাবান মানুষের চারপাশে অনেকে থাকে কিন্তু কেউ নিঃস্বার্থ ভাবে থাকে না। একটা সময় বুঝতে পারে যে সে বড্ড একা। আজ পারমিতা কর্মজীবনে উন্নতির শিখরে পৌঁছিয়েছে ঠিকই কিন্তু ও আজ খুব একা। আজ ভাবে একটা সুন্দর সুখী জীবন তো পেতে পারত; আজ ও সন্তান গর্বে গর্বিত হতে পারত, সে ও নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়েছে। খুব ইচ্ছা হচ্ছে আজ ছেলেটাকে একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে। ফোনটা বের করে কল করে একটা -- আমাকে অপরাজেয় রুদ্র রায় নম্বর টা হোয়াটসঅ্যাপ করো। মূহুর্তে টুং করে নম্বর টা এসে যায়। একমূহূর্ত ভাবে তারপর লেখে অনেক বড়ো হও, বাবার মুখ উজ্জ্বল করো। খুব ভালো থেকো।লিখে পাঠাবে কিনা ভাবে। তারপর------একটা ছোট্ট উত্তর আসে------ অনেক ধন্যবাদ।বাবার নামই উজ্জ্বল করার চেষ্টা করছি। আমার বাবা একাই একশো। ভালো থাকবেন।

সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২২
নিবন্ধ

সৌমিতা সাহা'র 'ভারত মাতা' ভেনিজুয়েলায় প্রর্দশনী আলো করে বিশ্ব ভ্রমণে

সীমার বেড়াজালে যাকে বাঁধা যায়না সেই সৃজনশীলতা স্থান পায় অসীমে। চারুকলা জগতেও প্রায়ই ঘটে থাকে এমন ঘটনা। সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার ভেনিজুয়েলায় এরিজ্ গ্যালারিয়া দি আর্তে প্রেক্ষাগৃহ আয়োজিত প্রর্দশনীতে স্থান পেয়েছে স্বনাম ধন্যা সঙ্গীত শিল্পী ও চিত্রকর সৌমিতা সাহার আঁকা ভারত মাতা ছবি। বিশ্বের নানা প্রান্তের শিল্পীদের বাছাই করা চিত্রসম্ভারে সুসজ্জিত প্রর্দশনীতে স্থান পেয়েছে মোট ৭জন ভারতীয় চিত্রকরের শিল্পকর্ম। সৌমিতা তাদেরই একজন। শিল্পী সৌমিতার অ্যাক্রেলিক মাধ্যমে আঁকা ভারত মাতা -র প্রথম টিজার দেখা যায় তাঁর বন্দে মাতরম-মন্ত্র গান মিউজিক ভিডিওতে। সেই থেকে মন্ত্র গান ও সৌমিতার ভারত মাতা চর্চার এক অন্যতম বিষয় হয়ে দাঁড়ায় নেট পাড়ায়। প্রবাদ প্রতিম চিত্রকার এম.এফ হুসেনের বিতর্কীত মদার ইন্ডিয়া ব্যাতিত ভারত মাতার রুপদানে প্রথম কারিগর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তী কালে মগন লাল শর্মা ও কয়েক দশক বাদে শোভা সিংহ আবার আঁকেন ভারত মাতার নয়নাভিরাম ছবি। সমকালীন তরুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে বহু বছর পর আবারও দেশ মাতৃকার ভুবন মোহিনী রূপ ফুটে ওঠে মৌমিতার ক্যা্নভাসে। কবিগুরুর ভাষায় আকাশতলে উঠল ফুটে- আলোর শতদল। পাপড়িগুলি থরে থরে- ছড়ালো দিক্-দিগন্তরে। সৌমিতার ভারত মাতা শতদল হস্তে বিশ্ব পরিভ্রমণে বেড়িয়ে তাঁর শিল্পের পাপড়িগুলি দিক-দিগন্তে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।দেশের শিল্পীদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই প্রর্দশনীর অংশ হয়ে ওঠা গৌরবের বিষয়। আর আন্তর্জাতিক মঞ্চেও স্বদেশীয়ানা নজির গড়লেন বাংলার সৌমিতা। সৌমিতার ক্যানভাস আলো করে বিরাজমান সয়ং দেশ মাতৃকা। অতীতেও পোর্টল্যান্ডের আর্ট রীচ গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে মৌমিতার শিল্পকর্ম। আবারও দেশের গন্ডি পেরিয়ে ভেনিজুয়েলায় দেশের নাম উজ্জ্বল করলেন বাংলার সৌমিতা।

আগস্ট ২৯, ২০২২
নিবন্ধ

ঝুলনযাত্রা ও রাখীপূর্ণিমা

বছরের তিনটে বিশেষ পূর্ণিমাতে হয় রাধাকৃষ্ণের তিন লীলা-উৎসব বা যাত্রা । ফাল্গুণী পূর্ণিমায় দোলযাত্রা, শ্রাবণী পূর্ণিমায় ঝুলনযাত্রা আর কার্তিক পূর্ণিমায় রাসযাত্রা। ঝুলন হল বর্ষার লীলা যার অপর নাম হিন্দোলনলীলা। ব্রজবাসীরা কদমগাছে ঝুলা বেঁধে রাধাকৃষ্ণকে দোল খাওয়ায়। কাজরী গান হয়। মেঘমল্লারে বৃন্দাবনের আকাশবাতাস সঙ্গীতমুখর হয়ে ওঠে। একাদশী থেকে শুরু হয় ঝুলন আর শেষ হয় পঞ্চমদিনের পূর্ণিমাতে। রাখী বাঁধা হয় সেদিন।তবে অন্য্যন্য যাত্রাগুলির থেকে ঝুলনযাত্রা একটু ভিন্ন। এটি রূপকধর্মী। দোলা বা হিন্দোলনের অর্থ হল সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলন ময় মানুষের জীবনের প্রকৃত অর্থই হল ঘড়ির পেন্ডুলামের মত চলমানতায় ভরা। একবার আসবে দুঃখ। তারপরেই সুখ। কখনো বিরহ, কখনো মিলন। কখনো আনন্দ, কখনো বিষাদ। স্থির হয়ে থাকাটা জীবন নয়। এই দোলনার আসা ও যাওয়াটি হল রূপকমাত্র। তাই জন্যেই তো বলে চক্রবত পরিবর্ততে সুখানি চ দুখানি চ |উপনিষদে বলে আনন্দ ব্রহ্মেতি ব্যজনাত অর্থাৎ ব্রহ্ম আনন্দস্বরূপ। কিন্তু তিনি একা সেই কাজ করবেন কি করে? তাইতো তিনি সৃষ্টি করেন বন্ধু-বান্ধব, পিতামাতা, দাসদাসী, ভাইবোন, স্বামী-স্ত্রীর মত সম্পর্কের জালে আবদ্ধ মানুষদের। তাই প্রেমের আবাহনে পুরুষ আর প্রকৃতির যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠে হিন্দোলন বা ঝুলনের মত উৎসব । সম্পর্ক টিঁকিয়ে রাখার জন্য সৃষ্টিকর্তা প্রজাপিতা ব্রহ্মের এরূপ দায়বদ্ধতা। মানুষ যাতে মানুষকে নিয়ে অহোরাত্র বেঁচে থাকেআর সেখানেই ঝুলন নামক মিলনোৎসবের সার্থকতা!শ্রীমদ্ভাগবতে বলে, বর্ষণমুখর বৃন্দাবন তখন বানভাসি। বর্ষণসিক্ত ধরিত্রী সবুজ। নদীনালা বর্ষার আনন্দে থৈ থৈ। প্রাণীকুল খলখল কলধ্বনিতে মুখর। পক্ষীকুল মনের আনন্দে সরব তাদের কূজনে। আসন্ন পূর্ণিমার রূপোলী জ্যোৎস্নায় ব্যাপ্ত আদিগন্ত চরাচর। এমন প্রাকৃতিক আবাহনে মেতে উঠলেন শ্রীরাধিকা তাঁর দয়িতের সাথে। এতো মানুষের জীবনের মতই মিলনের আর্তি। বহুদিনের অদর্শণের অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি। এতো আমাদের জীবনে চেনা ঘটনাতাই নয় কি ?তাই রবিঠাকুর বলে ওঠেন,আজ শ্রাবণের সজল ছায়ায় বিরহ মিলন........সত্যি এ যেন পরাণের সাথে পরাণ বাঁধার উৎসব ! চির বন্ধুতার আবেগের উৎসব ।ঝুলনযাত্রা বহুযুগ আগে থেকে ব্রজভূমি বৃন্দাবনে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হত। শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীরাধিকা তাঁদের অষ্টসখী ইন্দুরেখা, চিত্রা, চম্পকলতা, ললিতা, বিশাখা, তুঙ্গবিদ্যা, সুদেবী এবং রঙ্গদেবীর সাথে লীলা করেছিলেন ঐ দিনে।শ্রীচৈতন্যদেবের লীলাক্ষেত্র নবদ্বীপধামেও এখন ঝুলন পালিত হয় মহাসমারোহে। রাধাগোবিন্দের প্রচলিত ঝুলনযাত্রার হাত ধরে এসে পড়ে রাখীবন্ধন যা এখন গ্লোবাল মার্কেটে আরো জনপ্রিয়। পুরাণের কাহিনী অনুযায়ী দেবতারা যখন অসুরদের দৌরাত্ম্যে স্বর্গ থেকে ক্ষমতাচ্যুত তখন দেবরাজ ইন্দ্র দেবগুরু বৃহস্পতির শরণাপন্ন হলেন। ইন্দ্রের স্ত্রী পৌলমী তখন বৃহস্পতির নির্দেশে ইন্দ্রের হাতে বেঁধে দিলেন একগুচ্ছ রাখী। এই রাখী হল রক্ষাকবচ যা দেবরাজকে রক্ষা করবে অসুরদের সকলপ্রকার অত্যাচারের হাত থেকে। শ্রাবণী পূর্ণিমার দিনে রাখী পরার পরেই নাকি দেবরাজ ইন্দ্র সমর্থ হয়েছিলেন অসুরদের পরাস্ত করে স্বর্গরাজ্য উদ্ধার করতে।ইতিহাস অনেক কথাই বলে। তার মধ্যে বাঙালীদের কাছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ ও রাখীবন্ধনে রবিঠাকুরের অগ্রণী ভূমিকা। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বাংলাকে দুভাগ করে বসলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করে দেশপ্রেমের মন্ত্রে জাতীয়তাবাদকে আরো সোচ্চার করার চেষ্টায় জাতিধর্ম নির্বিশেষে, আপামর জনসাধারণের হাতে রাখী বাঁধলেন। বীজমন্ত্র একটাই। ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে দেশবাসীকে একসূত্রে আবদ্ধ করা। লিখলেন সেই অনবদ্য গান,বাংলার মাটী বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল, পুণ্য হোক, পুণ্য হোক হে ভগবান! তাই সেই থেকে রাখীপূর্ণিমার দিনটি বাঙালীর মননে, স্মরণে আরো গুরুত্ব পেয়ে আসছে। রাখী হল সেই রক্ষাবন্ধনের কবচ যা পরিয়ে দিলে কোনো অমঙ্গলের আশঙ্কা থাকেনা। তাই বুঝি মা যশোদা কৃষ্ণের হাতে এই মঙ্গলসূত্র বা ডোর বেঁধে দিতেন। বালগোপাল অরণ্যে, প্রান্তরে গোচারণায় যেতেন সখাসখীদের সাথে, তার যাতে কোনো অনিষ্ট না হয় সেই জন্য । আবার ব্রজবালারা কিশোর কৃষ্ণের হাতে ফুলের রাখী বেঁধে দিতেন প্রেম-প্রীতির বন্ধন হিসেবে। মাতা কুন্তী নাকি অর্জুনপুত্র অভিমন্যুর হাতে যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে রাখী বেঁধে দিয়েছিলেন। অতএব রাখী হল স্নেহ-ভালবাসার বন্ধন দিয়ে মোড়া এক রক্ষাকবচ যা কেবল মাত্র ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।।

