রাজনীতি
জেল থেকে ফিরেই হুমকির অভিযোগ! আমোদপুরে তৃণমূল নেতাকে দড়ি বেঁধে ঘোরালেন স্থানীয়রা
বীরভূমের সাঁইথিয়া থানার আমোদপুরে এক তৃণমূল নেতাকে ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়াল। জামিনে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ফের বিভিন্ন জনকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে কোমরে দড়ি বেঁধে এলাকায় ঘোরানোর পর পুলিশের হাতে তুলে দিলেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। অভিযুক্তের নাম তাহিরুল শেখ। তিনি সাঁইথিয়া ব্লকের ভ্রমরকোল অঞ্চলের প্রাক্তন তৃণমূল সভাপতি। ঘটনার খবর পেয়ে আমোদপুর ফাঁড়ির পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে।ঘটনার সূত্রপাত সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের দিন। অভিযোগ, ওই দিন ভ্রমরকোল অঞ্চলের ৬৮ নম্বর বুথে বিজেপির নির্বাচিত বিধায়ক দেবাশিস ওঝার ছেলে, নির্বাচনী এজেন্ট বিশ্বজিৎ মণ্ডলসহ বিজেপির কয়েকজন নেতাকে মারধর করা হয়েছিল। এই ঘটনায় তৃণমূল নেতা তাহিরুল শেখের নাম জড়ায়। বিজেপির অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। প্রায় দু’মাস আগে জামিনে মুক্তি পান তিনি।বিজেপির অভিযোগ, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ফের দলের কর্মীদের হুমকি দিতে শুরু করেন তাহিরুল। রবিবার বেলার দিকে তিনি আমোদপুর লাগোয়া ঈশ্বরপুর গ্রামে প্রাক্তন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি প্রশান্ত সাধুর বাড়িতে যান। সেই খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ তাঁকে ধরে কোমরে দড়ি বেঁধে আমোদপুর বাজার এলাকায় ঘোরান। পরে তাঁকে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির হাতে তুলে দেওয়া হয়।বিজেপির ভ্রমরকোল মণ্ডল সভাপতি সুদীপ ঘোষের দাবি, ভোটের দিন তাহিরুলের নেতৃত্বে তাঁদের দলের নেতা-কর্মীদের মারধর করা হয়েছিল। তাঁদের প্রাণে মেরে ফেলারও চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর আরও দাবি, জামিনে মুক্তির পর ফের বিজেপি কর্মীদের হুমকি দিচ্ছিলেন ওই তৃণমূল নেতা। সেই খবর পেয়েই স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁরা তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। অন্যদিকে, তৃণমূলের সংখ্যালঘু সেলের প্রাক্তন ব্লক সভাপতি মহম্মদ ইউনুসের বক্তব্য, বিজেপি অনেক জায়গাতেই পুলিশের মদতে মিথ্যা অভিযোগ তুলে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের হেনস্থা করছে। তবে আমোদপুরের এই নির্দিষ্ট ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।বিজেপির বীরভূম সাংগঠনিক জেলার সভাপতি উদয় শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ভোটের দিন বিজেপি নেতাদের মাথা ফাটানোর অভিযোগের জেরেই তাহিরুল জনরোষের মুখে পড়েছেন। যদিও এই ঘটনার সঙ্গে বিজেপির কোনও যোগ নেই বলে দাবি করেছেন তিনি। একই সঙ্গে অভিযুক্ত নেতার কঠোর শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন। আমোদপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। তবে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এবং ঘটনার নেপথ্যের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর রয়েছে।
দিল্লিতে আন্দোলনে গিয়ে আটক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, গিয়েছিলেন ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থনে
দিল্লিতে আন্দোলন করতে গিয়ে আটক হলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন ডেরেক ওব্রায়েন, সামিরুল ইসলাম, দোলা সেন। সাউথ এভিনিউ থেকে তাদের আটক করে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। তাঁদের রাফ ড্রাইভিং করে দিল্লির রাস্তায় ঘোরানো হয় বলে মমতা তৃণমূলের নেতারা অভিযোগ করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আমরা এখানে এসেছি, কারণ সিজেপির ছাত্রছাত্রী ও যুবক-যুবতীরা আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই অনেক নেতাকে আটক করা হয়েছে। কাউকেই যন্তর মন্তরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, আমাদেরও নয়। তাই আমরা মনে করেছি, এখানে থেকেই ছাত্রছাত্রী, তরুণ প্রজন্ম, ইন্ডিয়া জোট, অন্যান্য সংগঠন এবং দেশের যে সমস্ত মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই ভালো।আমরা ঠিক করেছি, তাঁদের পাশে থাকার বার্তা দিতে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এখানেই ধর্নায় বসব। কারণ, আমরা যদি ওখানে যাওয়ার চেষ্টা করি, তা হলে আমাদের ঢুকতে দেওয়া হবে না। উল্টে আমাদেরও গাড়িতে করে দিল্লির এদিক-ওদিক ঘোরানো হতে পারে। বিজয়ন জ্বীর সঙ্গেও ঠিক এমনটাই করা হচ্ছে। আমরা খবর পেয়েছি, তাঁকে প্রায় দুঘণ্টা ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরানো হয়েছে। তাই রাস্তায় বসেই আমাদের প্রতিবাদ জানানো ভালো। তবে পরবর্তীতে মমতা তৃণমূল দাবি করেছে তাঁদেরও রাস্তায় অযথা ঘোরানো হয়েছে।ইন্ডিয়া জোটের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে আগামী ২ তারিখ আমাদের বৈঠক রয়েছে। সেই দায়িত্ব অভিষেকের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে মমতা জানিয়েছেন। কারণ, বাংলায় পুজোর উৎসবও রয়েছে। আজ মহালয়া, কাল থেকে অন্যান্য উৎসব শুরু হচ্ছে। আমাদের কাছে এটা খুব বড় উৎসব। তাই আমাকে সেখানে থাকতে হবে। বলছেন মমতা তৃণমূলের প্রধান। যদিও এবার কোনও পুজো মণ্ডপে যাব না বলে ঠিক করেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।
পূর্ব বর্ধমানে তৃণমূল নেতার বাড়ি থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা উদ্ধার, আরও সম্পদের সন্ধানে তদন্তে পুলিশ
সরকার বদলের পর থেকে নানা অভিযোগে একের পর এক হেভিওয়েট নেতা, মন্ত্রী গ্রেফতার হয়েছেন। এখনও তৃণমূল নেতাদের গ্রেফতারি অব্যাহত। এবার কাটোয়ায় গ্রেফতার হওয়া নেতার বাড়ি থেকে রাশি রাশি টাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ। জানা গিয়েছে, সম্পত্তির হদিশও মিলেছে। পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার দুই তৃণমূল নেতা সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায় ও সুদীপ্ত চক্রবর্তী কিভাবে বিপুল অর্থ ও সম্পদের মালিক হলেন, তা নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। এদের সঙ্গে জড়িত দোষীদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব।জানা গিয়েছে, সামন্য বেতনে বেসরকারী একটি মোবাইল সংস্থায় কর্মরত ছিলেন ওই দুই নেতা। পরবর্তীতে তৃণমূলে যোগ দিয়েই কাটোয়ার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর সর্বসময়ের সঙ্গী দীগন্ত পালের সঙ্গে বিশেষ সখ্য়তা স্থাপন করে ফেলেন। এরপর সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায় ও সুদীপ্ত চক্রবর্তীর ধনসম্পত্তি বাড়তে বিদ্যুৎ গতিতে। ইতিমধ্যে সরকার পরিবর্তন হতেই আর্থিক দুর্নীতির মামলায় রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ দীগন্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সূত্রের খবর, এরপরই গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেরাচ্ছিল সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায় ও সুদীপ্ত চক্রবর্তী। তবে শেষমেশ পুলিশের জালে ধরা পড়ে দুজনই। এখন তাঁদের বেআইনি ধনসম্পদ নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। সূত্রের খবর, ইতিমধ্যে সুপ্রিয়র বাড়ি থেকে ৯ লক্ষ টাকা নগদ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে তাঁরা সোনা রেখে লক্ষ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেই সোনা কোথা থেকে এসেছে তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এদের কাছে দামি চারচাকাও রয়েছে।
হুমায়ুন গ্রেফতার, অধীরের অবস্থান! রেজিনগর উপনির্বাচনে দিনভর তপ্ত রাজনীতি, "জিতবে বিজেপিই" - শুভেন্দু
রেজিনগর বিধানসভার উপনির্বাচন ঘিরে দিনভর উত্তপ্ত মুর্শিদাবাদ। শাসক দলের বিরুদ্ধে বুথ দখল, ভোট লুট এবং বিরোধী দলের এজেন্টদের বুথ থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে মমতা তৃণমূল কংগ্রেস এবং কংগ্রেস। অভিযোগের প্রতিবাদে বহরমপুরে জেলা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অধীর চৌধুরীর নেতৃত্বে অবস্থান বিক্ষোভও হয়। গ্রেফতার করা হয় আজপ নেতা তথা বিধায়ক হুমায়ুন কবিরকে। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ভোট বাতিলের দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস। তবে ভোটের দিন সকালেই সবচেয়ে বেশি চর্চায় আসে আমজনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান তথা নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের গ্রেপ্তারি। তাঁর ছেলে গোলাম নবি আজাদ রেজিনগর উপনির্বাচনে আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী। সকালে শক্তিপুরে নিজের বাড়ির কাছের বুথে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভোট দেন হুমায়ুন। বুথ থেকে বেরিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের হয়ে কাজ করার অভিযোগ তুলে কুকুর বলে কটাক্ষ করেন তিনি। পাশাপাশি বলেন, কুকুরকে কীভাবে মুগুর মেরে শায়েস্তা করতে হয়, তা তিনি ভালোভাবেই জানেন। প্রয়োজনে পাল্টা অ্যাটাকের কথাও বলেন তিনি।এরপর রেজিনগর পার্টি অফিসে যাওয়ার পথে সেখানে পৌঁছে যায় রেজিনগর থানার আইসি। হুমায়ুনকে পার্টি অফিস ছেড়ে চলে যেতে বলা হলে পুলিশের সঙ্গে তাঁর তীব্র বচসা শুরু হয়। পরে আইসির নেতৃত্বে পুলিশ তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানান, আইন লঙ্ঘনের অভিযোগেই হুমায়ুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভোটের দিন এভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ঘোরাফেরা করা যায় না, একথা একজন বিধায়কের জানা দরকার বলে জানান খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, নন্দীগ্রামে আমাদের ব্যবধান অনেকটা বাড়বে। গতবারের থেকে ৫থেকে ৬ গুন তো বাডডবেই। মার্জিন কম হলেও রেজিনগরে আমরা জিতবো। মুসলিম যুবক ও মহিলাদের বড় অংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে।অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর অভিযোগ, রেজিনগরে নিশ্চুপ সন্ত্রাস ও ভোট লুট চলছে। তাঁর দাবি, পুলিশ বিজেপির ক্যাডারের ভূমিকা পালন করছে এবং কংগ্রেস এজেন্টদের বুথে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। হুমায়ুনের গ্রেপ্তারি প্রসঙ্গে অধীর বলেন, তাঁকে দিয়ে নাটক করানো হচ্ছে এবং তিনি বিজেপির গেস্ট আর্টিস্ট।মমতা তৃণমূলের প্রার্থী রবিউল ইসলাম চৌধুরীর অভিযোগ, পুলিশ দাঁড়িয়ে থেকে বিরোধী এজেন্টদের বের করে দিয়ে বুথ দখল করেছে। সিপিএমের জেলা সম্পাদক জামির মোল্লার দাবি, ভোটের নামে প্রহসন হয়েছে। যদিও বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার ভোট শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেছেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত রেজিনগরে ৭৮ শতাংশ ভোট পড়েছে।
উপনির্বাচন শুরু নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে, গুরুতর অভিযোগ হুমায়ুন কবির ও মিলন প্রধানের
রাজ্যে শাসন ক্ষমতা পরিবর্তনের পর আজ হাইভোল্টেজ উপনির্বাচন। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে ভোট প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নন্দীগ্রামে মূলত লড়াই হবে কংগ্রেস বনাম বিজেপির। রেজিনগরে বিজেপি বনাম হুমায়ুন কবিরের দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টির। ভোটের ময়দানে নন্দীগ্রামে বিজেপি বিরোধীদের থেকে অনেকটা এগিয়ে, রেজিনগরে কি ফলাফল হয় সেদিকে নজর রাজনৈতিক মহলের।এদিকে সাতসকালেই হুমায়ুন কবির অভিযোগ করেছেন পুলিশের বিরুদ্ধে। তাঁর বক্তব্য, পুলিশ বিজেপির হয়ে দালালি করছে। ভোর পাঁচটা থেকে আমাদের এজেন্টদের বুথে ঢুকতে বাধা দিচ্ছে। এমন অরাজকতা চলছে যা ১৯৭৪ সালেও হয়নি। তাহলে ভোট দেওয়ার দরকার কি আছে। ভোটলুটের কথা ইলেকশন কমিশনকে বলব। মানুষ যদি ভোট দিতে পারে তাহলে এই উপনির্বাচনেও বিজেপি হারবে। আমরাও যুদ্ধ করব। বুথ ছাড়বো না। পুলিশের বিরুদ্ধে লড়াই হবে। রেজিনগরে বিরোধী দল যেমন অভিযোগ করেছে তেমনই নন্দীগ্রামে অভিযোগ করেছে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান। আমরা চাইছি মানুষ স্বাধীন ভাবে ভোট দিক। বিভিন্ন বুথ থেকে নানা খবর আসছে। আমরা সেক্টর অফিসকে জানিয়েছি। আইসিকে জানিয়েছি। কোনও কোনও জায়গায় বুথের এজেন্টকে বসতে দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন মিলন প্রধান। সেন্ট্রাল ফোর্সকে পরিচালনা করছে রাজ্যপুলিশ। এদিকে বিজেপি নেতা তথা মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলছেন, রেজিনগরেও পরিবর্তন হতে পারে। বাংলার মানুষ মনে করেছে পরিবর্তন করা জরুরি, রেজিনগরের মানুষও তাই মনে করছে। নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। বিরোধীরা এজেন্ট না পাওয়ায় মিথ্যা অভিযোগ করছে বলে বিজেপির দাবি। শাসকদলের দাবি, পরাজিত হওয়ার আশঙ্কায় অহেতুক বানানো অভিযোগ করছে বিরোধীরা।
বিনোদুনিয়া
খেলাধুলা
প্রাক্তন হকি অধিনায়কের বাড়িতে চুরি! নগদ-গয়নার সঙ্গে উধাও ১৯৮০ সালের অলিম্পিকের সোনার পদক
