'ধ্যনমগ্ন' অভিষেকের ঝড়ে আফগানিস্তান উড়ে গেল, ১২৭ রানে জয় ভারতের
সিরিজ় আগেই পকেটে চলে এসেছিল। তাই বৃহস্পতিবারের ম্যাচটি ছিল কার্যত নিয়মরক্ষার। কিন্তু মাঠে নামার পর ভারত বুঝিয়ে দিল, সিরিজ় জেতাই তাদের শেষ কথা নয়শেষ ম্যাচটিও নিজেদের দাপটে জিততে চায় তারা। আর সেই জয়ের মঞ্চ তৈরি করে দিলেন অভিষেক শর্মা। তাঁর বিধ্বংসী শতরানের পর ভারতীয় বোলারদের সম্মিলিত আক্রমণে মাত্র ৯৪ রানেই গুটিয়ে গেল আফগানিস্তান। তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে ১২৭ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজ়ে আফগানিস্তানকে চুনকাম করল ভারত।টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হিসেবে প্রথম সিরিজ়েই সাফল্যের মুখ দেখলেন শ্রেয়স আয়ার। প্রথমে ব্যাট করে ভারত ২০ ওভারে ২২১/৭ রান তোলে। জবাবে আফগানিস্তানের ইনিংস শেষ হয়ে যায় ৯৪ রানেই। ভারতের হয়ে নীতীশ রেড্ডি এবং রবি বিশ্নোই তিনটি করে উইকেট নেন। অক্ষর পটেল নেন দুটি, আর একটি করে উইকেট পান জসপ্রীত বুমরাহ ও যশ ঠাকুর।শুরু থেকেই ঝড় তুললেন অভিষেকভারতের ইনিংসের শুরুটা ছিল একেবারেই অন্য রকম। ওপেন করতে নেমে অভিষেক শর্মা প্রথম ওভারটি কিছুটা দেখে খেললেও তার পর থেকেই বদলে যায় ম্যাচের ছবি। ফজলহক ফারুকি-সহ আফগান বোলারদের উপর একের পর এক আক্রমণ শুরু করেন তিনি।দ্বিতীয় ওভারে আসে ১৭ রান, পরের ওভারে ২৩। আফগান অধিনায়ক ইব্রাহিম জ়াদরান দ্রুত স্পিন আক্রমণে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মহম্মদ নবির ওভারও বাঁচাতে পারেনি আফগানিস্তানকে। সেই ওভার থেকেই ভারত পেয়ে যায় ২৯ রান।পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার আগেই ভারতের স্কোর পৌঁছে যায় ১০০-তে। অভিষেক তখন কার্যত একাই আফগান বোলিংকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছেন। অন্য প্রান্তে সঞ্জু স্যামসনও তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। এমনকি ২২ রানের মাথায় সঞ্জুর ক্যাচ পড়ে যাওয়াও আফগানিস্তানের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।১৬ বলে অর্ধশতরান, ৩০ বলে শতরানঅভিষেকের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল তাঁর গতির ধারাবাহিকতা। মাত্র ১৬ বলেই অর্ধশতরান পূর্ণ করেন তিনি। এরপরও থামার কোনও লক্ষণ ছিল না। বরং সময় যত গড়িয়েছে, তাঁর ব্যাট থেকে বেরিয়েছে আরও বেশি বড় শট।মাত্র ৩০ বলে শতরান পূর্ণ করেন অভিষেক। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ভারতের হয়ে দ্রুততম শতরানের নজিরগুলির তালিকাতেও নিজের জায়গা আরও শক্ত করেন তিনি। শতরানের পর তাঁর উদযাপনও ছিল নজরকাড়া। ব্যাট তুলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার পর হঠাৎ মাঠে বসে ধ্যানের ভঙ্গিতে উদযাপন করতে দেখা যায় তাঁকে। ফুটবল তারকা আর্লিং হালান্ডের গোল উদযাপনের সঙ্গে সেই দৃশ্যের মিল খুঁজে পান অনেকেই।শেষ পর্যন্ত রশিদ খানের বলে অভিষেকের ইনিংস থামে। ৩৪ বলে ১০৮ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ৯টি চার এবং ১১টি ছক্কা। অর্থাৎ বাউন্ডারি থেকেই আসে ১০২ রান। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এটি অভিষেকের তৃতীয় শতরান।