আগস্ট ১২, ২০২২
নিবন্ধ

অদৃশ্য সাহায্য (ছোট গল্প)

ট্রেনটা স্টেশনে থামল রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। স্টেশন প্রায় ফাঁকা, দুচার জন এদিক ওদিক শুয়ে আছে।এতো রাতে ট্রেন থেকে খুব একটা বেশি লোক নামে না। আজ আগের ট্রেনটা মিস হয়ে যাওয়ার পর অর্ণা যখন বলল ওর সঙ্গে যেতে তখন ঋতু গেলোনা; মায়ের ওষুধ ফুরিয়ে গেছে যে। সেগুলো কিনতে গিয়েই আজ ট্রেনটা মিস হয়ে গেলো।স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখল চারিদিক সুনসান। ফোনটাও অফ হয়ে গেছে চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ায়।বাড়িতে ফোন করার ও উপায় নেই। দেখে মনে হচ্ছে লোড শেডিং।ভাগ্য ভালো ছোট টর্চ টা সাথে ছিলো। ঋতু হাঁটতে লাগল।একটু যেতেই মনে হলো পিছনে কেউ আসছে। দেখল একটা ফাঁকা রিক্সা।ঋতু অবাক হলো কই দেখতে পায়নি তো স্টেশন এ। ভাবল অন্ধকারে দেখতে পায়নি।রিক্সাচালক একটি অল্পবয়সি ছেলে। ঋতুকে বললো দিদি আমার রিক্সায় ওঠো আমি ওদিকেই যাবো, তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবো। ঋতুকে ইতস্তত করতে দেখে ছেলেটি বলল দিদি আমি তোমার ছোটোভাইয়ের মতো। এতো রাতে একা যেও না রাস্তা ভালো না। ঋতু আর দ্বিধা না করে উঠে পরলো রিক্সায়।ছেলেটি বেশ ভালো, গল্প করতে করতে এগিয়ে চলল। পথে একটা পুরনো বাড়ি পরে, ওখান টা বেশ গা ছম ছম করতে লাগল। ছেলেটা তখন বলল ভয় কি দিদি আমি আছি। তখন সমীর মানে রিক্সাচালক ছেলেটি বলতে লাগল---- পাঁচ বছর আগে এরকম এক অন্ধকার রাতে তোমার মতো একজন মেয়ে হেঁটে ফিরছিল। তখন ঐ বাড়িটার দাওয়ায় একদল ছেলে আড্ডা দিত মানে মদের আসর বসত। এই পথ দিয়ে মানুষের যাওয়ার উপায় ছিলোনা। মেয়েটি তোমার মতই নিরুপায় হয়ে এই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। যেই না ওদের সামনে এসেছে ওর শুরু করলো বদমাইশি। আমি তখন একজনকে নামিয়ে বাড়ি ফিরছি। চিৎকার শুনে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে ওদের বাধা দিলাম। কিন্তু ওরা ছিলো চার পাঁচ জন। আমি তাও ওদের আটকাতে চেষ্টা করলাম। মেয়েটিকে বললাম তুমি পালাও। মেয়েটি আমার কথা শুনে ছুট লাগালো। ওর পিছনে একজন ছুটল। বাকিরা আমাকে মারতে লাগল। শেষে একজন ওদের ফেলে দেওয়া বোতল ভাঙা আমার পেটে ঢুকিয়ে দিল। আমি আর পারলাম না। পরে গেলাম মাটিতে, রক্তে ভেসে গেলো আমার দেহ। ছেলে গুলো আমাকে মরে যেতে দেখে পালিয়ে গেলো।এই দিদি তুই এখানে কি করে এলি? আমি তো তোকে আনতে স্টেশন গেছিলাম, কিন্তু দেখতে পেলাম না।ঋতু ভাই কে কিছুই বলতে পারলো না। শুধু বলল পরে বলবো। এখন ঘরে চল। ওর ভাই অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। কিছুই বুঝল না।সমীররা এইভাবেই সাহায্য করে যায় মানুষ কে......।।

জুলাই ১০, ২০২২
নিবন্ধ

আহত বাক্যবন্ধরা - (অন্তিম পর্ব)