নগদ টাকা, সোনা-রুপোর গয়না তো ছিলই। এ বার চোরেদের হাত থেকে রেহাই পেল না অলিম্পিকের সোনার পদকও! প্রাক্তন ভারতীয় হকি অধিনায়ক এম এম সোমায়ার বাড়িতে চুরির ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিকে ভারতীয় দলের জেতা সোনার পদক-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার পদক চুরি গিয়েছে। পাশাপাশি নগদ টাকা এবং মূল্যবান গয়নাও নিয়ে গিয়েছে দুষ্কৃতীরা। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তবে এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনও ধরা পড়েনি অভিযুক্তেরা। উদ্ধার হয়নি চুরি যাওয়া সামগ্রীও।বেঙ্গালুরুর হ্যাল থার্ড স্টেজ এলাকায় থাকেন সোমায়া। এলাকাটি ইন্দিরানগর থানার অধীনে। গত ২৮ অক্টোবর রাতে এই চুরির ঘটনা ঘটে। সেই সময় পরিবারের সঙ্গে কোডাগুতে গিয়েছিলেন প্রাক্তন হকি তারকা। বাড়ি ফাঁকা থাকার সুযোগ নিয়ে চোরেরা সেখানে ঢুকে পড়ে। পরে প্রতিবেশীরা বাড়ির দরজা ভাঙা অবস্থায় দেখতে পান। তাঁরাই ফোন করে সোমায়াকে বিষয়টি জানান। এর পর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন তিনি।পুলিশ সূত্রে খবর, চুরি যাওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিকে পাওয়া সোনার পদক। এ ছাড়াও ১৯৮২ সালের এশিয়ান গেমসে পাওয়া রুপোর পদক এবং ১৯৮৬ সালের সিওল এশিয়ান গেমস ও ১৯৮২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ব্রোঞ্জ পদকও চুরি গিয়েছে। অর্থাৎ, সোমায়ার দীর্ঘ ক্রীড়াজীবনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক এখন চোরেদের হাতে।এ ছাড়া বাড়ি থেকে নগদ ৩০ হাজার টাকা, সোনা ও রুপোর গয়নাও নিয়ে গিয়েছে দুষ্কৃতীরা। সব মিলিয়ে চুরি যাওয়া সামগ্রীর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ লক্ষ ৫৩ হাজার টাকা।ঘটনার তদন্তে এলাকার বিভিন্ন বাড়ির নজরদারি ক্যামেরার ছবি খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সোমায়ার বাড়ির উল্টো দিকের একটি বাড়ির ক্যামেরায় দুজন সন্দেহভাজনের ছবি ধরা পড়েছে। ফুটেজে দেখা গিয়েছে, ২৮ অক্টোবর রাত ২টো ৩৪ মিনিট নাগাদ ওই দুজন সোমায়ার বাড়িতে ঢুকেছিল। একজনের পরনে ছিল নীল রঙের জামা, অন্য জনের লাল।অভিযুক্তদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেফতার এবং চুরি যাওয়া সমস্ত সামগ্রী উদ্ধারের আবেদন জানিয়েছেন সোমায়া। পুলিশ ইতিমধ্যেই তদন্তের জন্য দুটি বিশেষ দল তৈরি করেছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৩১(৪) এবং ৩০৫ ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে।ভারতীয় হকির ইতিহাসে পরিচিত নাম এম এম সোমায়া। দীর্ঘ দিন দলের হাফ ব্যাক হিসেবে খেলেছেন তিনি। তিনটি অলিম্পিকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ভারতীয় দলের অধিনায়কত্বও সামলেছেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৮৮ সালে নাইরোবিতে পুজো কাপ জেতে ভারত। ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানের জন্য ১৯৮৫ সালে তাঁকে অর্জুন পুরস্কার দেওয়া হয়।দেশের হয়ে অলিম্পিকে সোনা জেতা এক ক্রীড়াবিদের বাড়ি থেকে সেই পদকই চুরি যাওয়ার ঘটনায় উদ্বিগ্ন ক্রীড়ামহল। যে পদক এক সময় দেশের সাফল্যের স্মারক ছিল, সেটি এখন কোথায়, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
১৮ বছরের অপেক্ষা শেষ করতে মরিয়া ভারত! নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে নামছেন বুমরাহ-জাদেজা, পন্থকে নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
নিউজিল্যান্ডের মাটিতে শেষ বার টেস্ট সিরিজ জিতেছিল ভারত ২০০৮-০৯ মরসুমে। তার পর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ ১৮ বছর। এ বার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে মরিয়া ভারতীয় দল। আসন্ন টেস্ট সিরিজের জন্য প্রস্তুতিতে কোনও খামতি রাখতে চাইছে না ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। তাই চোটের ঝুঁকি থাকলেও দলের প্রথম সারির ক্রিকেটারদের প্রস্তুতি ম্যাচে নামানো হচ্ছে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইয়েও এই সিরিজ ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ইতিমধ্যেই নিউজিল্যান্ড এ দলের বিরুদ্ধে দুটি চার দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছেন ভারতীয় টেস্ট দলের কয়েক জন নিয়মিত ক্রিকেটার। এ বার সেই প্রস্তুতি ম্যাচের তৃতীয়টিতে খেলতে নামবেন জসপ্রীত বুমরাহ ও রবীন্দ্র জাডেজা। শনিবার থেকে শুরু হতে চলা এই ম্যাচের জন্য ভারত এ দলে যোগ দিয়েছেন দুজনেই। তাঁদের সঙ্গে দলে রয়েছেন প্রসিদ্ধ কৃষ্ণও।দীর্ঘ দিন মাঠের বাইরে থাকার পর ম্যাচের ছন্দ ফিরে পেতেই বুমরাহ ও জাডেজাকে এই ম্যাচে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে খবর। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আসন্ন টেস্ট সিরিজের আগে দুজনের ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা থাকা জরুরি বলে মনে করছে ভারতীয় শিবির। অন্য দিকে, চোটের কারণে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক দিনের সিরিজে খেলতে পারবেন না প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ। তাই তিনিও এই প্রস্তুতি ম্যাচে নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।তবে ভারতীয় শিবিরে স্বস্তির পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। তৃতীয় প্রস্তুতি ম্যাচেও খেলতে পারছেন না ঋষভ পন্থ। এখনও পুরোপুরি চোটমুক্ত হতে পারেননি ভারতীয় দলের এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। বর্তমানে তিনি রয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সেন্টার অফ এক্সেলেন্সে। তাঁর পরিবর্তে ভারত এ দলে জায়গা পেয়েছেন তিলক বর্মা।শেষ বার অগস্ট মাসে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টেস্ট খেলেছিলেন পন্থ। সেই ম্যাচেই তাঁর পাঁজরের পাশের পেশিতে চোট লাগে। নিউজিল্যান্ড এ দলের বিরুদ্ধে তিনটি প্রস্তুতি ম্যাচেই পন্থের খেলার কথা ছিল। কিন্তু চোটের কারণে প্রথম দুটি ম্যাচে খেলতে পারেননি তিনি। তৃতীয় ম্যাচ থেকেও ছিটকে গেলেন।এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আগামী ১৯ নভেম্বর থেকে শুরু হতে চলা প্রথম টেস্টের আগে পন্থ পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারবেন কি না। তাঁকে নিয়ে চিন্তায় রয়েছে ভারতীয় শিবির। শুধু চোট সারলেই হবে না, নিউজিল্যান্ডের পরিবেশ ও পিচের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্যও কিছুটা সময় প্রয়োজন। প্রথম টেস্টের আগে কতটা ম্যাচ অনুশীলন করতে পারবেন পন্থ, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।নিউজিল্যান্ডের মাটিতে দীর্ঘ ১৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে চাইছে ভারত। সেই লক্ষ্যেই বুমরাহ, জাডেজাদের প্রস্তুতি ম্যাচে নামানো হচ্ছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের আগে পন্থের চোট কতটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, এখন সেটাই দেখার।
মহারাষ্ট্রের কাছে হার, তার পরেই টি-টোয়েন্টির দল ঘোষণা! বাংলার স্কোয়াডে একাধিক চমক, রয়েছেন শামিও
রঞ্জি ট্রফিতে শুরুটা দুর্দান্ত করেছিল বাংলা। পর পর তিনটি ম্যাচ জিতে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছিল দল। কিন্তু চতুর্থ ম্যাচে ঘরের মাঠে মহারাষ্ট্রের কাছে হেরে সেই জায়গা হারাতে হয়েছে অভিমন্যু ঈশ্বরণের দলকে। আপাতত আড়াই মাসের বিরতি রঞ্জি ট্রফিতে। তার আগেই এ বার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে মন দিতে চলেছে বাংলা। আগামী ১৪ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে বাংলার অভিযান। বৃহস্পতিবার মহারাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রঞ্জি ম্যাচ শেষ হওয়ার পরেই এই প্রতিযোগিতার জন্য ২০ সদস্যের দল ঘোষণা করল ক্রিকেট সংস্থা।বাংলার অধিনায়ক করা হয়েছে অভিমন্যু ঈশ্বরণকে। দলে রয়েছেন সুদীপ ঘরামি, অভিষেক পোড়েল, শাকির হাবিব গান্ধী, যুবরাজ কেসওয়ানি, আদিত্য পুরোহিত, করণ লাল, সৌরভ হালদার, প্রদীপ্ত প্রামাণিক, প্রয়াস রায় বর্মন, মহম্মদ শামি, মুকেশ কুমার, শাহবাজ আহমেদ, কনিষ্ক শেঠ, সায়ন ঘোষ, সৈয়দ আফতাব ইরফান, শশাঙ্ক সিং, অখিলেশ যাদব এবং ঋষভ চৌধুরি। অভিষেক পোড়েল ও শাকির হাবিব গান্ধী দলের দুই উইকেটরক্ষক।তবে প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই সব ক্রিকেটারকে পাওয়া যাবে না। শাহবাজ আহমেদ ভারতীয় এ দলের হয়ে রাইজ়িং স্টার্স এশিয়া কাপে খেলবেন। ফলে গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলিতে তাঁকে পাবে না বাংলা। তবে দল পরের পর্বে উঠলে তাঁকে পাওয়া যেতে পারে। সেই কথা মাথায় রেখেই দলে রাখা হয়েছে এই অলরাউন্ডারকে। শাহবাজের অনুপস্থিতিতে দলের ভারসাম্য কিছুটা নষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন দলের একাংশ।অন্য দিকে, মুকেশ কুমারও আপাতত ভারতীয় এ দলের হয়ে নিউজ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলছেন। সেখান থেকে ফিরে তিনি বাংলার দলের সঙ্গে যোগ দেবেন। ফলে প্রতিযোগিতার শুরুতে তাঁকেও পাওয়া নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।আগামী ১৪ নভেম্বর কর্নাটকের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে মুস্তাক আলি ট্রফিতে অভিযান শুরু করবে বাংলা। এ বারের প্রতিযোগিতায় গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলি মুম্বইয়ে খেলবে তারা। কর্নাটক ছাড়াও বাংলার গ্রুপে রয়েছে চণ্ডীগড়, ঝাড়খণ্ড, মিজোরাম, বরোদা, উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থান। ফলে পরের পর্বে ওঠার লড়াই যে সহজ হবে না, তা ভালই জানে বাংলা শিবির।সেই কারণেই শুক্রবার থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে চলেছে দল। বাংলার কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্লা জানিয়েছেন, যাঁরা সদ্য রঞ্জি ট্রফির ম্যাচ খেলেছেন, তাঁদের শুক্রবারের অনুশীলনে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বাকি ক্রিকেটারদের নিয়ে সল্টলেকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে অনুশীলন শুরু হবে। সেখানে তিন দিন প্রস্তুতির পর দুদিন ইডেনে অনুশীলন করবে দল।ইডেনের অনুশীলনে উপস্থিত থাকতে পারেন ক্রিকেট সংস্থার সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও। এর আগেও বাংলার ক্রিকেটারদের অনুশীলনে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।আগামী ১১ নভেম্বর মুম্বইয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন অভিমন্যুরা। তবে দলের সঙ্গে একই সময়ে যাচ্ছেন না মহম্মদ শামি। বৃহস্পতিবারই কলকাতা ছেড়েছেন বাংলার তারকা পেসার। তিনি সরাসরি মুম্বইয়ে গিয়ে দলের সঙ্গে যোগ দেবেন। রঞ্জিতে মহারাষ্ট্রের কাছে হারের পর এ বার টি-টোয়েন্টিতে কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে বাংলা, সেটাই দেখার।
বিশ্বকাপ জিততে গিলের বিয়ের ব্যবস্থা করবেন রোহিত! হাতে মাত্র দু’মাস, কেন এমন তাড়া হিটম্যানের?
লক্ষ্য ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে যা যা করা দরকার, সবই করতে রাজি রোহিত শর্মা। এমনকি শুভমান গিলের বিয়ের ব্যবস্থাও করে দিতে চান তিনি! তাও আবার আগামী দেড় থেকে দুমাসের মধ্যে। হঠাৎ গিলের বিয়ে নিয়ে এত আগ্রহ কেন রোহিতের? এর সঙ্গে বিশ্বকাপ জয়ের সম্পর্কই বা কী?এই মুহূর্তে ভারতীয় ওয়ানডে দলের অধিনায়ক শুভমান গিল। রোহিত শর্মাকে অধিনায়কের পদ থেকে সরিয়ে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গিলের প্রেমজীবন এবং বিয়ে নিয়ে অবশ্য বহু দিন ধরেই নানা জল্পনা চলছে। সম্প্রতি রোহিতের অনুষ্ঠান ফ্যামিলি ফুল হাউস-এও উঠে আসে সেই প্রসঙ্গ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কমেডিয়ান আকাশ গুপ্তা এবং শাদি ডট কমের প্রতিষ্ঠাতা অনুপম মিত্তাল।কথা বলতে বলতেই আকাশ একটি মজার তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, ইতিহাস বলছে, ভারতের কোনও অধিনায়কের বিয়ে হলে তার পরের বছরই বিশ্বকাপ জিতেছে ভারত। উদাহরণ হিসেবে তিনি মনে করিয়ে দেন মহেন্দ্র সিংহ ধোনির বিয়ের কথা। ২০১০ সালে বিয়ে করেছিলেন ধোনি। তার পরের বছর, ২০১১ সালে, ভারত জিতেছিল এক দিনের বিশ্বকাপ।আকাশের কথা শুনে অনুপম মিত্তাল মজা করে বলেন, সেই জন্যই তো আমরা শুভমানের পিছনে পড়ে আছি। তবে তাঁর দাবি, গিল আপাতত বিয়ে করতে চান না। এই কথা শুনে রোহিতও মজার ছলে বলেন, না ভাই, বিশ্বকাপ জেতার জন্য আমাকে যা যা করতে হবে, সব করব।রোহিতের এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, বিশ্বকাপ জয়ের জন্য গিলের বিয়ের ব্যবস্থা করতেও আপত্তি নেই তাঁর! অবশ্য পুরো কথোপকথনই ছিল মজার ছলে। সত্যিই যে রোহিত গিলের বিয়ের আয়োজন করতে চলেছেন, এমন কোনও খবর নেই।গিলের প্রেমজীবন নিয়েও অতীতে কম আলোচনা হয়নি। এক সময় সচিন তেণ্ডুলকরের মেয়ে সারার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের জল্পনা ছড়িয়েছিল। পরে সইফ আলি খানের মেয়ে সারার সঙ্গেও তাঁর নাম জড়ায়। তবে এই সব জল্পনার কোনওটিই গিল নিজে নিশ্চিত করেননি।এখনই বিয়ে করার কোনও পরিকল্পনা আছে কি না, তা নিয়েও প্রকাশ্যে কিছু জানাননি ভারতীয় অধিনায়ক। তাই রোহিত সত্যিই গিলের বিয়ের ঘটকালি করবেন কি না, তা নিয়ে আপাতত কৌতূহল থাকছেই। তবে বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে হিটম্যান যে মজার ছলে কোনও কিছুতেই পিছপা নন, তা তাঁর মন্তব্যেই পরিষ্কার।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের টিকিটের জন্য হুড়োহুড়ি! আবেদন করলেন ৮৪ লক্ষ, মাঠে ঢুকতে পারবেন মাত্র ৩৪ হাজার
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেই মুখোমুখি ভারত ও পাকিস্তান। আগামী বছরের ১০ অক্টোবর জোহানেসবার্গে মুখোমুখি হবে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। এই ম্যাচ ঘিরে ক্রিকেটপ্রেমীদের উন্মাদনা যে কতটা, তা স্পষ্ট টিকিটের আবেদনের পরিসংখ্যানে। মাঠে বসে খেলা দেখার সুযোগ পাবেন মাত্র ৩৪ হাজার দর্শক। অথচ ইতিমধ্যেই টিকিটের জন্য আবেদন করেছেন অন্তত ৮৪ লক্ষ মানুষ! অর্থাৎ মাঠের আসনসংখ্যার প্রায় ২৪৭ গুণ আবেদন জমা পড়েছে।মাসখানেক আগে ২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা। ৭ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ভারত। তার ঠিক তিন দিন পর, ১০ অক্টোবর পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে তারা। জোহানেসবার্গে আয়োজিত হবে এই বহু প্রতীক্ষিত ম্যাচ। টিকিটের চাহিদার নিরিখে ইতিমধ্যেই বাকি ম্যাচগুলিকে ছাপিয়ে গিয়েছে ভারত-পাকিস্তান লড়াই।এই বিশ্বকাপের ফাইনালও হবে জোহানেসবার্গের একই মাঠে। ২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালেও এই মাঠে মুখোমুখি হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান। মহেন্দ্র সিংহ ধোনির নেতৃত্বে সেবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ভারত। জানা গিয়েছে, ২০২৭ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিটের জন্যও আবেদন করেছেন অন্তত ৭৯ লক্ষ মানুষ। তবে সেই সংখ্যাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের চাহিদা।ভারতের অন্য ম্যাচগুলির টিকিট নিয়েও আগ্রহ কম নয়। গ্রুপ পর্বে ভারতের প্রথম তিনটি ম্যাচের টিকিটের জন্যও বিপুল আবেদন জমা পড়েছে। গ্রুপ পর্বের পাশাপাশি সুপার সেভেন পর্বের ম্যাচগুলির টিকিটের জন্যও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। সম্ভাব্য দলগুলির বিন্যাস আগেই জানিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা। ফলে কোন ম্যাচে কোন দল মুখোমুখি হতে পারে, তা আন্দাজ করে আগেভাগেই পরিকল্পনা করছেন সমর্থকেরা।ভারত ও পাকিস্তান দুদলই সুপার সেভেন পর্বে উঠলে ৭ নভেম্বর ফের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই ম্যাচের টিকিটের জন্যও আবেদন শুরু করেছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। আগামী ২১ নভেম্বর পর্যন্ত টিকিটের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। ফলে আবেদনকারীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য
