মস্তিষ্ক বড় হওয়ার নেপথ্যে কি শুধু মাংস? ৪০ লক্ষ বছরের বিবর্তনে ‘গ্লুকোজ’-এর চমকপ্রদ ভূমিকা
মানুষের মস্তিষ্ক আজ যে জায়গায় পৌঁছেছে, তার গল্প শুধু বুদ্ধি, ভাষা কিংবা হাতিয়ার ব্যবহারের গল্প নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ জ্বালানির গল্পযেখানে প্রাণীজ প্রোটিনের পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল গ্লুকোজ।প্রায় ৪০ লক্ষ বছরের মানব-বিবর্তনের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের তুলনায় আধুনিক মানুষের মস্তিষ্কের আকার প্রায় তিন গুণ হয়েছে। আর শরীরের আকারের তুলনায় আধুনিক মানুষের মস্তিষ্ক প্রত্যাশিত আকারের চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি বড়। তবে কেন এই বিশাল পরিবর্তন? এর একক উত্তর এখনও বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় খরচ কোথায়?মস্তিষ্ক দেখতে শরীরের তুলনায় ছোট হলেও তার শক্তির চাহিদা বিপুল। মস্তিষ্কের কোষগুলির কাজ চালাতে অবিরাম শক্তি প্রয়োজন, আর সেই শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হল গ্লুকোজ।বিশেষ করে মানুষের শৈশবের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও চমকপ্রদ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রায় পাঁচ বছর বয়সে মস্তিষ্কের গ্লুকোজ ব্যবহারের হার প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ, শিশুর মস্তিষ্ক তখন শুধু আকারে বাড়ছে নাভেতরে ভেতরে বিপুল শক্তি খরচ করে তৈরি করছে স্নায়বিক সংযোগ, শেখার ক্ষমতা এবং জটিল চিন্তার ভিত্তি।অর্থাৎ, বড় মস্তিষ্কের জন্য শুধু কাঁচামাল নয়, দরকার ছিল নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ।তাহলে মাংসের ভূমিকা কোথায়?মানব-বিবর্তনের খাদ্যতালিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। প্রাণীজ খাবার থেকে পাওয়া উচ্চমানের প্রোটিন, ফ্যাট এবং বিশেষ কিছু দীর্ঘ-শৃঙ্খল ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।কিন্তু এখানেই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।প্রোটিন মস্তিষ্ক তৈরির উপকরণ হতে পারে, কিন্তু সেই মস্তিষ্ককে চালানোর জন্য প্রয়োজন শক্তি।আর সেই জায়গাতেই গ্লুকোজের গুরুত্ব সামনে আসে।চিনি বললেই কি মিষ্টি খাবার?এখানে একটি ভুল ধারণা এড়ানো জরুরি।গবেষণায় মস্তিষ্কের গ্লুকোজের প্রয়োজন বলতে মূলত রক্তে থাকা গ্লুকোজকে বোঝানো হয়। তার অর্থ এই নয় যে, মানব-মস্তিষ্কের বিবর্তনের জন্য চিনি, মিষ্টি বা পরিশোধিত চিনি খাওয়া প্রয়োজন ছিল।শরীর ভাত, ফল, শস্য, আলু-সহ বিভিন্ন কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার হজম করে গ্লুকোজ তৈরি করতে পারে। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী শরীর নিজেও গ্লুকোজ তৈরি করতে সক্ষম।তাই গ্লুকোজ প্রয়োজন এবং বেশি চিনি খাওয়া ভালোএই দুই বক্তব্য এক নয়।বিবর্তনের আরেক রহস্যশরীর না মস্তিষ্ক?মানুষের বিবর্তনে একটি বড় প্রশ্ন হল, কীভাবে এত শক্তি-খরচ করা মস্তিষ্ককে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল।একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল, মানব-বিবর্তনের কোনও এক পর্যায়ে খাদ্য থেকে পাওয়া শক্তির ব্যবহার আরও দক্ষ হয়ে উঠেছিল। রান্না করা খাবার নিয়ে গবেষণায় এমন যুক্তিও সামনে এসেছে যে, রান্না খাবার হজম ও শক্তি আহরণকে সহজ করে দিয়ে বড় মস্তিষ্কের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।অন্যদিকে, গবেষণায় মানুষের মস্তিষ্ক ও পেশির শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিবর্তনগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা পাওয়া গিয়েছে। কিছু গবেষক নির্দিষ্ট গ্লুকোজ পরিবাহী জিনের পরিবর্তনকে মানুষের বড় মস্তিষ্কের বিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।অর্থাৎ, প্রশ্নটা শুধু মানুষ কী খেত?এতটা সরল নয়।প্রশ্নটা বরংমানুষ কীভাবে খাবারের শক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করতে শিখল, যাতে শরীরের একটি অংশের বিপুল শক্তির চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়?মস্তিষ্ক যেন শরীরের এনার্জি হগমানুষের মস্তিষ্ককে অনেকটা এমন একটি যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যা আকারে ছোট হলেও সারাক্ষণ বিদ্যুৎ খরচ করছে।শিশুকালে এই চাহিদা আরও বেশি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শৈশবে মস্তিষ্কের গ্লুকোজ ব্যবহারের মাত্রা শরীরের বিশ্রামকালীন বিপাকীয় শক্তির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। একই সময়ে শরীরের সামগ্রিক বৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর হয়ে যায়।এ যেন শরীরের বিবর্তনীয় বাজেটে একটি অদ্ভুত সমীকরণ:বড় মস্তিষ্ক = বেশি শক্তিবেশি শক্তি = আরও দক্ষ খাদ্যব্যবস্থাআর সেই শক্তির কেন্দ্রে = গ্লুকোজ।তবে কি গ্লুকোজই মানুষকে মানুষ করেছে?এমন দাবি করার মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও নেই।মানুষের মস্তিষ্ক কেন এত বড় হলএই প্রশ্নের কোনও একক উত্তর বিজ্ঞান এখনও পায়নি। খাদ্য, রান্না, বিপাকীয় পরিবর্তন, পরিবেশ, সামাজিক জীবন, শিকার, সহযোগিতা, দীর্ঘ শৈশব এবং জিনগত বিবর্তনএকাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে বলে মনে করা হয়। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও মস্তিষ্কের বিবর্তনের কারণ নিয়ে একাধিক সম্ভাব্য ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা চলছে।তাই নতুন ছবিটা হয়তো এমনমাংস মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি দিয়েছে, কিন্তু সেই মস্তিষ্ককে সচল রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল শক্তি। আর সেই শক্তির জোগানে গ্লুকোজ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।৪০ লক্ষ বছরের বিবর্তনের গল্পে তাই চিনিকে নায়ক বলা হয়তো বাড়াবাড়ি হবে। তবে মস্তিষ্কের জ্বালানি হিসেবে গ্লুকোজ যে গল্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।আর সবচেয়ে বড় বিস্ময় সম্ভবত এখানেইমানুষের বুদ্ধির বিবর্তনের গল্প যতটা নিউরনের, ঠিক ততটাই শক্তিরও।