ফায়েজ আর তাঁর কবিতার মতো একই দশা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আর তাঁর বন্দেমাতরমের। ইতিহাস যে কত অজানা তথ্য এ বিষয়ে দেয় তা পৃষ্ঠা না ওল্টালে বোঝা যাবে না। স্বাধীনতার বহু আগে থেকেই এই বন্দেমাতরমকে ইসলাম-এর তৌহিদ বিরোধী বলে ধরা হতো। যদিও বন্দেমাতরম এর জনপ্রিয়তা ব্রিটিশ বিরোধী, ঔপনিবেশিকতা বাদ বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক বিশেষ স্থান নিয়েছিলো--- we have evidence that it was sung in the calcutta sessions of Indian national congress in 1896-- the song was rendered by Rabindranath Tagore and the music was composed by him (Vande Mataram, Biography of a Song, Sabysachi Bhattacharya, page 19)! স্বদেশী আন্দোলনকারীরা ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়তেও গেয়েছিলেন বন্দেমাতরম। এমন কি গান্ধীজি বলেন, প্রথমবার শুনেই তাঁর অন্তর বিগলিত হয়( Gandhi says his heart was touched when he first heard it, when he was just a lad---M K Gandhi in Harijan 1 st july 1939)! কিন্তু সে সময়তে এই গান নিয়ে বিতর্কও দেখা যায় যে এই গানটি জাতীয় সঙ্গীত হতে পারে কিনা। বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এটি পৌত্তলিকতা সমর্থনের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। বাংলা জার্নাল ইসলাম দর্শন ১৯২০ তে লেখে The only and Supreme Allahs kalima Allahu Akbar when combined with Hindus anthem to mother India, Vande mataram was found objectionable -- it was pushing the Muslims to idolatry.(Haram and Kafur, Abdul wadud, Islam Darshan Vol 1). একই ধরনের বক্তব্য উঠে এসেছিল ১৯২৮ এর শরিয়ত - এ- ইসলাম পত্রিকায় --We must remind you of Shariat and that chanting Vandemataram is forbidden for Muslims(Editorial on Vandemataram, Shariat- e- Islam, vol3 No 11 1335 BS. M. N. Islam,op,cit, p 245).১৯৩৭ সালে কংগ্রেসের কলকাতায় অনুষ্ঠিতব্য ওয়ার্কিং কমিটি মিটিং-এর আগে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস রবীন্দ্রনাথকে লেখেন, while I writing to you, I also plan to write to Jawaharlalji.... Discussions are going on in Congress circles on the subject of Vande matram. On 26 October (1937) Congress working committee at their meeting in Calcutta will address the issue. Perhaps the committee will decide to discard the song. I do not know your opinion on this matter and that is why I write to you. In Bengal and among Hindus outside of Bengal great excitement has been caused and I write to you now because many friends advised me to do so. (Subhas Bose, letter to Rabindranath Tagore, 16 October 1937)রবীন্দ্রনাথ এর উত্তরে কি বললেন? যেটা বললেন সেটা দেখে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ কতখানি দূরদর্শী ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদ রক্ষার ব্যাপারে---To me the spirit of tenderness and devotion expressed in its first portion, the emphasis it gave to beautiful and beneficent aspects of our motherland made a special appeal, so much so that I found no difficulty in dissociating it from the rest of the poem and those portion of the book of which it is a part, with all the sentiments of which, brought up as I was in the monotheistic ideals of my father, I could have no sympathy (Rabindranath Tagore letter to J Nehru, President of Indian National Congress,, 26 0ctober 1937/ Rabindra Jeebanee, Prabhat Kumar Mukhopadhyay, Vol IV). রবীন্দ্রনাথ বন্দেমাতরম এর ভিতরের ছত্রগুলি বাতিল করার স্বপক্ষে টেনে নিয়ে এলেন তাঁর পিতার একেশ্বরবাদের প্রতি আসক্তির কথাগুলিও।শেষ মেষ ১৯৩৭ সালের কংগ্রেসের কলকাতার ওয়ার্কিং কমিটি ঠিক করে যে বন্দেমাতরম এর প্রথম দুই স্টাঞ্জাই জনসমাবেশে গাওয়া হবে, যার মধ্যে বিরক্তিকর কোনও অংশ নেই। এমন কি এই গান না গাওয়ার ক্ষেত্রে ছুট দেওয়া হয়, এমন কি অন্য কোন আপত্তিকর গান না গাওয়ার (বন্দেমাতরম এর পরিবর্তে) স্বাধীনতা দেওয়া হয়। প্রাবন্ধিক এ জি নুরানি, ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনের ১৯৯৯ সালের জানুয়ারির প্রথম সংস্করনে লেখেন-- Taking all things into consideration, therefore the committee recommended, that wherever Vande mataram is sung at National gatherings, only the first two stanzas should be sung,with perfect freedom to organisers to sing any other song of an unobjectionable character in addition to or in the place of Vande mataram song.( Quoted from the article, why Muslims reject Vande Mataram, written by A. Faizur Rehman in HT Image, Aug 30 2006).কংগ্রেসের এতো ছাড়ও কোনও কাজে এলো না। জিন্না ১৯৩৮ -এর মার্চে একটি চিঠিতে নেহেরুকে বললেন, Pandit Jawaharlal Nehru cannot be unaware that Muslims all over have refused to accept the Vande mataram or any expunged edition of the anti Muslim song as a binding national anthem(M A Jinnah, letter to J Nehru 17, March 1938, P.P Documents, page 361). বন্দেমাতরম নিয়ে যে উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল, তার প্রশমনের জন্য, ১৯৩৯ এর জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কিং কমিটি মিটিং ওয়ার্ধাতে গান্ধী লেখেন, .......in the present state of things, in local board and Assembly meetings which their members (are) obliged to attend the singing of Vande mataram should be discontinued. (Vande Mataram, the Biography of a song, page 40)দেশ স্বাধীন হয়েছে। গান্ধীজি খুন হয়েছেন। কিন্তু বন্দেমাতরম নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি। স্বাধীনোত্তর কালেও যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি অংশের মধ্যে যে ক্ষোভ এখনও বিরাজমান, সেই বিষয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পোর্টালে ১৭ জুলাই ২০১৭ সংখ্যায় A history of the origin of the Vande mataram and Its journey thereafter নিবন্ধে রাধিকা আয়েঙ্গার লিখছেন, --- In 2006 General Secretary of Jamiat ulema Hind (important Islamic organisation in India) Maulana Mahmud Madani said, No Muslim can sing Vande mataram, if he consider himself to be a true believer তারপরে আরও জানালেন, Then in 2009 Muslim clerics issued fatwa against the singing of Vande mataram in Deoband! স্বাধীন ভারতে বন্দেমাতরম কতখানিক ক্ষোভ এক শ্রেনীর নাগরিক এর মাঝে তৈরি করেছে তা ২৭ শে জুলাই ২০১৭ এর মৃত্যুঞ্জয় বোসের লেখা ইংরেজি দৈনিক ডেকান হেরাল্ড এর Shot me, but still wont sing Vande mataram, says Muslim leader নিবন্ধে দেখা যায়। তিনি লিখছেন, The issue of singing Vande mataram sparked off a big political contriversy in Maharashtra with two legislators -- Abu Asim Azim of Samajwadi party and Waris Pathan of Owasi brothers led All India Majlis e Ittehedul Muslimeen saying that it can not be forced on other to prove the sense of nationalism.সাহিত্যের জন্ম হয় সময়ের গর্ভ থেকে। তা সে পাস্তারনেকের ডঃজিভাগো হোক, বা ফায়েজের আজ বাজার মে পা বা যাওলা চলো অথবা বংকিমচন্দ্রের আনন্দমঠ থেকে উঠে আসা বন্দেমাতরম। সময়ের প্রেক্ষাপটে বিচার না করলে সৃষ্টির প্রতি অন্যায় করা হয়। ঐতিহাসিক তনিকা সরকার তাঁর গ্রন্থ Birth of Goddess, Vande mataram, Ananda math and Hindu nationhood.-এ এই সময়ের উল্লেখ করেছেন যখন পুতুল নবাবদের পিছন থেকে চালাচ্ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোং। কোম্পানি রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে দরিদ্র প্রজাদের রক্ত চোষা শুরু করেছিল। যে কোনও ভাবে রাজস্ব বৃদ্ধিই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। অত্যাচার এতটাই ভয়ংকর ছিল যে তার সাথে আসা ক্রমান্বয়িক খরা চরম দুর্ভিক্ষের জন্ম দেয়। বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যান। তিনি আর ও বলেন, আনন্দমঠ উপন্যাসে দেখানো হয়েছে, কিভাবে এই দুর্যোগ দরিদ্র সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু কৃষক আর মুসলিম নবাবদের সংঘাতে পরিনত হয়--The Nawabs responsible not just for wide spread death and starvation, but also for a deliberate total destruction of Hindus, of their honour, faith, caste and women. In other words it forces a split between the agents and victim of the famine, the agents are Muslims and the striving and dying people are already identified as Hindus. (collected from the article A history of the origins of Vandemataram and Its journey thereafter written by Radhika Iyenger July 27, 2017 in the Indian Express portal)।বন্দেমাতরম এ যে পৌত্তলিকতার কথা বলা হয়, বঙ্কিমচন্দ্র কি আদতে পৌত্তলিকতার পক্ষে ছিলেন? ১৮৭৪ এ তিনি মূর্তি উপাসনা বিষয়ে একটি নিবন্ধ লেখেন----If an object which I see is made of stone or earth attracts our devotion, why can one give the same devotion to a being unseen but all- pervading in the universe?.. Idolatry is anti science. Whenever idolatry prevails, knowledge does not advance [Bankim Chandra, বঙ্গে দেব পূজা (Deity worship in Bengal), 1281 BS or AD 1874, In বঙ্কিম রচনাবলী, কলকাতা, সাহিত্য সংসদ, ১৯৫৬, ভলুউম ২, পৃষ্ঠা ৮৯৩-৮৯৬] আবার সব্যসাচী ভট্টাচার্য্য তার বন্দেমাতরম, দ্য বায়োগ্রাফি অফ আ সঙ্গ গ্রন্থে ৮৩ পাতায় বলেছেন, ---while most readers naturally look upon it as the poetic representation of the country, it has also been represented as a Comtist hymn, an anti theocratic ode of nationalism free from the cult of Gods, an outcome of chatterjis patriotic doctrine of the country as the object of worship... Integrally associated with his Comtist religion .বঙ্কিমচন্দ্র এর উপর ফরাসী দার্শনিক অগস্ত ক্যঁতের প্রভাব ছিলো যথেষ্ট। অগস্ত ক্যঁতে পজিটিভিজম তত্ত্বের জনক। উইকিপিডিয়া বলছে, পজিটিভিজম হলো-- Positivism is an empirical philosophical theory that holds that all genuine knowledge is either true by definition or a positive---- meaning a posteriori facts derived by reason and logic from sensory experience. Other ways of knowing, such as theology, metaphysics, intuition or introspection are rejected or considered meaningless সব্যসাচী ভট্টাচার্য্য তার উপোরক্ত গ্রন্থে (৮৫ পৃষ্ঠাতে) বলেছেন, Auguste Comte had said that for a system to rise and generally accepted it must be...in agreement with our nature and far from unfavourable to our progress. Bankim quoted this and argued that religion and Its reform must be in agreement with the nature and culture of the people. It is almost certain that this conviction influenced the discursive tone of Anandamath and the admixture of a patriotic message with religious symbolism in the expanded version of Vandemataram in 1881-82.বন্দেমাতরম কতখানি সাম্প্রদায়িক বা পৌত্তলিকতার পক্ষে এটা বিতর্কের বিষয়। তবে কাউকে জোর করে কোনও সামাজিক বা রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ করা যায় না। ঠিক ও নয়। তা সে ফায়েজের বামপন্থাই হোক বা বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদই হোক। তবে এত বিতর্ক, আপত্তি, ক্ষোভের পরও পাস্তারনেক, ফায়েজ, বঙ্কিমচন্দ্ররা বেঁচে থাকবেন। পাস্তারনেক নোবেল পাবেন, ফায়েজ লেনিন অর্ডার ফর পিস পাবেন। আর বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে ২৫০০০ শ্রোতা ভোট দিয়ে বলে দেবেন বন্দেমাতরম ভারতের দুটো জনপ্রিয় সঙ্গীতের মধ্যে একটি (Indian Express 22 December 2002)! মহামান্য মাদ্রাজ হাইকোর্ট ২০১৭ এর জুলাই মাসে রুলিং জারি করেন এই মর্মে যে তামিলনাড়ুর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলিতে সপ্তাহে একদিন অন্তত বন্দেমাতরম গাইতে বলবেন। বন্দেমাতরম-- দেশ মাতাকে প্রনাম।।। সমাপ্ত ।।সুকোমল কান্তি দাশ(লেখক একজন সরকারি আধিকারিক। পড়াশুনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে-- যথাক্রমে ইতিহাস, সাংবাদিকতা ও আইন নিয়ে।)