মন্ত্রীর আচমকা পরিদর্শনের পরই তৎপরতা, বর্ধমানের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ বন্ধের নির্দেশ
নিজস্ব সংবাদদাতা, বর্ধমান: কলেজের নিজস্ব ভবন রয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল? তার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছিল ভাড়ার প্রতিষ্ঠানের উপর। সেই হাসপাতালও শেষ পর্যন্ত জানিয়ে দিল, চুক্তি আর নেই। আর তার পরেই বর্ধমানের তালিতে চলা ওই বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ বন্ধের নির্দেশ দিল রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর। ঘটনাকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে এতদিন ভাড়ার হাসপাতালকে দেখিয়ে মেডিক্যাল কলেজের কার্যক্রম চলছিল?গত মাসে পূর্ব বর্ধমান জেলা সফরে এসে আচমকাই তালির ওই মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছে গিয়েছিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। শুধু কলেজ পরিদর্শনেই থামেননি তিনি। যে বেসরকারি হাসপাতালকে দেখিয়ে মেডিক্যাল কলেজটি পরিচালিত হচ্ছিল, বর্ধমান শহরের উল্লাস এলাকার সেই হাসপাতালেও পৌঁছে যান মন্ত্রী।সেখানেই সামনে আসে বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ দিকটি।স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মেডিক্যাল কলেজটির নিজস্ব ভবন থাকলেও হাসপাতালটি ছিল ভাড়ায়। অর্থাৎ, চিকিৎসা পরিষেবা ও শিক্ষার প্রয়োজনীয় হাসপাতাল পরিকাঠামোর জন্য অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালের উপর নির্ভর করছিল প্রতিষ্ঠানটি।পরে ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য দপ্তরকে ই-মেল করে জানায়, মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে তাদের চুক্তি বাতিল হয়ে গিয়েছে। ফলে মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে হাসপাতালটির আর কোনও সম্পর্ক নেই। এই পরিস্থিতিতেই ওই মেডিক্যাল কলেজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।সোমবার পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরে একটি কর্মসূচিতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ওই বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের নিজস্ব কলেজ ভবন থাকলেও হাসপাতাল ছিল ভাড়ায়। আমি নিজেই তা খতিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেইল করে জানিয়েছিল, আমাদের চুক্তি বাতিল হয়ে গিয়েছে। তাই ওই মেডিক্যাল কলেজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।মন্ত্রীর আচমকা পরিদর্শনেই কি বদলে গেল পরিস্থিতি?গত মাসে চার দিনের জেলা সফরে পূর্ব বর্ধমানে এসেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সেই সফরেই তালিতের মেডিক্যাল কলেজে তাঁর আচমকা উপস্থিতি ঘিরে তৎপরতা শুরু হয়। কলেজ পরিদর্শনের পর সংশ্লিষ্ট হাসপাতালেও যান তিনি।সূত্রের খবর, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় মেডিক্যাল কলেজটির বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের প্রসঙ্গ তোলেন মন্ত্রী। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন ওই হাসপাতাল মেডিক্যাল কলেজটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন করেন তিনি।ওই হাসপাতালের কর্ণধার চিকিৎসক দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আবার ওই মেডিক্যাল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল পদেও ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। মন্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথনের পর তিনি মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পদ থেকে সরে দাঁড়ান বলে সূত্রের খবর। স্বাস্থ্য দপ্তরকেও জানিয়ে দেওয়া হয়, ওই মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে হাসপাতালের আর কোনও সম্পর্ক নেই।মালিকের মৃত্যুর পর উঠেছিল একাধিক অভিযোগমেডিক্যাল কলেজটি ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। প্রতিষ্ঠাতা মালিকের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী স্বাস্থ্য দপ্তরে অভিযোগ করেন, স্বামীর সই নকল করে প্রতিষ্ঠানে কিছু অনৈতিক কাজ করা হচ্ছে। শুধু স্বাস্থ্য দপ্তরেই নয়, মেডিক্যাল কাউন্সিলেও প্রমাণ-সহ অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।এই সমস্ত অভিযোগের মধ্যেই হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। ফলে হাসপাতাল পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশে বন্ধ হতে চলেছে বর্ধমানের তালিতের ওই বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ। ভাড়ার হাসপাতালের উপর নির্ভর করে মেডিক্যাল কলেজ পরিচালনা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরে দাঁড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগসব মিলিয়ে গোটা ঘটনায় স্বাস্থ্য দপ্তরের পদক্ষেপ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
বর্ধমানে বি আই এম এল এস ফিজিওথেরাপি কলেজে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস পালন
২৫ বছর পূর্তিতে দিনভর নানা কর্মসূচি, ফ্রি কনসালটেশন ক্যাম্প ও বৈজ্ঞানিক সেমিনার; কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ ও স্ট্রোক নিয়ে বিশেষ আলোচনার মাধ্যমে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস পালন।ফিজিওথেরাপির প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে বর্ধমান শহরের বি আই এম এল এস ফিজিওথেরাপি কলেজে পালিত হল বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। মঙ্গলবার কলেজ প্রাঙ্গণে দিনভর নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ছিল বিশেষজ্ঞদের আলোচনা, বৈজ্ঞানিক সেশন, লাইভ ডেমোনস্ট্রেশন এবং রোগীদের জন্য বিনামূল্যে কনসালটেশন ক্যাম্প।অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন বর্ধমান শহরের বিশিষ্ট অর্থোপেডিক সার্জেন ড. শাশ্বত দত্ত। উপস্থিত ছিলেন বর্ধমান মেডিকেল কলেজের উইংস অনাময় হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র রেসিডেন্ট ড. শিলাদিত্য দাস। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বি আই এম এল এস কলেজের এথিকাল কমিটির চেয়ারম্যান ও বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ড. অভিষেক মিশ্র এবং বেঙ্গল ফেত হাসপাতালের বিশিষ্ট ফিজিওথেরাপিস্ট ড. অরোদীপ দাশগুপ্ত -সহ অন্যান্যরা।অনুষ্ঠানে বক্তারা দৈনন্দিন জীবনে ফিজিওথেরাপির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে আসে, ফিজিওথেরাপি শুধু চোট বা অস্ত্রোপচারের পর পুনর্বাসনের জন্য নয়; দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অস্থিসন্ধির সমস্যা, পেশির দুর্বলতা, স্নায়বিক সমস্যা, চলাফেরার অসুবিধা এবং বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।এছাড়াও এদিন উপস্থিত ছিলেন বি আই এম এল এস ফিজিওথেরাপি কলেজের প্রিন্সিপ্যাল ড. এম এস আনোয়ার, সহকারি অধ্যাপক ড. সত্যেন ভট্টাচার্য্য, সহকারি অধ্যাপক ড. অমর্ত্য মল্লিক, সহকারি অধ্যাপক ড.তনিমা ভট্টাচার্য্য, সহকারি অধ্যাপক ড. প্রিয়াঙ্কা দাস ও সহকারি অধ্যাপক ড. রজনী মিশ্র দাসগুপ্ত।২৫ বছর পূর্তিতে রোগী পরিষেবায় বিশেষ উদ্যোগবি আই এম এল এস ফিজিওথেরাপি কলেজের অধ্যক্ষ ড. এম এস আনোয়ার জানান, বি আই এম এল এস ফিজিওথেরাপি কলেজের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের ওপিডি পরিষেবার মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপি পরিষেবা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। এছাড়াও বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস উপলক্ষে ওপিডিতে আয়োজন করা হয় ফ্রি কনসালটেশন ক্যাম্প। তিনি জানান দিনভর এই ক্যাম্পে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিয়ে আসা রোগীদের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি আয়োজিত হয় বিশেষ বৈজ্ঞানিক সেমিনার।কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ ও স্ট্রোক নিয়ে বিশেষ সেশনবি আই এম এল এস ফিজিওথেরাপি কলেজের বিশিষ্ট ফিজিওথেরাপি ডাক্তার ড. সত্যেন ভট্টাচার্য্য জানান, এবারে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবসে বিশেষ থিম ছিল কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ ও স্ট্রোক। এদিনের বৈজ্ঞানিক সেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ এবং স্ট্রোক। স্ট্রোকের পর রোগীর স্বাভাবিক চলাফেরা, পেশিশক্তি, ভারসাম্য এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। তিনি জানান, সেমিনারের পাশাপাশি বিভিন্ন থেরাপিউটিক পদ্ধতি নিয়ে লাইভ ডেমোনস্ট্রেশনও দেখানো হয়।রোগীদের সাফল্যের গল্পে উঠে এল ফিজিওথেরাপির গুরুত্বসহকারি অধ্যাপক ড. অমর্ত্য মল্লিক জনতার কথাকে জানান, আজকের বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবসের অনুষ্ঠানের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে উপকৃত হওয়া রোগীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা। বিশেষ করে ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন ধরনের ডিফর্মিটি বা ডিসঅ্যাবিলিটি নিয়ে বেড়ে ওঠা কয়েকজন রোগী কীভাবে চিকিৎসা ও নিয়মিত ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে এসেছেন, সেই অভিজ্ঞতা তাঁরা তুলে ধরেন।তাঁদের এই অভিজ্ঞতা উপস্থিতদের কাছে শুধু অনুপ্রেরণার নয়, বরং পুনর্বাসনমূলক চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপির গুরুত্বের একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবেও উঠে আসে।কলেজের অধ্যক্ষ ড. এম এস আনোয়ার বলেন মানুষ কে জানতে হবে ফিজিওথেরাপি কেন গুরুত্বপূর্ণ?ফিজিওথেরাপির অন্যতম লক্ষ্য হল শরীরের নড়াচড়া ও কার্যক্ষমতা উন্নত করা, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা এবং রোগীকে যতটা সম্ভব স্বনির্ভর করে তোলা।স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসন, অস্ত্রোপচারের পর দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরা, কোমর-ঘাড়-কাঁধ বা হাঁটুর ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, স্পোর্টস ইনজুরি, শিশুদের শারীরিক বিকাশজনিত সমস্যা এবং বয়স্কদের চলাফেরার সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা ও রোগের ধরন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপির পদ্ধতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন এবং প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী থেরাপি নেওয়া উচিত।বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস উপলক্ষে বি আই এম এল এস ফিজিওথেরাপি কলেজের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে উঠে এল একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাফিজিওথেরাপি শুধু ব্যথা কমানোর পদ্ধতি নয়, বরং একজন মানুষকে সুস্থ, সচল ও স্বনির্ভর জীবনে ফিরিয়ে আনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভ্রমণ
সিকিমের অফবিট সৌন্দর্যে মুগ্ধ করবে জুলুক থেকে জোংগু, ঘুরে এলে মন চাইবে বারবার
ব্যস্ত শহরের কোলাহল, কর্মব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি আর প্রতিদিনের দৌড়ঝাঁপ থেকে কিছুদিনের জন্য মুক্তি পেতে আমরা কয়েকজন বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম ভারতের উত্তর-পূর্বের ছোট্ট অথচ অপরূপ সুন্দর রাজ্য সিকিমের উদ্দেশ্যে। পাহাড়, মেঘ, ঝরনা আর সবুজ প্রকৃতির টানে বহুদিন ধরেই সিকিম আমাদের স্বপ্নের গন্তব্য ছিল।শিলিগুড়ি থেকে গাড়িতে চড়ে যখন সিকিমের পথে যাত্রা শুরু করলাম, তখনই বুঝতে পারলাম এক অন্য জগতে প্রবেশ করতে চলেছি। তিস্তা নদী আমাদের পথসঙ্গী হয়ে বয়ে চলছিল। পাহাড়ের গা বেয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা, দূরে মেঘে ঢাকা পাহাড়ের সারি আর নদীর কলকল শব্দ যেন মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিল।গ্যাংটক পৌঁছে আমরা প্রথমেই শহরের পরিচ্ছন্নতা এবং শৃঙ্খলা দেখে মুগ্ধ হলাম। তবে আমাদের আসল লক্ষ্য ছিল সিকিমের কিছু অফবিট বা কম পরিচিত স্থান ঘুরে দেখা। তাই পরদিন সকালে আমরা রওনা দিলাম জুলুকের উদ্দেশ্যে। পূর্ব সিকিমের এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটি পর্যটকদের কাছে এখনও তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত। পথে বিখ্যাত জিগজ্যাগ রোডের ৩২টি বাঁক দেখে আমরা অভিভূত হয়ে গেলাম। পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচের রাস্তা দেখতে যেন বিশাল কোনো শিল্পকর্মের মতো লাগছিল।জুলুকের ঠান্ডা আবহাওয়া আর নিস্তব্ধ পরিবেশ আমাদের মন জয় করে নিল। রাতের আকাশে অসংখ্য তারার মেলা দেখে মনে হচ্ছিল যেন স্বর্গের খুব কাছাকাছি এসে গেছি। শহরের কৃত্রিম আলো থেকে দূরে এই অভিজ্ঞতা সত্যিই ছিল অসাধারণ।পরের দিন আমরা গেলাম থাম্বি ভিউ পয়েন্টে। ভোরবেলায় সূর্যের প্রথম আলো যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফঢাকা শৃঙ্গে পড়ল, তখন সেই দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। সোনালি আলোয় ঝলমল করা পর্বতশ্রেণি আমাদের চোখে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে রইল।এরপর আমরা উত্তর সিকিমের এক সুন্দর অফবিট গ্রাম জোংগুতে পৌঁছালাম। এটি লেপচা সম্প্রদায়ের সংরক্ষিত এলাকা। এখানকার মানুষজন অত্যন্ত আন্তরিক এবং অতিথিপরায়ণ। তাদের সংস্কৃতি, জীবনযাপন এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আমাদের গভীরভাবে মুগ্ধ করল। ছোট ছোট কাঠের বাড়ি, পাহাড়ি ঝরনা এবং সবুজ বনভূমির মধ্যে কয়েকটি দিন কাটিয়ে মনে হলো প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অপূর্ব সহাবস্থান প্রত্যক্ষ করছি।জোংগু থেকে ফেরার পথে আমরা কয়েকটি অজানা ঝরনা এবং ছোট পাহাড়ি গ্রামে থামলাম। প্রতিটি স্থান যেন প্রকৃতির নিজস্ব হাতে সাজানো একেকটি চিত্রপট। কোথাও পাখির ডাক, কোথাও ঝরনার শব্দ, আবার কোথাও শুধুই নীরবতাসব মিলিয়ে সিকিমের প্রকৃতি যেন হৃদয়কে নতুন করে বাঁচতে শেখায়।ভ্রমণের শেষ দিনে আমরা বুঝতে পারলাম, সিকিম শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়; এটি এক অনুভূতির নাম। এখানে পাহাড় শুধু চোখকে নয়, মনকেও ছুঁয়ে যায়। প্রকৃতির এত কাছে এসে জীবনের ছোট ছোট সুখগুলোর মূল্য আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়।ফেরার পথে গাড়ির জানালা দিয়ে শেষবারের মতো পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, সিকিম যেন নীরবে বলছেআবার এসো। আমরাও মনে মনে প্রতিশ্রুতি দিলাম, এই অফবিট সৌন্দর্যের রাজ্যে আবার ফিরে আসব। কারণ সিকিমের মায়া একবার যার মনে জায়গা করে নেয়, তাকে বারবার টেনে নিয়ে যায় তার সবুজ পাহাড়, নীল আকাশ আর মেঘের দেশে।