সঞ্জুর ব্যাটেও অর্ধশতরানঅভিষেকের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের মাঝে নিজের ইনিংসটি ধৈর্য ধরে এগিয়ে নিয়ে যান সঞ্জু স্যামসন। অভিষেক যখন একের পর এক ছক্কা মারছিলেন, তখন অন্য প্রান্ত থেকে তাঁকে সঙ্গ দেওয়াই ছিল সঞ্জুর প্রধান দায়িত্ব। শেষ পর্যন্ত তিনিও পৌঁছে যান অর্ধশতরানে।সঞ্জুর ৫০ রানের ইনিংস শেষ হয় অর্ধশতরান পূর্ণ করার পরেই। তিলক বর্মা মাত্র ২ রান করে ফেরেন। শিবম দুবে ১৪ রান করে আউট হন। ঈশান কিশনও বড় ইনিংস খেলতে পারেননিতাঁর সংগ্রহ ১০।মাঝের দিকে পর পর উইকেট পড়ায় ভারতের রান তোলার গতি কিছুটা কমে যায়। অধিনায়ক শ্রেয়স আয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী ইনিংস সামলানোর চেষ্টা করেন। তিনি করেন ২৯ রান। শেষ পাঁচ ওভারে ভারত মাত্র ৩৭ রান তুলতে পারায় ৩০০ রানের সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত হয়নি। তবুও ২২১ রানের লক্ষ্য আফগানিস্তানের সামনে যথেষ্ট বড় হয়ে দাঁড়ায়।তিন ওভারে ৩১, তারপরই ধসজবাবে আফগানিস্তানও শুরুটা করেছিল আক্রমণাত্মক মেজাজে। প্রথম তিন ওভারেই উঠে যায় ৩১ রান। মনে হচ্ছিল, ভারতের বড় রান তাড়া করতে গিয়ে অন্তত শুরুটা শক্তিশালী রাখতে চাইছে আফগান দল।কিন্তু এরপরই ভারতীয় বোলারদের সামনে দ্রুত পাল্টে যায় ম্যাচের চিত্র। রহমানুল্লাহ গুরবাজ় ১৫ এবং ইব্রাহিম জ়াদরান ২৫ রান করে ফিরে যাওয়ার পর আফগান ব্যাটিংয়ে আর কোনও প্রতিরোধ দেখা যায়নি।একটার পর একটা উইকেট পড়তে থাকে। ভারতের বোলিং আক্রমণের সামনে অভিজ্ঞ রশিদ খান, মহম্মদ নবিরাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ইনিংস গড়ে তুলতে পারেননি। মাত্র দুজন আফগান ব্যাটার দুই অঙ্কের বেশি রান করতে সক্ষম হন।বোলারদের দাপটে ৯৪ রানেই শেষআফগানিস্তানের রান তাড়া থেমে যায় ৯৪ রানেই। নীতীশ রেড্ডি এবং রবি বিশ্নোই তিনটি করে উইকেট নিয়ে আফগান ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। অক্ষর পটেল তুলে নেন দুটি উইকেট। বুমরাহ এবং যশ ঠাকুর পান একটি করে।ভারতের পক্ষে আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল বুমরাহকে খুব বেশি ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়নি। মাত্র দুই ওভার বল করেই নিজের কাজ সেরে নেন তিনি।তিন ম্যাচেই ভারতের একতরফা দাপটতিন ম্যাচের সিরিজ়ের কোনও ম্যাচেই ভারতকে সেভাবে চাপে ফেলতে পারেনি আফগানিস্তান। ব্যাটিং হোক বা বোলিংদুই বিভাগেই ভারত ধারাবাহিক ভাবে এগিয়ে থেকেছে।শেষ ম্যাচে সেই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। অভিষেক শর্মার বিস্ফোরক ব্যাটিং ভারতের জয়ের ভিত গড়ে দেয়, আর পরের কাজটি নিখুঁত ভাবে শেষ করেন বোলাররা। ফলে সিরিজ়ের শেষ ম্যাচেও আফগানিস্তানের সামনে দাঁড়ানোর মতো সুযোগ তৈরি হয়নি।শ্রেয়স আয়ারের নেতৃত্বে প্রথম টি-টোয়েন্টি সিরিজ়েই ভারতের এই সাফল্য যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনই আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেন অভিষেক শর্মা। ৩৪ বলে ১০৮ রানের সেই ইনিংস শুধু ম্যাচের মোড় ঘোরায়নি, সিরিজ়ের শেষ ম্যাচটিকেও পরিণত করেছে এক ক্রিকেটীয় প্রদর্শনীতে।