জুলাই ০৭, ২০২২
নিবন্ধ

আহত বাক্যবন্ধরা - (প্রথম পর্ব)

বলশেভিক বিপ্লব এর পর বহু কবি, লেখক, চিত্রকর, সঙ্গীতজ্ঞ দলে দলে সোভিয়েত রাশিয়া ছাড়তে শুরু করেন --- যাতে তাঁদের বাক স্বাধীনতা বেঁচে থাকে। ব্যতিক্রম ছিলেন বরিস পাস্তারনেক। তিনি সোভিয়েত রাশিয়া ছেড়ে যাননি। ছিলেন সোভিয়েত লেখক সংঘের সক্রিয় সদস্য। স্তালিনেরও খুব প্রিয় কবি এবং লেখক। শোনা যায়, তাঁর অনুরোধে স্তালিন বহু রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তিও দিয়েছিলেন কারাগার থেকে। কিন্তু দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তিত হয় ডক্টর জিভাগো লেখার পর। ডক্টর জিভাগো মূলত বলশেভিক বিপ্লবের পর ঘটে যাওয়া গৃহযুদ্ধ আর তার আবহে সমসাময়িক মানুষ ও তাঁদের ভালোবাসা নিয়েই। কোপদৃষ্টি পড়লো পাস্তারনেক, ডঃ জিভাগো আর তার লেখক সত্ত্বার উপর। ক্রুশ্চেভ এর পত্নী নিকিতা ক্রুশ্চেভ হত্যা করলেন আক্ষরিক অর্থে লেখক পাস্তারনেককে। শারীরিক ভাবে তিনি মরলেন না। কিন্তু নিষিদ্ধ হলো তাঁর ডঃজিভাগো।যখন ওনার A Dream কবিতাটি পড়ি সেই বুড়ো এবং বধির সময়ের কথা মনে পড়ে যে সময় হত্যা করে চলে কবির জগতকে এক সর্বগ্রাসীতার বিষে---But time grew old and deaf.And you the loud one, quite suddenly were still.This broke a spell.The dreaming ceased at once,as though in answer to an abruptly silenced bell (অংশ বিশেষ)সেদিন নিউজ এইট্টিনের পোর্টালে একটা সংবাদে চোখ আটকে গেলে। যদিও এদেশ সোভিয়েত রাশিয়ার মতো কম্যুনিস্ট শাসনের তলায় নেই, তবুও মনে হলো সোভিয়েত অবস্কুরান্টিজমের সাথে কোথাও যেনো একটা মিল আছে ---CBSE removes verses by Faiz from NCERT Class 10 political science book! CBSE অর্থাৎ কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ উর্দু কবি ফায়েজ আহমেদ ফায়েজের অনেক কবিতা আর ছবি দশম শ্রেণির পাঠ্য বিষয় থেকে বাদ দিয়েছে। পৃষ্ঠা নং ৪৬, ৪৮ এবং ৪৯ (Domestic politicsII) থেকে বাদ গেছে বহু ছবি। একটি ছবি বা পোস্টার ছিলো ফায়েজের; একটি কবিতা যা ANHAD (Act now for harmony and democracy) নামক একটি সংস্থা পর্ষদকে দিয়েছিল তাও বাদ গেছে। ঐ সংস্থার কর্ণধার হলেন হর্ষ মান্দার আর শবনম হাসমি। কারা এই মান্দার আর হাসমি? মান্দার একজন গবেষক, প্রাবন্ধিক, লেখক, সমাজকর্মী। লেখেন হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য হিন্দু আর দৈনিক ভাস্কর পত্রিকায়। বিখ্যাত চিত্রপরিচালক শ্যাম বেনেগলের সমর নামক চলচ্চিত্রের (১৯৯৯) কাহিনিও তাঁর লেখা। খাদ্যের অধিকার আন্দোলনে একসময় সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল কমিশনার ছিলেন। ছিলেন ইউপিএ সরকারের উপদেষ্টা মন্ডলীর অন্যতম সদস্য। আর শবনম হাসমীও একজন সমাজ-কর্মী। সাফদার হাসমীর ভগ্নি। মূলত নারীর অধিকার, লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে কাজ করেন। ২০০৫ এ তাঁর নাম নোবেল পদকের জন্য নমিনেটেড হয়।যে কবিতা দুটোর অনূদিত অংশ বাদ গিয়েছে সেগুলি ১) ঢাকা সে ওয়াপসি পর ২) আজ বাজার মে পাবা যাওলা চলো। আর তার অনূদিত অংশ যা আমাদের পাঠক্রমে ছিলো সেগুলি হলো --We remain strangers even after so many meetings, blood stain remain even after so many rain. মূল কবিতাটি হলো--- হাম কি ঠেহরে আজনবি ইতনি মাদারতো কে বাদ/ ফির বনেঙ্গে আসনা কিতনে মুলাকাতো কে বাদ/ কব নজর আয়েগি সব্জে বাহার?/ খুন কে ধাব্বে ধুলেঙ্গে কিতনে বারসাতো কে বাদ?এর বাংলা তর্জমা হলো এতো দিন একসাথে থাকার পর আমরা আগন্তুক নিজেদের কাছেই / আবার কবে হবে সখ্যতার উদয়, কতবার সাক্ষাৎ এর পর? / আবার কবে ফিরে আসবে নিষ্কলুষ বসন্ত? / রক্তের দাগ মিলিয়ে যাবে আর কত বৃষ্টিপাতের পর?/কবিতাটি ফায়েজ আহমেদ ফায়েজ লেখেন ১৯৭৪ সালের পর ঢাকা থেকে ফিরে আসার পর। উনি সহ্য করতে পারেননি এতো রক্তপাত, এতো ভাতৃহত্যা আর ধ্বংস। এই কবিতাটি তার ই প্রতিফলন মাত্র৷ আর আমাদের শিশুদের পাঠ্য বই এ থাকার লক্ষ্য ---পরবর্তী প্রজন্মকে রক্তপাতের বিরুদ্ধে আর শান্তির পক্ষে সোচ্চার করা।দ্বিতীয় অনুদিত অংশ হলো--- Not enough to shed tear, to suffer anguish, not enough to make love in secret. Today walk in the public square, fettered in chain!উর্দুতে মূল কবিতা টি ছিলো এই রকম--- চস্মে নম্, জান এ সোরিদা কাফি নেহি? তোহমতে ইস্ক পোসিদা কাফি নেহি?আজ বাজার মে পা বা যাওলা চলো?বাংলা করলে অর্থ টি প্রায় এইরকম হবে--- আমাদের ভেজা চোখ,পচে যাওয়া আত্মা দেখেও তোমার ( শাসক) শান্তি নেই?ভয়ে লুকিয়ে প্রেম করি, তাতেও শান্তি নেই?চলো তাহলে আজ শৃংখল পড়েই বাজারে বেরিয়ে পড়ি!ফায়েজ এই কবিতাটি যখন লিখেছিলেন তখন পাকিস্তানের লিয়াকত সরকার তাকে সরকারবিরোধী চক্রান্ত মামলায় জেলে বন্দী করে রেখেছে। আর তিনি এই বন্দী অবস্থায় অসুস্থ হয়ে ডাক্তার এর কাছে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পুলিশ সেই সময় তেও অসুস্থ ফায়েজকে হাতকড়া পড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সেই অত্যাচার নিয়ে এই কবিতা। কবিতাটি দুনিয়ার সমস্ত স্বৈরাচারীদের বিরক্তি উদ্রেক করে। এটি অত্যাচারিতদের এক বিনম্র প্রতিবাদ।এই কবিতা দুটি বাদ দেওয়ার পিছনে যুক্তি কি? ভিন্ন মতাদর্শী হর্ষ মান্দার আর শবনম হাসমিদের সাথে এই কবিতাটি জড়িয়ে আছে? ফায়েজ পাকিস্তানি? ফায়েজ মুসলিম? ফায়েজ ভারত বিদ্বেষী? না লেফট লিবারেলদের সাথে কায়েমি স্বার্থের বাদ বিষমবাদ?সেদিন ফায়েজের কবিতা সম্বলিত একটি বই পড়ছিলাম। নাম Poems by Faiz! বইটির লেখক, অনুবাদক ও সংকলক V. G. Kiernan,(Oxford University Press, 1971)। লেখক এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটাস অধ্যাপক। বইটি সম্পর্কে মডার্ন এশিয়ান স্টাডিজের রাল্ফ রাসেল মন্তব্য করেছেন--One could hardly wish for a more adequate and authentic presentation... to a readership not acquainted with the language in which it was written...the excellence of transalation is quite striking... High praise to all[ those] who produce [it]! উর্দু নিয়ে যাঁদের পড়াশোনা আছে, তাঁরা এই বইটিকে ফায়েজের একটি প্রামান্য অনুবাদ বলে মনে করেন। এই বইতে ফায়েজ এর ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতি গভীর আসক্তির কথা বলতে গিয়ে Kiernan বলেছেন--- গান্ধীজি খুন হবার পর স্বাধীনত্তোর কালের সাম্প্রদায়িক টানাপোড়েনের আবহে ও ফায়েজ গান্ধীজির শেষকৃত্য সম্পাদনের সময় ভারতে আসেন। ইংল্যান্ডের The observer (March 11, 1951) পত্রিকা লিখছে--- a brave enough man to fly from Lahore for Gandhis funeral at the height of Indo- Pakistan hatred ( quoted from the book--- Poems by Faiz, translated with introduction and notes by V.G. Kiernan, Oxford India, page 24)। আসলে ফায়েজ দেশভাগ তো চানই-নি। আর রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে দেশভাগ এবং তৎপ্রসূত স্বাধীনতা চাননি। এই জন্য তিনি লিখেছিলেন, শুভে আজাদী কবিতাটি --- ইয়ে দাগ দাগ উজালা,ইয়ে সাব গাজিদা সেহর,ও ইন্তিজার থা জিসকা ইয়ে ও সেহর তো নেহি৷ইয়ে ও সেহর তো নেহি জিসকি আরজু লেকর চলে থে ইয়ার,মিল জায়েগি কহি না কহি ফলক কি দাস্ত পে তারো কি আখরি মঞ্জিল! বাংলা অনুবাদ খানিকটা এরকম--- কলংকিত সূর্য এর উদ্ভাস, অন্ধকারাচ্ছন্ন ভোর।এ ভোরের আশা করে আমরা ঘর ছাড়িনি।ভেবেছিলাম ছায়াপথের কোথাও নক্ষত্রের শেষ গন্তব্যে পৌঁছে যাবো, আমরা সহযোদ্ধার দল!দেশভাগের সাথে সাথে ফায়েজ ঘোরতর বিরোধী ছিলেন, ফ্যাসিবাদেরও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে শুধুমাত্র নাজীবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদানকে সমসাময়িক প্রগতিবাদী যুব সমাজের মতো উনিও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে শরিক হবার একটি সুবর্ণ সুযোগ বলে মনে করেছিলেন।--- After the Nazi invasion in Soviet union in 1941,Faiz like many Indians saw the war in a new light as a contest in which the destinies of mankind were stake (V.G.Kiernan in Poems by Faiz)। ফায়েজ উন্নীত হন লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে!ফায়েজ এর কবিতা বরাবরই এই উপমহাদেশে স্বৈরতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনের জীবন্ত রসদ। তাঁর আর একটি কবিতা, যা মূলত জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসন এবং তৎপরবর্তী তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে লেখা। এটা পাকিস্তান ও বহুসময়ে ভারতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মানসিক শক্তিমুখ বলা যায়--হাম দেখেঙ্গে, হাম দেখেঙ্গে!লাজিম হ্যায় কে হাম ভি দেখেঙ্গে!ও দিনকা জিসকা ওয়াদা হ্যায়!যো লওহে আজল মে লিকখা হ্যায়!হাম ভি দেখেঙ্গে!এর বাংলা অনুবাদ খানিকটা এরকম--আমি দেখবো, আমি দেখবো(হে শাসক),যে দিনের প্রতিশ্রুতি তুমি দিয়েছিলে,যে দিনের কথা নিয়তির গ্রন্থে লেখা আছে, আমি দেখব,আমিও দেখব!ফায়েজ কি শুধু বিপ্লব, বামপন্থার কবি? সে রকম বোধহয় নন। বারান ফারুকী, জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক তাঁর গ্রন্থ Faiz Ahmed Faiz --- the color of my heart -এ লিখছেন--- Rather he is a poet who speaks for lonely, the single human being. কবির আর তাঁর কবিতা কোন ভৌগোলিক মানচিত্র এর রেখার মধ্যে কি সীমাবদ্ধ থাকে? শাসকরা যুগে যুগে চান তাঁদের বিরোধী কোনও শক্তি যেন না থাকে? বিরোধীরা যে কোনও ভাবেই সংঘবদ্ধ না হয়। আর সংঘবদ্ধ হওয়ার যা যা উপাদান -- কবিতা, গান, গাথা, নাটক সব নিষিদ্ধ করতে উদ্যত হন তারা! ফায়েজের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে। কিন্তু এগুলো ভেঙে মানুষ যুগে যুগে বেরিয়ে এসেছে। নির্মলেন্দু গুনের ভাষায় বললে -- আমরা সেই সব আলগুলো ভেঙে ফেলব, যা এতদিন ধরে আমাদের খন্ড বিখন্ড করে রেখেছিল!(আলগুলো ভেঙে ফেলব কবিতা থেকে)! ফায়েজ ছিলেন আমৃত্যু বামপন্থী। একসময় ছিলেন পাকিস্তান টাইমস নামক ইংরেজি দৈনিক-এর সম্পাদক। ছিলেন পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য। যোগাযোগ ছিল সেদেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাথে। পেয়েছিলেন সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার লেনিন পিস প্রাইজ! যা ধনতান্ত্রিক দুনিয়ার নোবেল প্রাইজের সমতুল্য। ফায়েজ কম্যুনিস্ট আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন যে উনি মনে করতেন ইসলাম আর কম্যুনিস্ট আদর্শের কোনও ফারাক নেই। কুলদীপ নায়ার তার আত্মজীবনী Beyond the lines, an autobiography (Page 254)তে ফায়েজের সম্পর্কে তাঁর সাথে সাক্ষাতের পর লেখেন -- Once he spoke about radical Islam. As he was a leftist but not an atheist, he argued how Islam and the ideology of left were on same page. Lal Islam is the phrase he used. এহেন মানুষের দুটি কবিতার অংশ বাদ যাওয়াকে ফায়েজের ভাষায় বললে হয়, ইস ওয়াক্ত তো লাগতা হ্যায়, ইয়াহা কুছ ভি নেহি হ্যায়-- মাহাতাব, না সুরজ না অন্ধেরা না সবেরা! বাংলায় এর অর্থ হলো এখন মনে হচ্ছে এখানে কিছুই নেই। না আছে চাঁদ না সূর্য, না আছে অন্ধকার, না আছে আলো!মনে হচ্ছে কোনও প্রাগৈতিহাসিক দানব ঘড়ির কাটাকে জোর করে থামিয়ে দিয়েছে।ক্রমশ......সুকোমল কান্তি দাশ(লেখক একজন সরকারি আধিকারিক। পড়াশুনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে-- যথাক্রমে ইতিহাস, সাংবাদিকতা ও আইন নিয়ে।)