একদিনেই ঘুরে নিন বর্ধমান, সীতাভোগ-মিহিদানার শহরের কোনায় কোনায় ইতিহাসের হাতছানি, মুঘল আমল থেকে রাজকাহিনী, মন্দির
রাজ্যের অন্যতম বর্ধিষ্ণু জেলা বর্ধমান। বর্ধমান প্রকৃতই ক্রম-বর্ধমান। একদিনের ভ্রমণে বর্ধমান শহরকে বেছে নিলে জানতে পারবেন অনেক অজানা ইতিহাস। বঙ্গের অন্য়তম প্রাচীন জনপদ বর্ধমান। দূরে ভ্রমণের আগে একবার বর্ধমান শহরের আনাচে-কানাচে ঘুরলে আপনি সমৃদ্ধ হবেনই। এমনকী আপনার ভ্রমণ কাহিনীতে জুড়ে যাবে বিরাট রসদের ভান্ডার। তাই আর দেরি না করে বর্ধমান শহরে ইতিহাসকে জেনে নিন এক ঝলকে। রাজ্যের যে কোনও স্থান থেকে বর্ধমান শহরের যোগাযোগও খুব সহজ।বর্ধমানের নাম নিয়ে নানা মতবাদ আছে। বর্ধমান শব্দটি সংস্কৃত বর্ধ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো বৃদ্ধি পাওয়া, উন্নতি হওয়া বা সমৃদ্ধি লাভ করা। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল কৃষি, বাণিজ্য ও জনবসতির দিক থেকে সমৃদ্ধ ছিল। তাই এলাকাটির নাম বর্ধমান হয়েছে বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। জৈন ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে, ২৪তম তীর্থঙ্কর ভগবান মহাবীরের অপর নাম ছিল বর্ধমান। বলা হয়, তাঁর জন্মের পর রাজ্য ও পরিবারের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছিল, তাই তাঁর নাম রাখা হয় বর্ধমান। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান অঞ্চলে মহাবীরের আগমন ও ধর্মপ্রচারের স্মৃতি নিয়ে বিভিন্ন জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। এই কারণে অনেকের মতে জেলার নাম বর্ধমান মহাবীর বর্ধমানের নামের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, জেলার নামের মূল উৎস হলো এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমৃদ্ধির ধারণা, যদিও জৈন ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রভাবও স্থানীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। শহরের মধ্যস্থলে রাজবাড়ি যাওয়ার পথেই দেখা মিলবে বিখ্যাত কার্জন গেটের যা এখন বিজয় তোরণ নামেই পরিচিত। বর্ধমান রাজবাড়ি এখন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস।সর্বমঙ্গলা মন্দিরবর্ধমানের অধিষ্ঠার্থী দেবি মা সর্বমঙ্গলা। বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দির পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় শক্তিপীঠসদৃশ তীর্থস্থান। ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী দেবী সর্বমঙ্গলা অত্যন্ত জাগ্রত, অর্থাৎ তিনি ভক্তদের প্রার্থনা শোনেন এবং তাঁদের মনোবাসনা পূরণ করেন। বহু মানুষ তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মানত পূরণ এবং অলৌকিক ঘটনার কাহিনি এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, সর্বমঙ্গলা মন্দিরের মাহাত্ম্য মূলত বর্ধমান রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা, দেবীর অলৌকিক কাহিনি এবং দীর্ঘকালীন লোকবিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। কথিত আছে, এক জেলের জালে দেবীর মূর্তি উঠে আসে। পরে বর্ধমানের রাজা স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকেই দেবী সর্বমঙ্গলার পূজা শুরু হয় এবং মন্দিরটি বিশেষ খ্যাতি লাভ করে।গড়গড়াঘাটের গুরুদোয়ারাপ্রচলিত ঐতিহাসিক ও শিখ ধর্মীয় সূত্র অনুযায়ী, **গুরু নানক দেব জি প্রায় ১৫০৫-১৫০৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পূর্ব ভারত ভ্রমণের সময় বর্ধমানে এসেছিলেন। তিনি এখানে কিছুদিন অবস্থান করেন এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে মানবতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও এক ঈশ্বরের বাণী প্রচার করেন। এই স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই পরে বর্ধমানে সর্বমঙ্গলা পাড়ার পাশেই গড়গড়া ঘাটে গুরুদোয়ারা বড়া সঙ্গত প্রতিষ্ঠিত হয়। শিখ সম্প্রদায়ের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান। বলা হয়, গুরু নানক এখানে ধর্মীয় আলোচনা ও কীর্তন করেছিলেন এবং তাঁর পদধূলিতে স্থানটি পবিত্র বলে বিবেচিত হয়।কমলাকান্তের কালীবাড়িবর্ধমান শহরের কোটালহাটে অবস্থিত কমলাকান্তের কালীবাড়ি পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রসিদ্ধ কালীমন্দির। এই মন্দিরটি সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এর সাধনাক্ষেত্র হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্য (প্রায় ১৭৬৯১৮২১) ছিলেন বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাক্ত কবি, শ্যামাসংগীত রচয়িতা ও তন্ত্রসাধক। তাঁর জন্ম পূর্ব বর্ধমানের অম্বিকা কালনায়। তিনি ছোটবেলা থেকেই মা কালীর উপাসনায় আকৃষ্ট হন এবং পরে তন্ত্রসাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন বলে ভক্তদের মধ্যে বিশ্বাস প্রচলিত। বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্র তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি ও পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে রাজগুরু ও সভাসদ হিসেবে সম্মানিত করেন। মহারাজা তেজচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বর্ধমানের কোটালহাটে মা কালীর মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে সাধক কমলাকান্ত পঞ্চমুণ্ডির আসনে সাধনা করতেন। বর্তমানে এই মন্দিরই কমলাকান্তের কালীবাড়ি নামে বিখ্যাত। কথিত আছে, মহারাজা তেজচন্দ্র একবার তাঁর অলৌকিক শক্তি পরীক্ষা করতে চাইলে কমলাকান্ত অমাবস্যার রাতে পূর্ণিমার চাঁদ দেখিয়েছিলেন। বর্ধমানের মানুষের মুখে মুখে একথা প্রচলিত। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব প্রায়ই কমলাকান্তের শ্যামাসংগীত গাইতেন এবং তাঁর ভক্তিভাবের অত্যন্ত প্রশংসা করতেন। ফলে কমলাকান্তের গান ও সাধনা সমগ্র বাংলায় আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।শের আফগানের সমাধিবর্ধমান শহরের শের আফগানের সমাধি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুঘল যুগের ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ। এটি বিখ্যাত মূলত শের আফগান ও মেহেরুন্নিসা (পরবর্তীকালে সম্রাজ্ঞী নূরজাহান)-এর ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে। শের আফগানের প্রকৃত নাম ছিল আলি কুলি ইস্তাজলু। তিনি ছিলেন একজন পারস্য বংশোদ্ভূত মুঘল সেনাপতি। সম্রাট আকবর তাঁর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে শের আফগান(বাঘ-বধকারী) উপাধি দেন। শের আফগানের স্ত্রী ছিলেন মেহেরুন্নিসা, যিনি পরে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী এবং বিখ্যাত সম্রাজ্ঞী নূরজাহান নামে পরিচিত হন। এই কারণে শের আফগানের জীবন ও মৃত্যু ভারতীয় ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমানের ফৌজদার কুতুবউদ্দিন খান কোকা সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে শের আফগানের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। সংঘর্ষের সময় শের আফগান কুতুবউদ্দিনকে হত্যা করেন, কিন্তু তিনিও গুরুতর আহত হয়ে নিহত হন। পরে তাঁকে বর্ধমানে সমাহিত করা হয়। দুজনকে পাশাপাশি সমাধিস্ত করা হয়। ইতিহাস বলছে, মেহেরুন্নিসাকে নিয়ে যেতেই কুতুবুদ্দিনকে পাঠিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর। শের আফগানের মৃত্যুর পর মেহেরুন্নিসাকে মুঘল দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক বছর পরে তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরকে বিবাহ করেন এবং নূরজাহান নামে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী নারী হয়ে ওঠেন। তাই বর্ধমানের এই সমাধি শুধু একটি কবরস্থান নয়, বরং মুঘল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মারক।শুলি পুকুরবর্ধমান শহরের শুলি পুকুর একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পরিচিত। জনশ্রুতি অনুযায়ী, বর্ধমান রাজাদের আমলে গুরুতর অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য এই এলাকার কাছে শুলি (ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ডের এক প্রকার ব্যবস্থা) কার্যকর করা হতো। সেই কারণেই পুকুরটির নাম হয় শুলি পুকুর। বর্ধমান রাজবাড়ির গেটের উল্টোদিকের রাস্তার বাদিকেই এই শুলি পুকুরের অবস্থান। বর্ধমান রাজবংশের শাসনামলের সঙ্গে এই স্থানের নাম জড়িত।সীতাভোগ ও মিহিদানাবর্ধমানে ভ্রমণ করবেন আর মিষ্টি খাওয়া হবে না তা হয় নাকি! বর্ধমানে নানা স্বাদের মিষ্টি পাওয়া যায়। কিন্তু মূল আকর্ষণ সীতাভোগ ও মিহিদানায়। সীতাভোগ ও মিহিদানা বর্ধমানের ঐতিহ্যবাহী ও বিশ্ববিখ্যাত মিষ্টি। এই দুই মিষ্টি বর্ধমান রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয় এবং আজও বর্ধমানের পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক। মিহিদানা কী? মিহিদানা দেখতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বোঁদের মতো। বেসনের পরিবর্তে বিশেষ ধরনের চালের গুঁড়ো ও অন্যান্য উপাদান দিয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম দানার আকারে এটি তৈরি করা হয়। এর দানাগুলি খুবই ছোট ও নরম হওয়ায় এর নাম হয়েছে মিহি (সূক্ষ্ম) + দানা। সীতাভোগ কী? সীতাভোগ দেখতে অনেকটা সাদা ভাতের মতো। চালের গুঁড়ো, ছানা ও চিনি দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। এর মধ্যে ছোট ছোট মিষ্টি দানাও মেশানো থাকে। দেখতে ভাতের মতো হলেও এটি একটি সুস্বাদু মিষ্টান্ন। জনশ্রুতি রয়েছে, ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর-জেনারেল লর্ড কার্জন বর্ধমান সফরে এলে রাজা বিজয়চাঁদ মহতাবের উদ্যোগে ময়রা ভৈরবচন্দ্র নাগ এই দুই মিষ্টি পরিবেশন করেন। লর্ড কার্জন এর স্বাদে মুগ্ধ হন। এরপর থেকেই সীতাভোগ ও মিহিদানা সারা দেশে খ্যাতি লাভ করে।বর্ধমানের ১০৮ শিবমন্দিরবর্ধমান শহরের নবাবহাটে অবস্থিত ১০৮ শিবমন্দির পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বিখ্যাত শৈব তীর্থস্থান। এটি শুধু ধর্মীয় গুরুত্বের জন্য নয়, এর অনন্য স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেও প্রসিদ্ধ। ১৮শ শতাব্দীর শেষ দিকে বর্ধমান রাজবংশের মহারাণী বিষ্ণুকুমারী দেবী (কিছু সূত্রে মহারাজ তেজচন্দ্রের মাতৃকা) এই ১০৮টি শিবমন্দির নির্মাণ করান। মন্দিরগুলি প্রায় ১৭৮৮-১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় বলে জানা যায়। হিন্দুধর্মে ১০৮ সংখ্যাটি অত্যন্ত পবিত্র বলে গণ্য হয়। জপমালায় ১০৮টি দানা থাকে এবং শিবের ১০৮টি নামও প্রচলিত। সেই কারণেই এখানে ১০৮টি পৃথক শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বর্ধমান শহর লাগোয়া নবাবহাটে আয়তাকারে ১০৮টি শিব মন্দির আছে। এই মন্দিরগুলির বাইরে আরেকটি শিব মন্দির আছে। অন্যদিকে কালনায় আরেকটি ১০৮ শিব মন্দির আছে। এখানে বিশেষত্ব হল মন্দিরগুলি দুটি বৃত্তাকার সারিতে নির্মিত। বাইরের বৃত্তে ৭৪টি এবং ভিতরের বৃত্তে ৩৪টি মন্দির রয়েছে। প্রতিটি মন্দিরে একটি করে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত। কালো ও সাদা রঙের শিবলিঙ্গ পর্যায়ক্রমে স্থাপন করা হয়েছে, যা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। শ্রাবণ মাসে হাজার ভক্ত এই দুই ১০৮ শিব মন্দিরে পুজো দেন। একই জেলায় দুটি জায়গায় একই স্থানে ১০৮টা শিব মন্দির বিরল।বীরহাটা বড়মা কালীবর্ধমান শহরের অন্যতম প্রাচীন ও শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় স্থান হল বীরহাটা বড়মা কালীমন্দির। এই মন্দিরটি বর্ধমান রাজপরিবারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। জনশ্রুতি অনুসারে, বর্ধমানের মহারাজারা তাঁদের কুলদেবী হিসেবে মা কালীর আরাধনা করতেন এবং সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বীরহাটা অঞ্চলে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত দেবীকে অনেকে জাগ্রত মা কালী বলে মনে করেন। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, ভক্তিভরে প্রার্থনা করলে মা কালী মনোবাসনা পূরণ করেন। তাই সারা বছরই এখানে ভক্তদের ভিড় লেগে থাকে, বিশেষ করে কালীপূজা, দীপাবলি ও অমাবস্যা তিথিতে। বীরহাটা একসময় বর্ধমান রাজবাড়ির গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছিল। ফলে মন্দিরটি শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, বর্ধমানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহু বছর ধরে এখানে নিয়মিত পূজা, হোম-যজ্ঞ ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।কঙ্কালেশ্বরীশহরের কাঞ্চননগরে অবস্থিত কঙ্কালেশ্বরী কালীমন্দির জেলার অন্যতম প্রাচীন ও রহস্যময় তীর্থস্থান। ধারণা করা হয়, মন্দিরটির ইতিহাস কয়েকশো বছরের পুরোনো। কাঞ্চননগর একসময় গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ছিল এবং এখানেই দেবী কঙ্কালেশ্বরীর পূজা প্রতিষ্ঠিত হয়। দেবীর মূর্তি সাধারণ কালীমূর্তির মতো নয়; তাঁর রূপে কঙ্কালসদৃশ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যা তন্ত্রসাধনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।সোনার কালীবাড়িবর্ধমান শহরের মিঠাপুকুর এলাকায় অবস্থিত সোনার কালীবাড়ি (ভুবনেশ্বরী মন্দির) বর্ধমান রাজপরিবারের ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৮৯৯ সালে বর্ধমানের রাজা মহতাব চাঁদ এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন বলে প্রচলিত। জনশ্রুতি অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রী রানি নারায়ণী দেবী স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর ভুবনেশ্বরী মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমে এখানে সোনার তৈরি দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেই কারণেই মন্দিরটি সোনার কালীবাড়ি নামে পরিচিত হয়। ১৯৭০-এর দশকে সোনার মূর্তিটি চুরি হয়ে যায়। পরে সেখানে অষ্টধাতুর ভুবনেশ্বরী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়, কিন্তু সোনার কালীবাড়ি নামটি আজও রয়ে গেছে। এখানে দেবীর জিভ বাইরে বেরিয়ে নেই। দেবীর পদতলে শিব নেই, যা সাধারণ কালীমূর্তির থেকে আলাদা। প্রতি অমাবস্যায় বিশেষ পূজা হয়।বর্ধমান ও জৈন ধর্মের ঐতিহাসিক সম্পর্কবর্ধমান শহরের নামকরণ নিয়ে একটি সুপ্রচলিত মত হলো, এটি ২৪তম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর বর্ধমানের নামানুসারে হয়েছে। জৈন ঐতিহ্য অনুযায়ী, তিনি এই অঞ্চলে কিছু সময় অবস্থান করেছিলেন। তাই প্রাচীনকাল থেকেই বর্ধমানে জৈন সম্প্রদায়ের উপস্থিতি ছিল। সোনার কালীবাড়িতে জৈনদের ডান্ডিয়া করার কারণ ধর্মীয় নয় বরং বর্ধমানের গুজরাটি-জৈন সমাজের নবরাত্রি উদ্যাপনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং স্থানীয় সম্প্রীতির প্রকাশ। এমনকী বর্ধমান রাজ পরিবারের কুলদেবতা লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরেও ডান্ডিয়া উৎসবের প্রচলন আছে। নানা ধর্মীয় উৎসবে এই মন্দিরে হাজির হন রাজ পরিবারের সদস্যরা।বর্ধমান ভ্রমণে এলে গোলাপবাগ চত্বরে যেতে ভুলবেন না। সেখানে কৃষ্ণসায়র পার্ক, সায়েন্স সেন্টার, রমনাবাগান মিনি জু, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরম ক্যাম্পাস, তারা মন্ডল নানা কিছু রয়েছে পর্যটকদের জন্য। এমন গাছগাছালির প্রাকৃতিক পরিবেশে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। তাহলে আর দেরি কেন? বর্ধমান শহরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ুন।
টেরাকোটার টানে বাংলার গর্বের শহর বিষ্ণুপুর, ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনভূমি
পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর শুধু একটি শহর নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক অমূল্য ভাণ্ডার। মল্লরাজাদের রাজধানী হিসেবে বিষ্ণুপুর প্রায় এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সাক্ষী বহন করে চলেছে। বিশেষ করে এর বিখ্যাত টেরাকোটা মন্দিরসমূহ আজও দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।বিষ্ণুপুরের ইতিহাস-বিষ্ণুপুরের ইতিহাস মূলত মল্ল রাজবংশকে ঘিরে। প্রচলিত মতে, সপ্তম শতাব্দীতে রাজা আদিমল্ল মল্ল রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে এই রাজবংশের শাসকেরা বিষ্ণুপুরকে শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে রাজা বীর হাম্বীর এবং তাঁর উত্তরসূরিদের আমলে বিষ্ণুপুর সর্বাধিক সমৃদ্ধি লাভ করে। বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে এখানে অসংখ্য মন্দির নির্মিত হয়, যেগুলি আজও বাংলার স্থাপত্য ঐতিহ্যের গৌরব বহন করছে।টেরাকোটা শিল্পের ইতিহাস-বিষ্ণুপুরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল টেরাকোটা শিল্প। টেরাকোটা শব্দের অর্থ পোড়ামাটি। বাংলায় পাথরের অভাব থাকায় মন্দির নির্মাণে পোড়া ইট ও মাটির ফলক ব্যবহার করা হতো।মন্দিরের গায়ে সূক্ষ্ম কারুকার্যে ফুটে উঠেছে* রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনি* কৃষ্ণলীলা* রাজদরবারের দৃশ্য* যুদ্ধ ও শিকার* সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাএই শিল্পকর্মগুলি শুধু ধর্মীয় নয় বরং তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল।দর্শনীয় স্থান-রাসমঞ্চ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত রাসমঞ্চ বিষ্ণুপুরের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য। রাস উৎসবের সময় বিভিন্ন মন্দিরের বিগ্রহ এখানে এনে রাখা হতো।জোড়বাংলা মন্দিরবাংলার ঐতিহ্যবাহী দোচালা ঘরের আদলে নির্মিত এই মন্দির টেরাকোটা শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন।শ্যামরায় মন্দিরপঞ্চরত্ন শৈলীর এই মন্দিরের গায়ে অসাধারণ কারুকাজ পর্যটকদের মুগ্ধ করে।মদনমোহন মন্দিরবিষ্ণুপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণব মন্দির। এখানকার টেরাকোটা অলংকরণ অত্যন্ত সমৃদ্ধ।দলমাদল কামানমারাঠা আক্রমণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ঐতিহাসিক কামান, যা আজও বিষ্ণুপুরের গৌরবের প্রতীক।ভ্রমণের জন্য কেন উপযোগী?বিষ্ণুপুর এমন একটি গন্তব্য যেখানে ইতিহাস, শিল্প, ধর্ম ও প্রকৃতি একসঙ্গে উপভোগ করা যায়।* কলকাতা থেকে সহজে ট্রেন বা সড়কপথে পৌঁছানো যায়।* এক বা দুই দিনের ভ্রমণের জন্য আদর্শ।* ইতিহাসপ্রেমী, স্থাপত্যপ্রেমী ও ফটোগ্রাফারদের জন্য স্বর্গতুল্য।* বিখ্যাত **বালুচরী শাড়ি** কেনার সুযোগ রয়েছে।* শীতকালে আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং দর্শন আরামদায়ক হয়।কখন যাবেন?বিষ্ণুপুর ভ্রমণের সেরা সময় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময় আবহাওয়া আরামদায়ক থাকে এবং ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত বিষ্ণুপুর মেলা স্থানীয় সংস্কৃতি ও হস্তশিল্পের এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেয়। বাংলার ঐতিহ্যকে কাছ থেকে জানতে চাইলে বিষ্ণুপুর অবশ্যই আপনার ভ্রমণ তালিকায় থাকা উচিত। মল্লরাজাদের ইতিহাস, টেরাকোটা মন্দিরের অনবদ্য কারুকার্য, বালুচরী শাড়ির ঐতিহ্য এবং শান্ত পরিবেশ, সব মিলিয়ে বিষ্ণুপুর এক অনন্য ঐতিহাসিক ভ্রমণগন্তব্য। এখানে একদিন কাটালেই মনে হবে, যেন কয়েকশো বছর পিছিয়ে বাংলার গৌরবময় অতীতে ফিরে গেছেন।
কম খরচে কেরালা ভ্রমণ: ব্যাকওয়াটার থেকে পাহাড়, সবই হাতের নাগালে স্বর্গীয় সৌন্দর্য
ভারতের মানচিত্রে কেরালাকে বলা হয় Gods Own Country। আর এই উপাধির সবচেয়ে বড় কারণ তার অনন্য ব্যাকওয়াটার, সবুজ নারকেল বন, শান্ত গ্রাম আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। অনেকেই মনে করেন কেরালা ভ্রমণ মানেই প্রচুর খরচ, বিলাসবহুল হাউসবোট আর দামি রিসর্ট। কিন্তু একটু পরিকল্পনা করলেই খুব কম খরচেও উপভোগ করা যায় কেরালার মনোমুগ্ধকর ব্যাকওয়াটার এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।ভোরবেলা আলাপ্পুঝা (Alappuzha) বা আলেপ্পির ঘাটে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই একটি জলরঙের ছবি এঁকেছে। চারদিকে শান্ত জলরাশি, তার মাঝে ভেসে চলেছে ছোট ছোট নৌকা। দূরে দেখা যাচ্ছে নারকেল গাছের সারি, মাঝে মাঝে গ্রামের মানুষ নৌকায় করে বাজারে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখার জন্য লাখ লাখ পর্যটক কেরালায় আসেন। অনেকেই হাউসবোট ভাড়া করেন, যার খরচ বেশ বেশি। কিন্তু কম খরচে ব্যাকওয়াটার উপভোগ করতে চাইলে সরকারি ফেরি বা স্থানীয় নৌকায় চড়া সবচেয়ে ভালো উপায়। মাত্র কয়েকশো টাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাকওয়াটারের বুক চিরে ভ্রমণ করা যায়। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে গল্প করতে করতে প্রকৃত কেরালাকে কাছ থেকে দেখা যায়।নৌকা যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে, তখন দুপাশে চোখে পড়ে সবুজ ধানক্ষেত, ছোট্ট চার্চ, মন্দির এবং নদীর ধারে গড়ে ওঠা গ্রাম। কোথাও জেলেরা মাছ ধরছেন, কোথাও আবার শিশুরা জলে খেলছে। শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে এই শান্ত পরিবেশ মনকে এক অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। কেরালার প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু ব্যাকওয়াটারেই সীমাবদ্ধ নয়। মুন্নারের পাহাড়ি অঞ্চলে গেলে দেখা যায় অসীম বিস্তৃত চা-বাগান। পাহাড়ের গায়ে সবুজের কারুকাজ যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা। সকালের কুয়াশা আর ঠান্ডা হাওয়া মুহূর্তেই মন জয় করে নেয়। কম খরচে থাকার জন্য এখানে অনেক হোমস্টে ও বাজেট হোটেল পাওয়া যায়।এছাড়া ভরকালা ও কোভালামের সমুদ্রসৈকতও পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সূর্যাস্তের সময় আরব সাগরের বুকে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য জীবনের অন্যতম সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়ে থাকতে পারে। সৈকতে বসে শুধু প্রকৃতিকে উপভোগ করলেও কোনও অতিরিক্ত খরচ হয় না। কেরালার স্থানীয় খাবারও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। কলাপাতায় পরিবেশিত ভাত, সাম্বর, থোরান, মাছের কারি কিংবা আপ্পাম ও স্ট্যু স্বাদে যেমন অনন্য, তেমনি দামেও সাধ্যের মধ্যে। স্থানীয় রেস্তোরাঁয় খেলে খাবারের খরচ অনেকটাই কমে যায়।কম খরচে কেরালা ভ্রমণের জন্য ট্রেন সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। কোচি বা আলাপ্পুঝা পর্যন্ত ট্রেনে পৌঁছে স্থানীয় বাস ও ফেরি ব্যবহার করলে যাতায়াতের খরচ অনেক কম হয়। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি সময়টি ভ্রমণের জন্য আদর্শ, কারণ তখন আবহাওয়া মনোরম থাকে।কেরালার ব্যাকওয়াটারে সূর্যাস্তের সময় যখন আকাশের রং জলের ওপর প্রতিফলিত হয়, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজের সেরা রূপটি মেলে ধরেছে। শান্ত জল, নারকেল গাছের ছায়া, পাখির ডাক আর গ্রামের সরল জীবনসব মিলিয়ে কেরালা শুধু একটি পর্যটনস্থল নয়, বরং এক অনুভূতির নাম। তাই যদি কম খরচে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কয়েকটি স্মরণীয় দিন কাটাতে চান, তাহলে কেরালার ব্যাকওয়াটার আপনার জন্য এক অসাধারণ গন্তব্য। একবার ঘুরে এলে মন বারবার ফিরে যেতে চাইবে সেই শান্ত, সবুজ আর জলময় স্বর্গরাজ্যে।
ট্রেন যাত্রার অগ্রিম সংরক্ষণের সময়সীমা কমিয়ে হল ৬০ দিন
এতদিন ধরে ১২০ দিনে কবে রিজারভেশন হবে এই নিয়ে মানুষের মনে একটি বিভ্রান্তি বা কনফিউশন থাকত, কিন্তু ভারতীয় রেল সেই কনফিউশন দূর করে ১২০ দিনের পরিবর্তে এবার ৬০ দিনে রিজারভেশন চালু করেছে যা যাত্রীদের জন্য একটি সুসংবাদ। এমন অনেক যাত্রী রয়েছেন যারা বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের যাত্রার অনেক আগে পরিকল্পনা করতে অসুবিধা বোধ করেন। যাত্রীসুবিধায় রেলওয়ে ট্রেন যাত্রার জন্য অ্যাডভান্সড রিজার্ভেশন পিরিয়ড (এআরপি) ১২০ দিন থেকে কমিয়ে ৬০ দিন করেছে। সংশোধিত নতুন এআরপি নিম্নরূপ কার্যকর হবে:১. অ্যাডভান্সড রিজার্ভেশন পিরিয়ড (এআরপি) হবে ৬০ দিন (যাত্রার দিন বাদে) যা ০১.১১.২০২৪ থেকে কার্যকর এবং সেই অনুযায়ী বুকিং করা হবে। তবে, ১২০ দিনের এআরপি-র অধীনে ৩১.১০.২০২৪ পর্যন্ত করা সমস্ত বুকিং বৈধ থাকবে।২. ৬০ দিনের এআরপি-র বাইরে করা আগের বুকিং থাকলে তা বাতিল করা যাবে।৩. তাজ এক্সপ্রেস, গোমতী এক্সপ্রেস ইত্যাদির মতো নির্দিষ্ট দিনের সময়ের এক্সপ্রেস ট্রেনের ক্ষেত্রে কোনও পরিবর্তন হবে না যেখানে অগ্রিম সংরক্ষণের জন্য নিম্ন সময়সীমা বর্তমানে কার্যকর রয়েছে।৪. বন্ধন এক্সপ্রেস ও মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের মতো আন্তর্জাতিক ট্রেনে বিদেশি পর্যটকদের ৩৬৫ দিনের বুকিংয়ের সময়সীমার ক্ষেত্রে কোনও পরিবর্তন হবে না।
কলকাতা
রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় সিদ্ধান্ত বদল! অগ্নিমিত্রার ঘোষণায় নতুন বিতর্ক, তৈরি হচ্ছে ৫০টি ঘাট
পুজোর আগে কলকাতার রাস্তা সৌন্দর্যায়নের জন্য গাঢ় রং ব্যবহার করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। মোটরবাইক দুর্ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে সেই রং সরিয়ে ফেলতে হয়েছিল। এ বার রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজোর অনুমতি দেওয়া নিয়েও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অবস্থান বদল করতে হল তাঁকে। পরিবেশ আদালতের নির্দেশের কথা মাথায় রেখে শেষ পর্যন্ত বিকল্প ঘাট তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য। দক্ষিণ কলকাতায় মোট ৫০টি ঘাট তৈরি রাখা হবে বলে জানিয়েছেন পুরমন্ত্রী।বুধবার রবীন্দ্র সরোবর ও সুভাষ সরোবর পরিদর্শনের পর অগ্নিমিত্রা জানিয়েছিলেন, এ বছর দুই সরোবরেই ছটপুজোর অনুমতি দেওয়া হবে। তাঁর অভিযোগ ছিল, আগের সরকার রাজনীতির কারণে হিন্দুদের উৎসব বন্ধ করে রেখেছিল। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এ বার স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থের কথা ভেবে ছটপুজোর অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।কিন্তু পুরমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরেই শুরু হয় বিতর্ক। পরিবেশবিদ ও আইনজীবীদের একাংশ এর বিরোধিতা করেন। তাঁদের বক্তব্য, রবীন্দ্র সরোবর ও সুভাষ সরোবরে ছটপুজো বন্ধ রাখার বিষয়ে পরিবেশ আদালতের নির্দেশ রয়েছে। সেই নির্দেশ অমান্য করে সেখানে পুজোর অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।বিশিষ্ট পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত, মোহিত রায় এবং সোমেন্দ্রমোহন ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বরা বিষয়টি নিয়ে সরব হন। তাঁরা কলকাতা মহানগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান, পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে এমন কোনও সিদ্ধান্ত যেন নেওয়া না হয়। তাঁদের বক্তব্য, দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সবুজ এলাকা রবীন্দ্র সরোবরের পরিবেশ রক্ষা করা জরুরি।উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে জাতীয় পরিবেশ আদালতের নির্দেশের পর থেকেই রবীন্দ্র সরোবর ও সুভাষ সরোবরে ছটপুজো বন্ধ রয়েছে। ২০২০ সালে তৎকালীন তৃণমূল সরকারও সেখানে ছটপুজোর অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। কিন্তু আদালতের নির্দেশের কারণে শেষ পর্যন্ত সেই অনুমতি পাওয়া যায়নি।এ বারও আদালতের নির্দেশের বিষয়টি সামনে এনে সরোবর দুটিতে ছটপুজোর ঘাট তৈরি না করার জন্য নবান্নকে অনুরোধ করেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা। কলকাতা মহানগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইঞ্জিনিয়ারেরাও বিকল্প ঘাট তৈরির প্রস্তাব দেন। পাটুলি, নোনাডাঙা, যোধপুর পার্ক এবং পোদ্দারনগরের মতো এলাকায় কী ভাবে ছটপুজোর ব্যবস্থা করা যায়, তার বিস্তারিত তথ্য পুরমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়।এর পরেই বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন অগ্নিমিত্রা। তিনি জানান, রবীন্দ্র সরোবর ও সুভাষ সরোবরে ছটপুজোর অনুমতি না পাওয়া গেলে পরিবেশ আদালতের নির্দেশ মেনেই চলা হবে। দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় মোট ৫০টি বিকল্প ঘাট তৈরি রাখা হচ্ছে, যাতে ছটপুজোর পুণ্যার্থীদের কোনও অসুবিধা না হয়।রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজোর অনুমতি দেওয়ার ঘোষণা থেকে বিকল্প ঘাট তৈরির সিদ্ধান্তমাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুরমন্ত্রীর এই অবস্থান পরিবর্তন ঘিরে রাজনৈতিক ও পরিবেশ মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন নজর, ছটপুজোর আগে বিকল্প ঘাট তৈরির কাজ কতটা সম্পূর্ণ করতে পারে প্রশাসন।
কলকাতা-সহ ৭ পুরসভায় এখনই ভোট নয়! হাই কোর্টের নির্দেশে বড় ধাক্কা, কবে হবে নির্বাচন?