জুলাই ০৫, ২০২২
  • ‹
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
  • 6
  • 7
  • ›

ট্রেন্ডিং

বিনোদুনিয়া

‘ভারতে আর শান্তি পাই না’, তুমুল বিতর্কের মাঝেই সঞ্জয় দত্তের ইউটার্ন! কী সাফাই দিলেন মুন্নাভাই?

ভারতে আর শান্তি পাই নাশেখর সুমনের অনুষ্ঠানে সঞ্জয় দত্তের এই মন্তব্য ঘিরে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনুষ্ঠানের একটি অংশ প্রকাশ্যে আসার পর সমাজমাধ্যমে অভিনেতাকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে না হতেই এবার নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন সঞ্জয়। অভিনেতার দাবি, তাঁর কথার ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং পুরো কথোপকথনটাই ছিল আগে থেকে লেখা ও হালকা মেজাজের।শেখর সুমনের অনুষ্ঠানে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সঞ্জয় বলেছিলেন, ভারতের মানুষ অত্যন্ত ভালো ও অতিথিপরায়ণ। কিন্তু ইদানীং দেশে আগের মতো শান্তি তিনি অনুভব করছেন না। সেই শান্তির সময় যেন দ্রুত ফিরে আসে, শিবের কাছে এমন প্রার্থনা করেন বলেও জানিয়েছিলেন অভিনেতা। এই মন্তব্যের একটি অংশ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় বিতর্ক।এর পরেই সঞ্জয় দত্ত নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, কোনও ব্যক্তি, সম্প্রদায় বা প্রতিষ্ঠানের অনুভূতিতে আঘাত করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। কাউকে অপমান বা অসম্মান করার ইচ্ছাও তাঁর ছিল না বলে জানান অভিনেতা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানের কথোপকথনটি চিত্রনাট্য মেনেই তৈরি হয়েছিল এবং দর্শকদের বিনোদনের কথা মাথায় রেখেই তা বলা হয়েছিল।সঞ্জয়ের ব্যাখ্যা, তাঁর কথাগুলিকে অনুষ্ঠানের মূল প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে দেখা হয়েছে। মুন্নাভাই ছবির হাস্যরস ও ব্যঙ্গের ধাঁচেই কথাগুলি বলা হয়েছিল বলে দাবি তাঁর। বিশেষ করে গান্ধীগিরি-র ভাবনার মাধ্যমে ভালোবাসা, আন্তরিকতা, একতা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বার্তা দেওয়াই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই বক্তব্যের মূল ভাবটি হারিয়ে গিয়ে তা অন্য ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।বিতর্কের সূত্রপাত মূলত অনুষ্ঠানের সেই অংশ নিয়ে, যেখানে সঞ্জয় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর মন্তব্য করেছিলেন। পরে তাঁর বক্তব্যের আরও কিছু অংশও সামনে আসে, যেখানে মুন্নাভাই-এর ভঙ্গিতে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ এবং শান্তির বার্তা ছিল। ফলে পুরো কথোপকথনটি কী প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।তবে বিতর্ক থামেনি। মন্তব্যটি নিয়ে সমাজমাধ্যমে একাংশের সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। অন্য দিকে সঞ্জয়ের বক্তব্য, তাঁর কথার উদ্দেশ্য ছিল না কাউকে ছোট করা বা দেশের মানুষকে অসম্মান করা। বরং হাস্যরসের মাধ্যমে শান্তি, ভালোবাসা ও ঐক্যের বার্তাই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তিনি।ফলে একটি মন্তব্য ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন অন্য মোড় নিয়েছে। প্রথমে ভারতে শান্তি নেই মন্তব্য, তার পর সমাজমাধ্যমে সমালোচনা এবং শেষে অভিনেতার চিত্রনাট্য-নির্ভর কথোপকথনের ব্যাখ্যাসঞ্জয় দত্তকে ঘিরে এই বিতর্কে আপাতত নজর তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই।