কলকাতা, হাওড়া-সহ রাজ্যের সাতটি পুরসভায় এখনই হচ্ছে না নির্বাচন। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পুরভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারবে না রাজ্য নির্বাচন কমিশন। শুক্রবার কলকাতা হাই কোর্টের অবকাশকালীন ডিভিশন বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের এই সিদ্ধান্তে পুরভোট নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কবে নির্বাচন হবে, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।শুক্রবার বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি অর্জুন রায় মুখোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত মামলার শুনানি ছিল। সেখানেই আদালত জানিয়ে দেয়, এই মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পুরসভাগুলির নির্বাচন নিয়ে কোনও বিজ্ঞপ্তি জারি করা যাবে না। অর্থাৎ, আগে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত আইনি জট কাটাতে হবে। তার পরেই ভোটের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে নির্বাচন কমিশন।রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকেই বিভিন্ন পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের কাজ শুরু করে সরকার। কলকাতা পুরসভার ক্ষেত্রে ওয়ার্ডের সংখ্যা ১৪৪ থেকে বাড়িয়ে ২০৯ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে প্রথম থেকেই সরব হয়েছিল বিরোধী দলগুলি। তাদের আপত্তি শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়ায়।পুজোর ছুটির মধ্যে মামলা দায়ের হওয়ায় বিষয়টি হাই কোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চে ওঠে। শুক্রবার সেই মামলার শুনানির পর আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের মামলা মিটে যাওয়ার আগে পুরভোটের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা যাবে না। ফলে নভেম্বরের শেষ দিকে নির্বাচন হতে পারে বলে যে জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের একাধিক পুরসভা ও পুরনিগমে নির্বাচন হয়নি। কোথাও পুরবোর্ডের মেয়াদ শেষ হয়েছে, কোথাও আবার পুরবোর্ড ভেঙে যাওয়ার পর প্রশাসকেরা দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক পরিষেবা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। দ্রুত নির্বাচন করানোর পক্ষে সওয়াল করে আসছিল রাজ্য সরকারও।আদালতের নির্দেশের পর এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশের পর এ বিষয়ে তাঁদের কিছু বলার থাকতে পারে না। তবে দীর্ঘদিন ভোট না হলে সাধারণ মানুষকেই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।হাই কোর্টের এই নির্দেশের পর কলকাতা, হাওড়া-সহ সাতটি পুরসভায় কবে নির্বাচন হবে, তা নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। আপাতত ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তির দিকেই নজর রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের।
বুদ্ধদেবকে আক্রমণ শুভেন্দুর, বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে গিয়ে জ্যোতি বসুর নাম টানলেন বিমান! বাম শিবিরে নতুন বিতর্ক
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে নিশানা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আর সেই বিতর্কের জবাব দিতে গিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নাম টেনে আনলেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। তাঁর বক্তব্য, বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পনীতি তৈরি হয়েছিল জ্যোতি বসুর নেতৃত্বেই। সেই নীতি কার্যকর করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বিমানের এই মন্তব্য ঘিরেই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে সিপিএমের অন্দরে। বন্ধুকে আড়াল করতেই কি জ্যোতি বসুর নাম সামনে আনলেন বর্ষীয়ান বাম নেতা?বৃহস্পতিবার রাজ্য সরকারের নতুন শিল্পনীতি প্রকাশের পরেই শুরু হয় রাজনৈতিক চাপানউতোর। ওই নীতিতে গত বাম আমলের জমি অধিগ্রহণ এবং শিল্প গড়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি অভিযোগ তুলেছে রাজ্য সরকার।নতুন শিল্পনীতিতে দাবি করা হয়েছে, হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের জমি অধিগ্রহণের বিজ্ঞপ্তি জারি করার আইনি ক্ষমতা ছিল না। ১৮৯৪ সালের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী, এই ক্ষমতা ছিল জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা কালেক্টরের হাতে। রাজ্য সরকারের বক্তব্য, বিষয়টি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও একসময় সংবাদমাধ্যমের সামনে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু নিজের দলের মধ্যে চাপে পড়ে সেই নিয়ম উপেক্ষা করা হয়। তার পরিণতিতেই নন্দীগ্রামে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।শুভেন্দু অধিকারীর এই আক্রমণ নিয়ে বিমান বসুকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পাশে দাঁড়ান। তবে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে অন্য এক নাম। বিমান বলেন, জ্যোতি বসুর নেতৃত্বেই বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পনীতি তৈরি ও ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই নীতিতে কোনও সমস্যা থাকলে তার দায় জ্যোতি বসুরও। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে সেই শিল্পনীতি কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মাত্র।বিমানের এই মন্তব্য ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। রাজনৈতিক মহলের একাংশের প্রশ্ন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের উপর থেকে দায় সরাতেই কি জ্যোতি বসুর নাম সামনে আনলেন বিমান? সিপিএমের অন্দরেও এই বক্তব্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে খবর।তবে বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের অন্য দিকও রয়েছে। ২০০৬ সালে তৎকালীন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাসের মৃত্যুর পর দলের রাজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব পান বিমান বসু। ফলে সেই সময়ের শিল্পনীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তাঁর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। সমালোচকদের একাংশের দাবি, এই কারণেই জ্যোতি বসুর নেতৃত্বের প্রসঙ্গ সামনে এনে দায় ভাগ করে দিতে চেয়েছেন বিমান।যদিও এই বিতর্ক নিয়ে এখনও পর্যন্ত সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। তবে শুভেন্দুর আক্রমণ, বুদ্ধদেবকে নিয়ে বিমানের জবাব এবং তার পাল্টা জ্যোতি বসুর প্রসঙ্গসব মিলিয়ে পুরনো শিল্পনীতি ও নন্দীগ্রাম বিতর্ক নতুন করে রাজ্য রাজনীতির আলোচনায় উঠে এসেছে।
ফুসফুসে আটকে বিশাল চুম্বক, বন্ধ হচ্ছিল শ্বাস! অভিনব কৌশলে ৬ বছরের শিশুর প্রাণ বাঁচালেন কলকাতার চিকিৎসকেরা
ফুসফুসের ভিতরে আটকে গিয়েছিল বড়সড় চুম্বক। ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসছিল শ্বাস নেওয়ার পথ। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়া থেকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় ছবছরের এক শিশুকে। পরীক্ষা করে দেখা যায়, শিশুটির ডান দিকের ফুসফুসের শ্বাসনালিতে আটকে রয়েছে চুম্বক। শেষ পর্যন্ত অভিনব পদ্ধতিতে সেই চুম্বকই বের করে শিশুটির প্রাণ বাঁচালেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকেরা। চুম্বক বের করতে ব্যবহার করা হল বিশেষ ভাবে তৈরি আরও একটি ছোট চুম্বক। চিকিৎসকদের দাবি, এই পদ্ধতি অত্যন্ত বিরল।হাসপাতাল সূত্রে খবর, গত ৩ নভেম্বর ওই শিশুকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে আসা হয়। শারীরিক পরীক্ষা করার পর চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি বেশ জটিল। ফুসফুসের ডান দিকের শ্বাসনালির ভিতরে আটকে রয়েছে একটি বড় চুম্বক। তার জেরে শিশুটির স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল। সাধারণ পদ্ধতিতে চুম্বকটি বের করার চেষ্টা করলে সমস্যা আরও বাড়তে পারত। তাই বিকল্প পদ্ধতির কথা ভাবতে শুরু করেন চিকিৎসকেরা।এর পরেই নেওয়া হয় অভিনব উদ্যোগ। মানিকতলার প্রভাকর কাঁড়ার নামে এক কারিগরের সাহায্যে তৈরি করা হয় প্রায় ৩ মিলিমিটারের একটি বিশেষ চুম্বক। সেটিকে একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসার যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তার পর ব্রঙ্কোস্কপির সাহায্যে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ফুসফুসের শ্বাসনালিতে পৌঁছে দেওয়া হয় যন্ত্রটি। শেষ পর্যন্ত ছোট চুম্বকের সাহায্যে ভিতরে আটকে থাকা বড় চুম্বকটি বের করে আনতে সক্ষম হন চিকিৎসকেরা।চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল। সামান্য ভুলেও শিশুটির শ্বাসনালির ক্ষতি হতে পারত। তাই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়। কলকাতার কোনও মেডিক্যাল কলেজে তো বটেই, দেশের অন্য সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালেও এর আগে এমন পদ্ধতি প্রয়োগ হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে চিকিৎসক মহলের একাংশের।এই চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক চিকিৎসক সৌমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অধ্যাপক চিকিৎসক দীপ্তাংশু মুখোপাধ্যায় এবং অ্যানাস্থেশিয়া বিভাগের চিকিৎসক দেবাশিস ঘোষ। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন চিকিৎসক আত্রেয়ী বসু, শুভ্রজিৎ নস্কর এবং উদিতা সোরেন।এই বিরল চিকিৎসা পদ্ধতি ঘিরে চিকিৎসক মহলে ইতিমধ্যেই চর্চা শুরু হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের এই উদ্যোগে খুশি শিশুটির পরিবারের সদস্যেরাও। স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে নানা অভিযোগের মধ্যে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
বিদেশ
আমেরিকার ভোটে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের জয়জয়কার! লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র হলেন কেরলের নিত্যা
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল রিপাবলিকান শিবির। কংগ্রেসের দুই কক্ষ, সেনেট এবং হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল। অন্য দিকে, বিভিন্ন জায়গায় জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। এই নির্বাচনে বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত রাজনীতিকেরা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম কেরলে জন্ম নেওয়া নিত্যা রমন। লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন তিনি। এই জয়ের ফলে শহরটির প্রথম এশীয়-আমেরিকান মেয়র হলেন নিত্যা। প্রতিদ্বন্দ্বী কারেন বাসকে হারিয়ে ৫১.১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন তিনি। বাস পেয়েছেন ৪৮.৩৩ শতাংশ।এই নির্বাচনে শুধু নিত্যাই নন, জয় পেয়েছেন আরও কয়েক জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহিলা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অরুণা মিলার। ১৯৬৪ সালের ৬ নভেম্বর হায়দরাবাদে জন্ম তাঁর। মাত্র সাত বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে আমেরিকায় চলে যান অরুণা। পরে মিসৌরি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৮৯ সালে স্নাতক হওয়ার পর দীর্ঘ দিন সরকারি চাকরি করেন তিনি। পরে রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০১০ সালে মেরিল্যান্ডের আইনসভায় নির্বাচিত হন অরুণা। ২০২২ সালে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হিসাবে মেরিল্যান্ডের লেফটেন্যান্ট গভর্নর হন তিনি। এ বারও নির্বাচনে জয় পেয়েছেন অরুণা।এ বারের নির্বাচনে আরও এক নতুন মুখ পিয়া ডান্ডিয়া। ফ্লোরিডার ২২ নম্বর কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। প্রায় ৫১.৯ শতাংশ ভোট পেয়েছেন পিয়া। পেশায় শিক্ষাবিদ এই ডেমোক্র্যাট নেত্রী ফ্লোরিডার পাম বিচ কাউন্টিতে জন্মগ্রহণ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষকতা করতেন তিনি। পরে নিউ ইয়র্কের হারলেম এলাকার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হন। এই জয়ের ফলে ওই কেন্দ্র থেকে প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রতিনিধি হিসাবে মার্কিন কংগ্রেসে জায়গা করে নিলেন পিয়া।আমেরিকার রাজনীতিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের এই সাফল্য নতুন করে নজর কেড়েছে। চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী কিংবা শিক্ষাবিদ নানা পেশা থেকে উঠে এসে রাজনীতির ময়দানে নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন তাঁরা। জন্ম বা বেড়ে ওঠা আমেরিকায় হলেও তাঁদের শিকড় জড়িয়ে রয়েছে ভারতের সঙ্গে।
ইউরোপের আকাশে বোমাতঙ্ক! একসঙ্গে ৭ বিমান ও প্রমোদতরীতে হুমকি, জরুরি অবতরণ একাধিক উড়ানের
ইউরোপের একাধিক দেশের বিমান ও প্রমোদতরীতে বোমা হামলার হুমকি। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বিভিন্ন দেশে। ইটালি, বেলজিয়াম এবং বুলগেরিয়াগামী একাধিক বিমানে বোমা রাখার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে অন্তত সাতটি বিমান এবং একটি প্রমোদতরীতে হুমকি ফোন ও ইমেল আসে বলে খবর। এর পরেই ইউরোপের বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। ব্যাহত হয় স্বাভাবিক বিমান চলাচল। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কোনও বিমানেই বিস্ফোরক মেলেনি।এই ঘটনার জেরে ডাবলিন থেকে রোমগামী এয়ার লিঙ্গাসের একটি বিমানকে জরুরি অবতরণ করানো হয়। বিমানটি ফ্রান্সের এভরেক্স বিমানবন্দরে নামে। প্যারিস থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ওই বিমানবন্দরে বিমানটি নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে। আইরিশ বিমান সংস্থার তরফে এই খবর জানানো হয়েছে।অন্য দিকে, বেলজিয়ামের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোল্যান্ডের বিমান সংস্থা এলওটির একটি বিমানকে ব্রাসেলসের জাভেনটেম বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, হেলসিঙ্কি থেকে আসা ফিনএয়ারের একটি বিমানকে ইটালির বায়ুসেনা নিরাপত্তা দিয়ে রোম পর্যন্ত নিয়ে যায়। পরে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে।বুলগেরিয়াতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সেখানকার প্রশাসন জানিয়েছে, বোমা হামলার হুমকির পর তিনটি বিমানকে জরুরি অবতরণ করানো হয়েছে। সম্প্রচারমাধ্যম বিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুলগেরিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, কোপেনহেগেন এবং মাদ্রিদ থেকে আসা বিমান দুটি সোফিয়ায় অবতরণ করে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর, লন্ডন থেকে আসা আরও একটি বিমানকে প্লোভদিভ বিমানবন্দরে নামানো হয়।তবে এই হুমকিগুলির পিছনে কারা রয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কোনও দেশই এখনও পর্যন্ত সন্দেহভাজনদের পরিচয় প্রকাশ করেনি। এই ঘটনার সময় ইউরোপের একাধিক দেশ রাশিয়া এবং ইরানের বিরুদ্ধে গোপন হামলা ও অন্তর্ঘাতমূলক কাজকর্মে যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলছে। যদিও মস্কো এবং তেহরান সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।উল্লেখযোগ্য ভাবে, চলতি সপ্তাহেই ইউরোপের কয়েকটি দেশের সুপারমার্কেটে সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে। অজ্ঞাতপরিচয় হ্যাকারদের হামলায় একাধিক দোকানের রেফ্রিজারেটর অকেজো হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, বিমান ও প্রমোদতরীতে বোমা হামলার হুমকিও একই ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। তাঁদের মতে, এই ধরনের ঘটনার উদ্দেশ্য হতে পারে আতঙ্ক ছড়ানো এবং হামলার নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা চিহ্নিত করা কঠিন করে তোলা।সব মিলিয়ে, একের পর এক বোমা হামলার হুমকিতে ইউরোপের বিমান চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও বিস্ফোরক উদ্ধার না হওয়ায় স্বস্তিতে প্রশাসন।
গুগল-মাইক্রোসফটের পর এবার মেটাতেও ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা! বিপুল টাকা দিয়ে কর্মীদের স্বেচ্ছাবসর দেওয়ার প্রস্তাব
প্রযুক্তি দুনিয়ায় কর্মী কমানোর প্রবণতা অব্যাহত। গুগল এবং মাইক্রোসফটের পর এবার কর্মীদের স্বেচ্ছাবসরের প্রস্তাব দিল মার্ক জুকারবার্গের সংস্থা মেটা। ফ্রান্সে কর্মরত কর্মীদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্যাকেজের বিনিময়ে চাকরি ছাড়ার সুযোগ দিচ্ছে এই তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা। একটি ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে প্রায় ১০০ জন কর্মীর উপর। তবে ঠিক কোন কোন বিভাগের কর্মীদের এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা লেত্র-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সে মেটার মোট কর্মী সংখ্যা প্রায় ৩০০। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০০ জনকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। তবে গুগল বা মাইক্রোসফটের মতো প্রত্যেক কর্মীকে আলাদা ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে মেটা ফ্রান্সে একটি বিশেষ যৌথ চুক্তির মাধ্যমে কর্মী সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করেছে।ফ্রান্সে এই পদ্ধতিকে বলা হয় সম্মিলিত চুক্তিভিত্তিক কর্মী বিচ্ছেদ। এই ব্যবস্থায় সংস্থা এবং কর্মীরা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে চাকরির সম্পর্ক শেষ করতে পারেন। এর জন্য সংস্থাকে আর্থিক কারণে কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রমাণ দিতে হয় না। পাশাপাশি সাধারণ কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়াতেও যেতে হয় না। যাঁরা এই প্রস্তাবে রাজি, তাঁদের ৫ নভেম্বরের মধ্যে আবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রকল্পে চাকরি ছাড়তে রাজি হওয়া কর্মীরা কাজের প্রতি বছরের জন্য ২.১৫ মাসের বেতনের সমান অর্থ পাবেন। পাশাপাশি তাঁরা ১০ মাসের বিশেষ ছুটিও পাবেন। সেই সময় তাঁদের মোট বেতনের ৮০ শতাংশ দেওয়া হবে। ফলে চাকরি ছাড়ার পরেও বেশ কিছু দিন আর্থিক সুবিধা পাবেন কর্মীরা।জানা গিয়েছে, চলতি বছরের জুলাই মাস থেকেই এই যৌথ চুক্তির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। তবে মেটার এই সিদ্ধান্ত আপাতত ফ্রান্সের কর্মীদের জন্যই। বিশ্বের অন্যান্য দেশে কর্মীদেরও একই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হবে কি না, তা এখনও জানা যায়নি। গোটা বিশ্বে মেটার কর্মী সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার।এর আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষমতা নিয়ে মুখ খুলেছিলেন মেটার প্রধান মার্ক জুকারবার্গ। তাঁর বক্তব্য ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এখন এমন অনেক কাজ করা সম্ভব, যার জন্য আগে বড় কর্মীদল প্রয়োজন হত। একজন কর্মীও প্রযুক্তির সাহায্যে সেই কাজ করতে পারেন। তাঁর এই মন্তব্যের পর থেকেই প্রযুক্তি সংস্থাগুলিতে কর্মী সংখ্যা কমানো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।শুধু মেটা নয়, কর্মী কমানোর পথে হাঁটছে আরও একাধিক বড় প্রযুক্তি সংস্থা। গুগল ইতিমধ্যেই পাঁচটি দেশের কর্মীদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্য দিকে, মাইক্রোসফট আমেরিকা, কানাডা, ভারত এবং ব্রিটেনের প্রায় ৬০ হাজার যোগ্য কর্মীর জন্য বিশেষ আর্থিক সুবিধা-সহ চাকরি ছাড়ার প্রকল্প ঘোষণা করেছে।এ ছাড়াও চলতি সপ্তাহের শুরুতে নকশা তৈরির সংস্থা ক্যানভা ১২৭১ জন কর্মীকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করেছে। তাঁদের জন্যও মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মী কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনছে বিশ্বের প্রথম সারির প্রযুক্তি সংস্থাগুলি। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।
নেতানিয়াহুর গদি কি টলমল? ইজরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী পদে বিরোধী নেতাকে সমর্থন আরব দলগুলির!