অক্টোবর ০৫, ২০২৬
দেশ

সর্বসম্মতি না থাকলে এসআইআর বাতিল? জ্ঞানেশ কুমার মামলায় সুপ্রিম কোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ

এসআইআর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টে বড় মোড়। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের একক ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনারদের আইনি রক্ষাকবচের বৈধতা নিয়ে দায়ের হওয়া মামলায় নোটিস জারি করেছে শীর্ষ আদালত। একই সঙ্গে ফর্ম-৬-এ পরিবর্তন নিয়ে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের প্রশ্ন ঘিরেও নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।মামলাকারীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সব কমিশনারের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। আইনজীবী বিকাশ সিং আদালতে অভিযোগ করেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার একক ভাবে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম খতিয়ে দেখতে রাজি হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তবে এই পর্যায়ে আদালত জ্ঞানেশ কুমারকে স্থগিত করার অন্তর্বর্তী আবেদন গ্রহণ করেনি।মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু ও বিবেক জোশীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় আইনি রক্ষাকবচের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৩ সালের আইনে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ আধিকারিকদের তাঁদের সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত কিছু কাজের ক্ষেত্রে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। সেই রক্ষাকবচের সাংবিধানিক বৈধতাকেও চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।এই মামলায় আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী নির্বাচন কমিশনের কাজের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মামলাকারীদের তরফে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েই মূল আপত্তি জানানো হয়েছে।শুনানিতে ফর্ম-৬-এর পরিবর্তনের বিষয়টিও সামনে আসে। ভোটার তালিকায় নাম তোলা বা সংশোধনের জন্য ব্যবহৃত এই ফর্মে সাম্প্রতিক সময়ে একটি পরিবর্তন করা হয়েছিল। পরে সেই পরিবর্তন সরিয়ে নেয় নির্বাচন কমিশন। এর আগে দুই নির্বাচন কমিশনার ওই পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল।ফর্ম-৬ নিয়ে শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানতে চান, ওই পরিবর্তন কে করেছিলেন। আদালতের তরফে স্পষ্ট করে বলা হয়, ফর্ম-৬-এ যে পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তার জন্য আদালতের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের এই গুরুত্বপূর্ণ নথিতে কী ভাবে এবং কার নির্দেশে পরিবর্তন হয়েছিল, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।এসআইআর নিয়েও মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে। মামলাকারীদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশন যদি সাংবিধানিক ভাবে নির্ধারিত যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে থাকে, তা হলে সেই সিদ্ধান্তগুলির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এসআইআর ইতিমধ্যেই বাতিল হয়ে গিয়েছে বা আদালত তা বাতিল করে দিয়েছেএমন কোনও নির্দেশ এই শুনানিতে দেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য নোটিস জারি করে পরবর্তী শুনানির পথ তৈরি হয়েছে।এর আগে নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল, গত এক বছরে নেওয়া সব সিদ্ধান্তই সর্বসম্মত ছিল। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য বা পরামর্শ থাকলেও তা সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। অন্য দিকে, প্রকাশিত নথি নিয়ে প্রতিবেদনে দুই নির্বাচন কমিশনারের একাধিক আপত্তির কথা উঠে এসেছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের ভিতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।এখন নজর পরবর্তী শুনানির দিকে। ফর্ম-৬ পরিবর্তনের বিষয়টি কী ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে আদালত কী বলে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের আইনি রক্ষাকবচের বৈধতা নিয়ে মামলাটি কোন দিকে এগোয়, তা নিয়েই এখন অপেক্ষা।

অক্টোবর ০৫, ২০২৬
বিদেশ

ইমরানের মুক্তির দাবিতে রাজপথে হাজার হাজার মানুষ, ইসলামাবাদমুখী মিছিল ঘিরে পাকিস্তানে চরম উত্তেজনা!

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানের রাজপথে ফের বড় মিছিল। সরকারের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর খাইবার পাখতুনখোয়ার লাক্কি মারওয়াত থেকে ইসলামাবাদের উদ্দেশে দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করেছে ইমরানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফের সমর্থকেরা। মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ সোহেল আফ্রিদি। দলীয় সমর্থকদের নিয়ে মিছিলের লক্ষ্য ইসলামাবাদে পৌঁছনো।ইমরানের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত এই মিছিল শুরু হওয়ার আগেই পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সরকারের সঙ্গে তেহরিক-ই-ইনসাফের আলোচনা কোনও সমাধানে পৌঁছয়নি। এরপরই পূর্বঘোষণা অনুযায়ী মিছিল শুরু করে ইমরানপন্থীরা। বিভিন্ন জেলা থেকে বহু সমর্থক লাক্কি মারওয়াতে জড়ো হন। মিছিলের সঙ্গে থাকা বহর ধীরে ধীরে ইসলামাবাদের দিকে এগোচ্ছে।মিছিল আটকাতে প্রশাসনের তরফেও কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইসলামাবাদের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। একাধিক জায়গায় রাস্তা আটকে দেওয়া হয়েছে কন্টেনার দিয়ে। রাজধানীতে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে প্রশাসন আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে।মিছিল ঘিরে বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ ও সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে বলেও খবর। কিছু এলাকায় পাথর ছোড়াছুড়ি এবং লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ইমরানের দলও অভিযোগ করেছে, তাদের বহু সমর্থককে আটক করা হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে প্রায় দুই হাজার জনকে আটকের কথা বলা হয়েছে। তবে আটকের সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য রয়েছে।অন্য দিকে, ইমরানপন্থীরা জানিয়েছে, প্রশাসনের বাধা সত্ত্বেও তারা আন্দোলন থেকে পিছিয়ে যাবে না। মিছিলের লক্ষ্য ইসলামাবাদে পৌঁছে ইমরান খানের মুক্তির দাবিকে আরও জোরালো করা। তেহরিক-ই-ইনসাফের নেতৃত্বের বক্তব্য, সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই আলোচনা সফল না হওয়াতেই ফের রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।এই মিছিলের নেতৃত্বে থাকা খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি লাক্কি মারওয়াত থেকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তিনি জানান, প্রদেশের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনও নীতি মেনে নেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ইমরান খানের নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি সমর্থনও জানান তিনি।ইমরান খান ২০২৩ সাল থেকে জেলে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং বিভিন্ন মামলায় তাঁকে সাজাও দেওয়া হয়েছে। ইমরান ও তাঁর দল অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে চলা আইনি পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে। পাকিস্তান সরকার সেই অভিযোগ মানে না। ফলে ইমরানের জেলবন্দি থাকা এবং তাঁর মুক্তির দাবিকে ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েন চলছে।এ বার সেই টানাপোড়েনই নতুন করে রাজপথে এসে পড়েছে। লাক্কি মারওয়াত থেকে শুরু হওয়া মিছিল কত দূর এগোয়, ইসলামাবাদে পৌঁছতে পারে কি না এবং প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘাত কতটা বাড়ে, এখন নজর সেদিকেই। পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মিছিল নতুন করে কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়েও জোর চর্চা শুরু হয়েছে।

অক্টোবর ০৫, ২০২৬
কলকাতা

মমতার পায়ের রিপোর্ট প্রকাশ্যে! হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য ভবনকে আইনি নোটিস, এবার কী হবে?