ইজরায়েলের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী পদে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটকে সমর্থন জানাল আরব-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলি। বৃহস্পতিবার এই ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে আইজেনকোটের পক্ষে ১২০ আসনের সংসদে ৬৭ জন সদস্যের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইজরায়েলে সরকার গড়তে প্রয়োজন ৬১ জন সাংসদের সমর্থন। সেই হিসাব অনুযায়ী, সরকার গঠনের দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারেন বিরোধী নেতা।বৃহস্পতিবার যৌথ তালিকা জোট জানায়, তারা দেশের রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজগের কাছে আইজেনকোটকে পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করবে। এর আগে আর একটি আরব-নেতৃত্বাধীন দল রাআমও একই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যৌথ তালিকা জোটের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির কাছে তাদের সিদ্ধান্ত জানানো হবে।যৌথ তালিকা জোটের হাতে রয়েছে ১১টি আসন। অন্য দিকে, রাআমের আসন সংখ্যা আট। দুই দল মিলিয়ে মোট ১৯ জন সাংসদ রয়েছেন। ইজরায়েলের সংসদে আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলির পক্ষে এই সংখ্যা রেকর্ড বলে জানা যাচ্ছে। এই দুই দলের সমর্থন নিশ্চিত হলে আইজেনকোটের পক্ষে মোট ৬৭ জন সাংসদের সমর্থন থাকতে পারে। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে থাকবে তাঁর শিবির।অন্য দিকে, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর শিবিরের সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁদের হাতে রয়েছে ৫৩টি আসন। তবে প্রধানমন্ত্রী পদে নেতানিয়াহুকে কত জন সাংসদ সমর্থন করবেন, সেই সংখ্যা আরও কম হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর জোটের শরিক ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের একটি অংশও তাঁর পাশে নেই। ওই জোটের সাতটি আসনের মধ্যে চারটি আসন রয়েছে দেগেল হা তোরাহের হাতে। তারা জানিয়েছে, নেতানিয়াহু বা আইজেনকোটকাউকেই প্রধানমন্ত্রী পদে সমর্থন করবে না। টাইমস অফ ইজরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতি-গোঁড়া ইহুদি সম্প্রদায়ের পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা থেকে ছাড় দেওয়ার আইন পাশ করাতে ব্যর্থ হয়েছে নেতানিয়াহু সরকার। সেই কারণেই জোটের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।সব মিলিয়ে ইজরায়েলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য কাকে আমন্ত্রণ জানাবেন, তা ঠিক করবেন। আরব দলগুলির সমর্থনে আপাতত সেই দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন গাদি আইজেনকোট। তবে শেষ পর্যন্ত ইজরায়েলের ক্ষমতা কার হাতে যায়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
সম্পাদকীয়
আগুনপাখির জন্মদিনে—ফিরে দেখা সেই বিকেলের সোনারোদ
কিছু কিছু মানুষের জন্মদিন আসে ক্যালেন্ডারের পাতায়। আর কিছু মানুষের জন্মদিন ফিরে আসে আমাদের স্মৃতির ভিতর দিয়ে। ১ সেপ্টেম্বর তেমনই একটি দিন।বাংলা গানের অমূল্য রতন নচিকেতা চক্রবর্তীর জন্মদিন।এই দিনটিকে শুধু একজন শিল্পীর জন্মদিন বললে বোধহয় তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়। কারণ নচিকেতা শুধু গান করেননিতিনি এক সময়কে কণ্ঠ দিয়েছেন। এক প্রজন্মের রাগ, অভিমান, প্রেম, হতাশা, স্বপ্নভঙ্গ, নিঃসঙ্গতা আর বেঁচে থাকার জেদকে শব্দ দিয়েছেন। তাঁর গান শুনতে শুনতে বড় হয়ে ওঠা মানুষগুলির কাছে নচিকেতা কোনও দূরের তারকা নন; তিনি বরং সেই পুরনো বন্ধুর মতো, যার সঙ্গে বহু বছর দেখা না হলেও হঠাৎ কোনও সন্ধ্যায় তাঁর গলা শুনলেই মনে হয়এই তো, মানুষটা এখনও ঠিক আগের মতোই আছে।নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ।বাংলা গানের আকাশটা তখন কেমন যেন ক্লান্ত। একদিকে পুরনো দিনের সুরের নস্টালজিয়া, অন্যদিকে নতুন সময়ের হাওয়ার টান। বাংলা আধুনিক গান যেন কোথাও দাঁড়িয়ে নতুন ভাষার অপেক্ষা করছে। সেই অপেক্ষার মাঝেই একদিন ঝড়ের মতো এসে দাঁড়ালেন এক যুবক।চেহারায় প্রচলিত নায়কোচিত চাকচিক্য নেই। রংবাহারী পোশাক, পায়ে স্নিকার, মুখে অগোছালো দাড়ি। হাতে গিটার। আর কণ্ঠে এমন এক স্বর, যার মধ্যে মিশে আছে শহরের ধুলো, মধ্যবিত্তের ক্লান্তি, প্রেমের দীর্ঘশ্বাস আর অদ্ভুত এক বিদ্রোহ।তিনি নচিকেতা।মঞ্চে উঠে তিনি শুধু গান গাইতেন না। গান থামিয়ে শ্রোতার সঙ্গে কথা বলতেন। আবার কথার মাঝেই গান ঢুকে যেত। কখনও হাসাতেন, কখনও অস্বস্তিতে ফেলতেন, কখনও এমন কোনও কথা বলে বসতেন, যা বাড়ি ফেরার পরও মাথার মধ্যে ঘুরত।সেই সময় বাংলা গানের মঞ্চে যেন একটি গান-এর বদলে একজন মানুষ এসে দাঁড়িয়েছিলেন।আর মানুষটি খুব দ্রুত আপন হয়ে গিয়েছিলেন।তারপর একদিন গান আর গান রইল নানচিকেতার গান প্রথমবার শুনে হয়তো কেউ চমকে উঠেছিল। দ্বিতীয়বার শুনে মুগ্ধ হয়েছিল। আর তৃতীয়বারের পর বুঝেছিলএই গান তো আসলে তার নিজের কথা!এই ছিল নচিকেতার জাদু।তিনি কোনও দূরদেশের প্রেমের গল্প বলেননি। তিনি আমাদের পাশের বাড়ির মানুষের গল্প বলেছেন। যে বাবা অবসরের পর সংসারে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন, যে মার সব থেকেও বৃদ্ধাশ্রমে বাস, যে ছেলে চাকরি না পেয়ে রাত জাগে, যে মেয়ে প্রেম হারিয়ে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে, যে মানুষটি ভিড়ের শহরে থেকেও ভীষণ একানচিকেতা তাঁদেরই গল্প গেয়েছেন।তাই তাঁর গান শুনতে শুনতে মনে হত, তিনি আমাদের চেনেন। খুব কাছ থেকে চেনেন।নীলাঞ্জনা যখন বাজত, কোনও এক পুরনো প্রেমের মুখ মনে পড়ত। বৃদ্ধাশ্রম শুনলে নিজের বাবা-মায়ের মুখের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করত। আর যখন তাঁর কণ্ঠে উঠে আসতভিড় করে ইমারত আকাশটা ঢেকে দিয়ে,চুরি করে নিয়ে যায় বিকেলের সোনারোদতখন মনে হত, এই তো আমাদের শহর!এই তো আমাদের হারিয়ে যাওয়া বিকেল!কংক্রিটের জঙ্গলে দাঁড়িয়ে যে আকাশটুকু প্রতিদিন একটু একটু করে ছোট হয়ে যাচ্ছে, নচিকেতা সেই আকাশের জন্যও গান লিখেছেন।নচিকেতা ছিলেন এক প্রজন্মের ডায়েরিএকটি প্রজন্মের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে অনেক কিছু লেখা থাকে। প্রথম প্রেম, প্রথম চিঠি, প্রথম প্রত্যাখ্যান, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, প্রথম চাকরি, বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়া, বাড়িতে অশান্তি, মধ্যরাতে একা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা।নচিকেতার গান যেন সেই ডায়েরির পাতাগুলির পাশে লেখা ছিল।ক্যাসেটের যুগ ছিল তখন।একটি গান পছন্দ হলে বারবার রিওয়াইন্ড করতে হত। ফিতে কেঁপে কেঁপে গান ফিরত। কোনও কোনও ক্যাসেট এতবার বাজত যে তার শব্দেও যেন স্মৃতির গন্ধ লেগে যেত।বন্ধুর বাড়িতে বসে নচিকেতার গান শোনা।কলেজের ক্যান্টিনে তাঁর গান নিয়ে তর্ক।রাতের অন্ধকারে হেডফোন কানে দিয়ে নীলাঞ্জনা শোনা।কারও প্রেম ভেঙে গেলে তাকে নচিকেতার গান শোনানো।কেউ চাকরি না পেলে বেকারে যন্ত্রনায় মলম লাগাতে তার পাশে বসে সারে জাঁহা সে আচ্ছা গুনগুন করা।শিক্ষিত হয়েও চাকরি না পাওয়া, সামাজিক অবক্ষয় ও চারপাশের অসঙ্গতি। গানটি শুরুই হয় বেকার যুবকের আত্মপরিচয় দিয়ে।এসবই ছিল এক সময়ের জীবন।আজকের প্রজন্ম হয়তো বুঝবে না, একটি গান তখন কীভাবে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠত। কোনও অ্যালগরিদম ছিল না, রেকমেন্ডেড ফর ইউ ছিল না। ছিল শুধু বন্ধুর হাতে হাতে ঘুরে বেড়ানো ক্যাসেট, মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গান আর মানুষের নিজস্ব পছন্দ।সেইভাবেই নচিকেতা ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলেন।জীবনমুখীশুধু একটি শব্দ নয়নচিকেতার সঙ্গে জীবনমুখী শব্দটি এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে দুটি শব্দকে আলাদা করা কঠিন।কিন্তু তাঁর গানকে শুধু একটি ঘরানার মধ্যে আটকে রাখাও ভুল।তিনি জীবনকে দেখেছেন বহু দিক থেকে।কখনও তাঁর চোখে জীবন তীব্র ব্যঙ্গের। কখনও বিষণ্ণ। কখনও প্রেমময়। কখনও ক্ষুব্ধ। কখনও নিঃসঙ্গ। আবার কখনও আশাবাদী।তাঁর গান আমাদের শিখিয়েছেজীবন সুন্দর, কিন্তু সবসময় সুন্দর নয়।ভালোবাসা আছে, কিন্তু সব প্রেম পূর্ণতা পায় না।পরিবার আছে, কিন্তু পরিবারের মধ্যেও মানুষ একা হতে পারে।শহর আছে, কিন্তু শহরের হাজার মানুষের ভিড়েও নিজের জন্য একটা জানালা খুঁজে পাওয়া কঠিন।এই সত্যগুলিকে তিনি কোনও বক্তৃতার ভাষায় বলেননি। বলেছেন গানের ভাষায়।আর তাই তাঁর কথা সরাসরি গিয়ে বসেছে মানুষের বুকের মধ্যে।বৃদ্ধাশ্রমএকটি গান, একটি আয়নানচিকেতার অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে বৃদ্ধাশ্রম যেন আলাদা করে দাঁড়িয়ে থাকে।এটি কেবল বাবা-মাকে নিয়ে লেখা আবেগের গান নয়। এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের সামনে রাখা একটি আয়না।বয়স হয়ে যাওয়া মানুষটির প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় নাএই সহজ অথচ গভীর সত্যটি নচিকেতা গানের মাধ্যমে মনে করিয়ে দিয়েছেন।গানটি শুনতে শুনতে কত মানুষ হয়তো নিজের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কথা ভেবেছেন। কত মানুষ হয়তো ফোন তুলে বাড়িতে কথা বলেছেন। কত মানুষ হয়তো নিজের অজান্তেই চোখ মুছেছেন।একজন শিল্পীর কাছে এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে?যে গান শ্রোতার জীবনকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও বদলে দেয়, সেই গানই তো বেঁচে থাকে।আর নীলাঞ্জনাস্মৃতির নীল আলোঅন্যদিকে নীলাঞ্জনা আমাদের নিয়ে যায় একেবারে অন্য জগতে।প্রেমের গান বাংলা গানে নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু নচিকেতার প্রেমের ভাষা ছিল অন্যরকম। সেখানে প্রেমের সঙ্গে ছিল সময়, স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়ার ব্যথা।নীলাঞ্জনা শুনলে শুধু একটি মেয়ের কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে একটা সময়ের কথা।মনে পড়ে সেই বয়স, যখন সন্ধ্যা নামলেই কারও জন্য অপেক্ষা করা যেত। ফোনের রিং বাজলে বুক কেঁপে উঠত। একটি চিঠি কয়েকদিন ধরে বালিশের নিচে রেখে দেওয়া যেত।আজ সেই সময় নেই।মানুষের হাতে স্মার্টফোন আছে, মুহূর্তে বার্তা পৌঁছে যায়। কিন্তু অপেক্ষার সেই দীর্ঘ সৌন্দর্য কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।তাই নচিকেতার গান শুনলে শুধু গান শোনা হয় নাএকটি হারিয়ে যাওয়া সময়কে ছুঁয়ে দেখা হয়।আগুনপাখি কেন?নচিকেতা থেকে আগুনপাখি হয়ে ওঠার গল্প আসলে তাঁর শ্রোতাদের গল্পও।তিনি আগুনের মতো এসেছিলেন। প্রচলিত গানের অনেক ধারণাকে প্রশ্ন করেছিলেন। গানের বিষয়কে বদলেছিলেন। গায়ক-শ্রোতার দূরত্ব কমিয়েছিলেন।তাঁর গান বলেছিলগান শুধু সাজানো শব্দ নয়।গান প্রশ্ন করতে পারে।গান প্রতিবাদ করতে পারে।গান হাসাতে পারে।গান কাঁদাতে পারে।গান নিজের ঘরের দরজা খুলে দিতে পারে।আর গান কখনও কখনও আয়নার মতো সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারেদেখো, এটাই তোমার জীবন।এই কারণেই তিনি আগুনপাখি।সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, গান বুড়িয়ে যায়নিনচিকেতার জীবনে বহু বছর পেরিয়ে গেছে। বাংলা গানের জগতেও এসেছে অসংখ্য পরিবর্তন। নতুন শিল্পী এসেছেন, নতুন সুর এসেছে, নতুন প্রযুক্তি এসেছে।কিন্তু নচিকেতার গান এখনও শোনা হয়।কারণ তাঁর গান কোনও নির্দিষ্ট দশকের সম্পত্তি নয়।যে বাবা-মায়ের কথা তিনি গেয়েছিলেন, তাঁরা আজও আছেন।যে প্রেমের কথা তিনি গেয়েছিলেন, সেই প্রেম আজও মানুষকে কাঁদায়।যে একাকিত্বের কথা তিনি বলেছিলেন, তা আজ আরও গভীর।যে শহরের কথা তিনি গেয়েছিলেন, সেই শহর আজ আরও কংক্রিটে ঢাকা।আর যে মানুষটির কথা তিনি গেয়েছিলেনসেই সাধারণ মানুষটি আজও ঠিক তেমনই বেঁচে আছে।তাই তাঁর গান পুরনো হয় না।বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু গান যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।আজ জন্মদিনে তাঁকে মনে পড়ছে অন্যভাবেআজ যখন নচিকেতার জন্মদিন, তখন মনে হয়আমরা কি তাঁকে শুধুই তাঁর জনপ্রিয় গান দিয়ে মনে রাখব?না।তাঁকে মনে রাখা উচিত সেই সাহসটির জন্য, যা বাংলা গানে একসময় প্রয়োজন ছিল।তাঁকে মনে রাখা উচিত সেই ভাষার জন্য, যা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে গানের ভাষা করে তুলেছিল।তাঁকে মনে রাখা উচিত সেই কণ্ঠের জন্য, যার মধ্যে কোনও কৃত্রিম মাধুর্য ছিল নাছিল জীবনের খসখসে বাস্তবতা।আর সবচেয়ে বেশি মনে রাখা উচিত সেই মানুষটিকে, যিনি আমাদের শিখিয়েছিলেনগান শুনে শুধু আনন্দ পেতে নেই, কখনও কখনও নিজের দিকে তাকাতেও হয়।আজও হয়তো কোনও পুরনো ক্যাসেটের বাক্সে তাঁর গান পড়ে আছে।কোনও পুরনো অ্যালবামের মলাটে সময়ের ধুলো জমেছে।কোনও এক মধ্যবয়সী মানুষ অফিস থেকে ফিরে হঠাৎ ইউটিউবে নচিকেতার গান চালিয়ে দিয়েছেন।গান শুরু হয়েছে।আর মুহূর্তের মধ্যে তিরিশ বছর পেছনে চলে গেছেন তিনি।সেই পুরনো ঘর।সেই জানালা।সেই বিকেল।সেই অসমাপ্ত প্রেম।সেই বন্ধুটি।সেই বয়স।সেই স্বপ্ন।আর কোথাও খুব দূরে, কিংবা খুব কাছে, নচিকেতার কণ্ঠ ভেসে আসছে।ভিড় করে ইমারত আকাশটা ঢেকে দিয়ে,চুরি করে নিয়ে যায় বিকেলের সোনারোদহয়তো সত্যিই আমাদের জীবনের অনেক সোনারোদ হারিয়ে গেছে।কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপারনচিকেতার গান সেই হারিয়ে যাওয়া রোদটুকু এখনও ফিরিয়ে দিতে পারে।এই তো একজন সত্যিকারের শিল্পীর সাফল্য।তিনি চলে যান না।সময় তাঁকে সরিয়ে দিতে পারে না।প্রজন্ম বদলে যায়, গান শোনার মাধ্যম বদলে যায়, শহরের চেহারা বদলে যায়তবু তাঁর কোনও একটি গান হঠাৎ কোথাও বাজে, আর আমরা থমকে দাঁড়াই।মনে হয়এই গানটা তো আমারই কথা।এই অনুভূতিটুকুই নচিকেতার সবচেয়ে বড় অর্জন।তাই আজ তাঁর জন্মদিনে শুধু শুভেচ্ছা নয়।একটি প্রজন্মের হয়ে কৃতজ্ঞতা।সেইসব বিকেলের জন্য, যেগুলিকে তিনি গানে বাঁচিয়ে রেখেছেন।সেইসব কান্নার জন্য, যেগুলির ভাষা তিনি দিয়েছেন।সেইসব প্রেমের জন্য, যেগুলি পূর্ণতা পায়নি।সেইসব বাবা-মায়ের জন্য, যাঁদের নিঃসঙ্গতার কথা তিনি আমাদের শুনিয়েছেন।সেইসব মধ্যবিত্ত স্বপ্নের জন্য, যেগুলি ভেঙেও মানুষকে বাঁচতে হয়।আর সেইসব মানুষের জন্য, যারা এখনও কোনও এক নির্জন রাতে নচিকেতার গান শুনে মনে মনে বলেএ গানটা যেন আমারই জন্য লেখাজন্মদিনে তাই প্রিয় নচিকেতা, আপনাকে প্রণাম।বাংলা গানের আকাশে আপনার সেই আগুনপাখি আজও উড়ে বেড়াক।আর আমাদের হারিয়ে যাওয়া বিকেলগুলির আকাশেএকটু সোনারোদ হয়ে থাকুক আপনার গান।