২০২১ সালের নন্দীগ্রাম বিধানসভা নির্বাচনের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে চোট লাগার ঘটনা নিয়ে ফের তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিক বৈঠকে সেই সময়ের একটি মেডিক্যাল রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনে দাবি করেন, রিপোর্টে পায়ে হাড় ভাঙা বা স্থানচ্যুতির প্রমাণ মেলেনি। এর পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী সরকারি হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য দফতরের সংশ্লিষ্ট কর্তাদের আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।আইনি নোটিসে মূল প্রশ্ন তোলা হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য কীভাবে প্রকাশ্যে এল। তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য, কোনও সরকারি সংস্থা বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ আইন মেনে কোনও মেডিক্যাল নথি সংগ্রহ করলেও, সেই নথি সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করার অধিকার স্বয়ংক্রিয় ভাবে তৈরি হয় না। চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং সংবেদনশীল বলেও নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে।নোটিসে সংবিধানের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের গোপনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য সুরক্ষিত রাখা চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্বের অংশ বলেও আইনজীবীর তরফে যুক্তি দেওয়া হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের গোপনীয়তার অধিকার রয়েছেএই বিষয়টিকেও বিশেষ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।এই বিতর্কের সূত্রপাত নন্দীগ্রামের পুরনো ঘটনা নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে। সাংবাদিক বৈঠকে তিনি ২০২১ সালের এগারো মার্চের বাঙুর ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সের রেডিয়ো ডায়াগনসিস বিভাগের একটি রিপোর্ট দেখান। তাঁর দাবি, সেই রিপোর্টে পায়ে হাড় ভাঙা বা স্থানচ্যুতির কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সেই নথি দেখিয়ে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৎকালীন পায়ের চোট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বিষয়টি তদন্তের কথা জানান।শুভেন্দুর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিষয়টি সিআইডির নজরে রয়েছে। নির্বাচনী বিধি উঠে যাওয়ার পর এই ঘটনা নিয়ে আরও তদন্ত করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। তবে মেডিক্যাল রিপোর্টে হাড় ভাঙার প্রমাণ না থাকার অর্থ এই নয় যে ওই সময় কোনও ধরনের চোটই ছিল না। সমসাময়িক চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিতে পা ও শরীরের অন্য অংশে আঘাতের কথা উল্লেখ ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে রিপোর্টের ব্যাখ্যা নিয়েই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে এখন মূল প্রশ্ন তোলা হয়েছে রিপোর্ট প্রকাশের বৈধতা নিয়ে। তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য, কোনও ব্যক্তির চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি সরকারি দফতরের হাতে থাকলেই তা প্রকাশ্যে আনার অধিকার তৈরি হয় না। সেই কারণেই হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য দফতরের কাছে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে।অন্য দিকে, তৃণমূলের তরফেও রিপোর্ট প্রকাশ নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। পাল্টা রাজনৈতিক বক্তব্যে শাসক দলের নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, ব্যক্তিগত চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি কীভাবে প্রকাশ্যে এল। আবার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ২০২১ সালের পায়ের চোট নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতেই তদন্তের প্রয়োজন।ফলে নন্দীগ্রামের পাঁচ বছর আগের সেই পায়ের চোটের ঘটনা ফের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। এক দিকে মেডিক্যাল রিপোর্টে হাড় ভাঙার প্রমাণ না থাকার দাবি, অন্য দিকে সেই রিপোর্ট প্রকাশের বৈধতা নিয়ে মমতার আইনি পদক্ষেপদুই দিকের প্রশ্নেই এখন নজর। তদন্ত এগোলে পুরনো ঘটনার আরও কী তথ্য সামনে আসে, সেটাই দেখার।

অক্টোবর ০৫, ২০২৬
কলকাতা

তৃণমূলের পর এবার বিজেপি, রাজ্যসভার টিকিট হাতে কোয়েল! পুরনো সিদ্ধান্ত নিয়ে কী বললেন অভিনেত্রী?

রাজ্যসভার প্রার্থী হিসাবে নাম ঘোষণার এক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপিতে যোগ দিলেন অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক। রবিবার পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভা আসনের উপনির্বাচনের জন্য তাঁর নাম ঘোষণা করেছিল বিজেপি। সোমবার সকালে দলীয় দফতরে তাঁর হাতে বিজেপির পতাকা তুলে দেওয়া হয়। এর পরেই রাজ্যসভায় মনোনয়ন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি।বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর কোয়েল জানান, এই দায়িত্ব তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চান তিনি। বাংলার মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি, কর্মসংস্থান এবং আরও বেশি স্কুল তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্য, মানুষের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ পেলে তিনি নিজের মতো করে সেই দায়িত্ব পালন করতে চান।বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর কোয়েল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানান। গত কয়েক মাসে বাংলায় উন্নয়নের কাজ দেখে তিনি উৎসাহিত হয়েছেন বলেও জানান। তাঁর কথায়, সামাজিক মাধ্যমে তিক্ততা বাড়ছে। কাজের সুযোগ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানো গেলে সেই পরিস্থিতি বদলাতে পারে বলে মনে করেন তিনি।তবে কোয়েলের বিজেপিতে যোগদানের পর সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়েছে তাঁর পুরনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে। কয়েক মাস আগেই তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন তিনি। পরে রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন। রবিবার বিজেপি তাঁকেই ফের পশ্চিমবঙ্গের ওই আসনের প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করে। সোমবার আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক পথবদল আরও স্পষ্ট হয়ে গেল।তৃণমূলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর অবশ্য দেননি কোয়েল। বরং তিনি জানান, অতীতে তিনি কারও সম্পর্কে খারাপ কথা বলেননি এবং ভবিষ্যতেও কাউকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে চান না। রাজনৈতিক মতবদলের পরেও ব্যক্তিগত আক্রমণের পথে হাঁটবেন না বলেই বার্তা দিয়েছেন অভিনেত্রী।আগামিদিনে সক্রিয় রাজনীতিতে তাঁকে আরও বেশি দেখা যাবে কি না, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন কোয়েল। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই মানুষের সেবার সঙ্গে তাঁর পরিচয় রয়েছে। ছুটির সময়ে তাঁর মা তাঁকে মিশনারিজ় অব চ্যারিটিতে নিয়ে যেতেন বলেও জানান তিনি। মানুষের জীবনে সামান্য হলেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারলে সেটাকেই নিজের সাফল্য বলে মনে করবেন বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী।এদিকে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে ঘিরে নানা ধরনের কটাক্ষও শুরু হয়েছে। সেই প্রসঙ্গে কোয়েল বলেন, যাঁরা অন্যকে ছোট করে আনন্দ পান, তাঁদের প্রতি তাঁর কোনও রাগ নেই। মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসাবে বিষয়টিকে তিনি অন্য ভাবে দেখেন বলেও জানান। কটাক্ষকারীদের মানসিক সুস্থতা কামনা করেছেন তিনি।ফলে অভিনয় থেকে রাজনীতিতে আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই কোয়েল মল্লিকের রাজনৈতিক যাত্রায় আরও একটি বড় মোড় এল। তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ থেকে পদত্যাগ, তার পর বিজেপিতে যোগ এবং ফের রাজ্যসভার প্রার্থী হওয়াপরপর এই ঘটনাগুলিই এখন বাংলার রাজনীতিতে কোয়েলকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্র তৈরি করেছে। আগামী রাজ্যসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হিসাবে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, এখন সেটাই দেখার।

অক্টোবর ০৫, ২০২৬
কলকাতা

রবিবারের সংঘর্ষের পর সকালেই বদলে গেল এসআরএফটিআই, গেটে গান্ধীর ছবি, ফের দেওয়াল লিখন!

এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফের উত্তপ্ত সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট। রবিবার বিকেলে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের মিছিলকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের মূল ফটকের সামনে উত্তেজনা ছড়ায়। মিছিলকারীদের একাংশ পুলিশের ব্যারিকেড সরিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের ধস্তাধস্তিও হয়। ক্যাম্পাসের ভিতরে থাকা পড়ুয়া ও শিক্ষকদের লক্ষ্য করে বাইরে থেকে ইট ও জলের বোতল ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে। পাল্টা হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্যরাও তাঁদের উপর হামলার অভিযোগ তুলেছেন।রবিবার অজয়নগর থেকে মিছিল করে এসআরএফটিআইয়ের সামনে পৌঁছন হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্যেরা। সংগঠনের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় স্বামী বিবেকানন্দ এবং ভারতমাতাকে অসম্মান করা হয়েছে। সেই অভিযোগের প্রতিবাদেই এই মিছিল বলে জানানো হয়। মিছিল এসআরএফটিআইয়ের সামনে পৌঁছনোর পর গেটের বাইরে বিক্ষোভ শুরু হয়। বন্ধ গেট ঠেলে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ, ক্যাম্পাসের ভিতরে থাকা পড়ুয়া ও শিক্ষকদের দিকে বাইরে থেকে ইট এবং জলের বোতল ছোড়া হয়। এক জন অধ্যাপক আহত হয়েছেন বলেও একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অন্য দিকে, মিছিলকারীদের কয়েক জনও আহত হয়েছেন বলে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের তরফে দাবি করা হয়েছে। দুই পক্ষের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে।এই ঘটনার পর সোমবার সকাল থেকেই এসআরএফটিআইয়ের সামনে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। মূল ফটকের বাইরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়, যাতে নতুন করে কোনও উত্তেজনা তৈরি না হয়। রবিবারের ঘটনায় মহাত্মা গান্ধীর ছবি ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছিল। তার পরের দিন সকালে পড়ুয়ারা ফের ক্যাম্পাসের গেটে গান্ধীর ছবি টাঙিয়ে দেন।এদিকে, রবিবার পুলিশের উপস্থিতিতে ক্যাম্পাসের দেওয়াল থেকে কিছু লেখা মুছে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। সোমবার সকালে পড়ুয়ারা ফের সেখানে দেওয়াল লিখন করেন। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা আরও জোরদার করার দাবি জানানো হয়েছে। পড়ুয়াদের একাংশ প্রতিষ্ঠানের উপাচার্যের কাছেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছেন।এসআরএফটিআইয়ে এই নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় বার উত্তেজনা তৈরি হল। এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের একটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পড়ুয়া এবং ওই সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনার পরেই ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। এক সপ্তাহ না কাটতেই ফের বাইরের একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়াল।ঘটনার পর এখন মূল নজর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং দুই পক্ষের ওঠানো অভিযোগের তদন্তের দিকে। একের পর এক রবিবারে এসআরএফটিআইয়ের মতো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং যাতে আর কোনও সংঘর্ষ না হয়, সেই জন্য নিরাপত্তা বজায় রাখা হয়েছে।

অক্টোবর ০৫, ২০২৬
রাজ্য

ভোটের কয়েক ঘণ্টা আগে নন্দীগ্রামে বড় বদল! আইসি সরিয়ে নতুন আধিকারিক, কেন এমন সিদ্ধান্ত?

রাত পোহালেই নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন। তার ঠিক আগের দিন, সোমবার নন্দীগ্রাম থানার আইসি বদল করল নির্বাচন কমিশন। এত দিন এই পদে ছিলেন অজয়কুমার মিশ্র। তাঁর জায়গায় নতুন আইসি হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দেবাশিস সরকারকে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, অবিলম্বে এই বদলি কার্যকর করতে হবে। ভোটের ঠিক আগে এই রদবদল ঘিরে নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।নির্বাচন কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে আইসি বদলের নির্দিষ্ট কোনও কারণ উল্লেখ করা হয়নি। দেবাশিস সরকার এর আগে পূর্ব মেদিনীপুরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ইনস্পেক্টর ইন-চার্জ হিসাবে দায়িত্বে ছিলেন। এখন তাঁকেই নন্দীগ্রাম থানার আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব দেওয়া হল। কমিশন তাঁর যোগদানের রিপোর্টও দ্রুত জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৬ অক্টোবর। ভোটগণনা হবে ৯ অক্টোবর। চলতি বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর, দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছিলেন। পরে নিয়ম অনুযায়ী তিনি একটি আসন ছেড়ে দেওয়ায় নন্দীগ্রাম আসনটি শূন্য হয়। সেই কারণেই এই উপনির্বাচন।নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক গুরুত্ব অবশ্য নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে তীব্র লড়াই হয়েছিল। সেই নির্বাচনে শুভেন্দু জয়ী হন। পরবর্তী সময়েও নন্দীগ্রাম রাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে থেকেছে। এবারের উপনির্বাচনেও তাই এই কেন্দ্রের দিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।এবারের উপনির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হাসিরানি রথ। কংগ্রেসের হয়ে লড়ছেন মিলন প্রধান। নন্দীগ্রামের নির্বাচনী লড়াই ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রচারে উত্তাপ ছিল যথেষ্ট। রবিবার সন্ধ্যায় প্রচারপর্ব শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার ভোটগ্রহণের আগে সোমবারই আইসি বদলের সিদ্ধান্ত সামনে এল।গত বিধানসভা নির্বাচনের আগেও অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করতে রাজ্যের একাধিক থানার ওসি ও আইসি বদল করেছিল নির্বাচন কমিশন। সেই সময় নন্দীগ্রাম-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশি স্তরে রদবদল করা হয়েছিল।তবে এবার ভোটের মাত্র এক দিন আগে নন্দীগ্রামের আইসি বদলের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হল, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি। কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতেও কারণ জানানো হয়নি। ফলে শেষ মুহূর্তের এই প্রশাসনিক রদবদল নিয়েই এখন জোর চর্চা। মঙ্গলবার নন্দীগ্রামের ভোটে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত আইসির অধীনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কী থাকে, সেদিকেই এখন নজর।

অক্টোবর ০৫, ২০২৬
বিদেশ

৯/১১-র ছকেই কি হামামির পরিকল্পনা? স্মিতকে সরিয়ে ইজরায়েলে বিমান আছড়ানোর ভয়ঙ্কর নকশা ফাঁস

দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাই বিমানে মাঝ আকাশে ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছরের উপর হামলার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারী সূত্র ও একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওমানের সহ-পাইলট হামাম আল-হামামি শুধু ককপিটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেনি, বরং বিমানটিকে ইজরায়েলে আছড়ে ফেলার পরিকল্পনাও করে থাকতে পারে। এমনকি তার পরিকল্পনার সঙ্গে ৯/১১-র ধাঁচের আত্মঘাতী বিমান হামলার মিল রয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।তদন্তকারীদের জেরায় হামামি কী জানিয়েছে, তা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমে ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরকে সরিয়ে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। এরপর বিমানটিকে স্বাভাবিক ভাবে তেল আভিভের দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে অবতরণের অনুমতি পাওয়ার পর শেষ মুহূর্তে বিমানটিকে বিমানবন্দরের কোনও ভবন বা অন্য একটি বিমানের সঙ্গে ধাক্কা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।ইতালির সংবাদপত্রের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও দাবি করা হয়েছে, ককপিটে প্রার্থনা করার অছিলায় হামামি কুঠার বের করে স্মিতকে আক্রমণ করে। প্রথম পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর বিমানটিকে মরুভূমিতে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করার পর বিমানটি দ্রুত নীচে নামতে শুরু করে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ করারও চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।ঘটনার ভয়াবহতা আরও বেড়ে যায় যখন বিমানটি মাত্র কয়েক দশ সেকেন্ডে হাজার হাজার ফুট নীচে নেমে আসে। এর আগে প্রকাশিত তদন্ত-তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাইদুবাইয়ের ওই বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার ফুট পর্যন্ত দ্রুত নেমে গিয়েছিল। গুরুতর আহত হয়েও স্মিত ককপিটের দরজা খোলার সুযোগ তৈরি করেন। এরপর যাত্রী ও বিমানে থাকা অন্য পাইলটদের হস্তক্ষেপে হামামিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুকে বিমানটির জরুরি অবতরণ করানো হয়।তদন্তে হামামি একাই এই পরিকল্পনা করেছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে তদন্তকারী সূত্রের দাবি, এখনও পর্যন্ত হামামির সঙ্গে কোনও সংগঠিত গোষ্ঠীর যোগসূত্রের প্রমাণ সামনে আসেনি এবং সে একাই কাজ করে থাকতে পারে। তবে তদন্ত এখনও চলছে এবং তার উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে বিভিন্ন দেশের তদন্তকারী সংস্থা খোঁজখবর করছে।এদিকে আরও একটি দাবি সামনে এসেছে। হামামি নাকি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগেই হামলার পরিকল্পনা করেছিল। জুলাই মাসেও তার একটি পরিকল্পনা ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কেন বাতিল হয়েছিল, তা নিয়েও তদন্ত চলছে। এমনকি তেল আভিভগামী উড়ানের জন্যই সে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দিয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।ঘটনার পর হামামির আগের উড়ান-জীবন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, উগ্রপন্থী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগের কারণে ওমানের একটি বিমান সংস্থা আগে তাকে উড়ানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। তবে এই সংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি এখনও তদন্তাধীন এবং হামামির অতীত সম্পর্কে সব তথ্যের সরকারি নিশ্চিতকরণ হয়নি।গত বুধবারের সেই ঘটনার সময় বিমানটি দুবাই থেকে তেল আভিভের দিকে যাচ্ছিল। ককপিটে হামলার পর বিমানটি দ্রুত নীচে নামতে শুরু করে। স্মিতের প্রতিরোধ, ককপিটের দরজা খোলা এবং যাত্রী ও অন্য পাইলটদের দ্রুত হস্তক্ষেপের জেরেই বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির তদন্তে ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে হামামির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, তার সঙ্গে অন্য কারও যোগাযোগ ছিল কি না এবং বিমানটি ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিলএই প্রশ্নগুলির তদন্ত এখনও চলছে।

অক্টোবর ০৫, ২০২৬

Ads

You May Like

Gallery

265-year-old "Mukhopadhyay House" in Bhavanandpur, Kalnar, played vermilion on Dasami during Durga Puja
BJP candidate Locket Chatterjee campaigned on the banks of the Ganges from Chandannagar Ranighat to Triveni Ghat wishing New Year.
A living depiction of history with a touch of color, everyone is enthralled by the initiative of the Eastern Railway
Sucharita Biswas actress and model on Durga Puja
Lord Kalabau came up in palanquin; Navapatrika walked towards the mandap - the puja started
On Sunday, the 'Hilsa festival' is celebrated in the city with great joy.
Check out who has joined Mamata's new cabinet
Take a look at the list of recipients at the Bangabibhushan award ceremony
If you are grassroots, you will get ration for free. Lakshmi Bhandar, Kanyashree, Swastha Sathi, Krishakbandhu, Oikyashree, Sabujsathi — you will get all.

Categories

  • কলকাতা
  • রাজ্য
  • দেশ
  • বিদেশ
  • রাজনীতি
  • খেলার দুনিয়া
  • বিনোদুনিয়া
  • সম্পাদকীয়
  • নিবন্ধ
  • ভ্রমণ
  • রাশিফল
  • টুকিটাকি
  • চিত্রহার
  • বিবিধ
  • ভিডিও

Company

  • About Us
  • Advertise
  • Privacy
  • Terms of Use
  • Contact Us
Copyright © 2026 Janatar Katha News Portal