বিদ্রোহের আগুন থেকে সাম্যের গান—নজরুলের যে জীবন আজও আমাদের বিস্মিত করে
কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা চিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে। চিনি সাম্যের কবি, প্রেমের কবি, মানবতার কবি হিসেবে। তাঁর কবিতা আবৃত্তি হয়েছে মঞ্চে, তাঁর গান বেজেছে ঘরে ঘরে, তাঁর বিদ্রোহের বার্তা উচ্চারিত হয়েছে দশকের পর দশক। কিন্তু নজরুলকে যতটা আমরা জানি, তার চেয়ে অনেক বেশি অজানা রয়ে গিয়েছে তাঁর বিস্ময়কর জীবনের নানা অধ্যায়।নজরুলের জীবন যেন এক চলমান উপন্যাসযেখানে একদিকে দারিদ্র্য, অন্যদিকে বিদ্রোহ; একদিকে সৈনিকের পোশাক, অন্যদিকে কবির কলম; একদিকে ইসলামী সংগীত ও গজল, অন্যদিকে শ্যামা সংগীত ও ভজন; একদিকে রাজনৈতিক সংগ্রাম, অন্যদিকে চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দা। তিনি কোনও একটি পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে বন্দি রাখেননি। বরং তাঁর জীবনই হয়ে উঠেছিল বহুত্বের এক অসাধারণ উদাহরণ।লেটো দলের মঞ্চ থেকেই শুরুকৈশোরেই দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন নজরুল। সংসারের অভাব তাঁকে স্কুলের গণ্ডি থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। তিনি যুক্ত হন বাংলার লোকনাট্যের জনপ্রিয় ধারা লেটো দলে। সেখানে শুধু অভিনয়ই করেননিগান লিখেছেন, কবিতা লিখেছেন, নাটকের সংলাপ ও পালা রচনা করেছেন, সুর দিয়েছেন, সেই গান গেয়েছেন।এই লেটো-পর্বকে নজরুলের সাহিত্যিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণক্ষেত্র বলা যায়। লোকভাষা, ছন্দ, সুর, নাটকীয়তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযন্ত্রণাসবকিছুর সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে এই সময়েই। পরবর্তী নজরুল-কাব্যে যে সহজ অথচ তীব্র ভাষা, তার শিকড় অনেকটাই এই লোকজ অভিজ্ঞতায়।সৈনিক নজরুল: যুদ্ধের ময়দান থেকে কবিতার পৃথিবী১৯১৭ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন নজরুল। করাচিতে তাঁর দীর্ঘ সেনাজীবন কাটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষপর্বের এই অভিজ্ঞতা তাঁর মানসজগতে গভীর ছাপ ফেলে।সেনাবাহিনীতে থাকাকালীনই তিনি নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করেন। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে বসে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, গল্প-কবিতা লেখাসবই চলত। যুদ্ধ তাঁকে শুধু অস্ত্রের সঙ্গে পরিচয় করায়নি; মানুষের জীবন, মৃত্যু, সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের বাস্তবতাকেও নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছিল।পরবর্তীকালে তাঁর লেখায় যে যুদ্ধবিরোধী মানবিকতা এবং শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ দেখা যায়, তার পেছনে এই অভিজ্ঞতার ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।বিদ্রোহীএক কবিতার বিস্ফোরণ১৯২১ সালের শেষদিকে রচিত বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পর বাংলা সাহিত্যে যেন এক ভূমিকম্প ঘটে। এতদিনের কাব্যভাষার বাইরে দাঁড়িয়ে এক তরুণ কবি ঘোষণা করলেন নিজের অদম্য আত্মপরিচয়।কিন্তু বিদ্রোহী কেবল রাজনৈতিক বিদ্রোহের কবিতা নয়। এখানে আছে পুরাণ, ইসলামি ঐতিহ্য, হিন্দু দেবদেবী, প্রকৃতি, প্রেম, ধ্বংস ও সৃষ্টির এক বিস্ময়কর মিশ্রণ। নজরুল যেন বলতে চেয়েছিলেনমানুষকে কোনও একটি ধর্ম, জাতি বা পরিচয়ের খাঁচায় আটকে রাখা যায় না।ধূমকেতু: কলম যখন অস্ত্রনজরুলের সাংবাদিক সত্তাটিও কম বিস্ময়কর নয়। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ধূমকেতু। পত্রিকাটির নামের মধ্যেই যেন ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ইঙ্গিত।ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর লেখাগুলি দ্রুতই প্রশাসনের নজরে আসে। আনন্দময়ীর আগমনে কবিতাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তাঁকে কারাবন্দি করা হয়।কারাগারেও তিনি নীরব থাকেননি। বন্দিদের অধিকার এবং ঔপনিবেশিক নিপীড়নের প্রতিবাদে তিনি অনশন করেন। দীর্ঘ অনশনের সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়ে বার্তাও পাঠিয়েছিলেন।এই ঘটনা প্রমাণ করে, নজরুলের কাছে স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান ছিল নাএটি ছিল ব্যক্তিগত বিশ্বাস।খিলাফত প্রশ্নে নজরুলের অবস্থাননজরুলের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর খিলাফত আন্দোলন সম্পর্কে অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও গভীর হতে পারেএই আশঙ্কা তাঁর চিন্তায় প্রতিফলিত হয়েছিল।নজরুলের মূল অবস্থান ছিল মানুষের মুক্তি। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজনের বদলে তিনি চেয়েছিলেন শ্রমজীবী, কৃষক, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের ঐক্য।তাই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে বারবার ফিরে এসেছে মানুষহিন্দু বা মুসলমান নয়, প্রথমত মানুষ।লেবার স্বরাজ পার্টি: কবির রাজনৈতিক সংগঠন১৯২৫ সালে নজরুল শ্রমিক-কৃষকের অধিকারের প্রশ্নে সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা নেন। হেমন্তকুমার সরকার ও অন্যান্য বামপন্থী নেতাদের সঙ্গে তিনি লেবার স্বরাজ পার্টি অব দ্য ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস গঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।এই সংগঠনের ভাবনায় ছিল শ্রমিক-কৃষকের অধিকার, ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন।নজরুলের রাজনৈতিক লেখায় যে শ্রেণি সচেতনতা দেখা যায়, তার সঙ্গে এই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের গভীর সম্পর্ক ছিল।নির্বাচনের ময়দানেও নজরুলশুধু কবিতা বা বক্তৃতার মধ্যেই তাঁর রাজনীতি সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯২৬ সালে তিনি আইনসভার নির্বাচনে প্রার্থীও হন। অর্থবল ও সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকে তিনি পিছিয়ে ছিলেন। ফলে নির্বাচনী রাজনীতিতে সফলতা আসেনি।কিন্তু এই পর্বটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, নজরুল নিজেকে কেবল সাহিত্যিক হিসেবে দেখেননি। সমাজ পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেও তিনি অংশ নিতে চেয়েছিলেন।হিন্দু-মুসলমানের মিলনের এক বিরল শিল্পীনজরুলের সৃষ্টির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলির একটি তাঁর ধর্মীয় বহুত্ববাদ।তিনি লিখেছেন ইসলামী গান, হামদ, নাত, গজল। আবার লিখেছেন শ্যামাসংগীত, ভজন, কীর্তন ও হিন্দু দেবদেবীকে নিয়ে অসংখ্য গান।মা, শ্যামা, কালী, কৃষ্ণ যেমন তাঁর গানে এসেছে, তেমনই এসেছে আল্লাহ, নবী, রমজান, ঈদ ও ইসলামী আধ্যাত্মিকতার নানা অনুষঙ্গ।এখানে কোনও কৃত্রিম সমন্বয় ছিল না। নজরুলের কাছে ধর্ম ছিল মানুষের আত্মিক অনুভূতির ভাষা; বিভেদের অস্ত্র নয়।তাঁর এই অবস্থান আজকের সময়েও অসাধারণ প্রাসঙ্গিক।চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় আর এক নজরুলনজরুলকে আমরা কবি ও গীতিকার হিসেবে যতটা মনে রাখি, চলচ্চিত্রের মানুষ নজরুলকে ততটা মনে রাখি না।কলকাতার চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে তাঁর গভীর যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। তিনি চলচ্চিত্রে গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন এবং সংগীত পরিচালনা করেছেন। নির্বাক যুগ থেকে সবাক চলচ্চিত্রের উত্তরণের সময় বাংলা সিনেমার সংগীতে নতুন মাত্রা আনার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।১৯৩৪ সালের ধ্রুব চলচ্চিত্রে তিনি দেবর্ষি নারদের ভূমিকায় অভিনয় করেন। একই সঙ্গে ছবিটির সংগীত পরিচালনা ও গীতরচনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। হাতে একতারা, পায়ে খড়ম, মুখে নারদের সাজরুপালি পর্দায় নজরুলের এই উপস্থিতি আজ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক মূল্যবান অধ্যায়। এটি ছিল তাঁর অভিনয়জীবনের একমাত্র চলচ্চিত্র অভিনয়।রবীন্দ্রনাথের কবিতায় নজরুলের সুররবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সম্পর্ক বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম সুন্দর অধ্যায়।বয়সে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অনেক বড়। সাহিত্যিক পথও ছিল আলাদা। তবু দুজনের মধ্যে ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও স্নেহ।চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের রচনায় নজরুলের সুরারোপের ঘটনাটি এই সম্পর্কের এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। রবীন্দ্রনাথের রচনায় প্রচলিত সুরের বাইরে গিয়ে নজরুল নতুন সুর নির্মাণ করেছিলেন। সেই সুর কবিগুরুকে শুনিয়ে তাঁর অনুমোদন পাওয়ার ঘটনাটি শুধু দুজন শিল্পীর পারস্পরিক শ্রদ্ধার নয়, সৃষ্টিশীল স্বাধীনতারও একটি সুন্দর উদাহরণ।নারীদের কণ্ঠে নতুন যুগবাংলা গান ও চলচ্চিত্রে নারী কণ্ঠশিল্পীদের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও নজরুলের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। আঙ্গুরবালা দেবী, ইন্দুবালা দেবী, কানন দেবীসহ তৎকালীন বহু শিল্পীর সঙ্গে তাঁর পেশাগত ও সৃষ্টিশীল সম্পর্ক ছিল।বিশেষ করে নারীদের সামাজিক অবস্থান যখন নানা বিধিনিষেধে আবদ্ধ, তখন তাঁদের কণ্ঠকে বৃহত্তর শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নজরুলের গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।তাঁর সৃষ্ট নারীচরিত্রও ছিল প্রচলিত ধারণার বাইরেস্বাধীন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এবং প্রতিবাদী।হাফিজ ও ওমর খৈয়াম থেকে নজরুলের বাংলানজরুলের সাহিত্যিক পরিসর বাংলা ভাষার গণ্ডিতে আটকে ছিল না। ফারসি সাহিত্য, আরবি সংস্কৃতি এবং ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর গভীর পরিচয় ছিল।হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের রচনার অনুবাদে তিনি বাংলা ভাষায় নিয়ে এসেছিলেন এক অন্যরকম সুর, ভাব ও রোমান্টিকতা। তাঁর অনুবাদে কেবল ভাষান্তর নয়, অনেক সময় দেখা যায় সৃষ্টিশীল পুনর্নির্মাণের প্রবণতা।এই কাজগুলির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্যের সাহিত্য-ঐতিহ্যের সঙ্গে।হাজার গানের স্রষ্টা, অথচ কত গান হারিয়ে গেল!নজরুলের গান নিয়ে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় তাঁর জীবনের শেষ পর্ব। নজরুলের অসুস্থতার কারণে পরবর্তী সময়ে তাঁর বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে তাঁর অসংখ্য গানের সঠিক সুর, স্বরলিপি ও পরিবেশনরীতি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।আজ আমরা নজরুলগীতির বিপুল ভাণ্ডারের কথা বলি। কিন্তু সেই ভাণ্ডারের কত অংশ হারিয়ে গেছে, কত গান ভুল সুরে বা অসম্পূর্ণভাবে আমাদের কাছে পৌঁছেছেতার সম্পূর্ণ হিসাব করা কঠিন।এই জায়গাতেই নজরুল গবেষণার সামনে এখনও বিশাল কাজ পড়ে রয়েছে।শুধু বিদ্রোহী নন, তিনি ছিলেন সৃষ্টির কবিওনজরুলকে শুধু বিদ্রোহের কবি হিসেবে দেখলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়। তিনি প্রেমের কবি। তিনি প্রকৃতির কবি। তিনি আধ্যাত্মিকতার কবি। তিনি হাস্যরসের কবি। তিনি শিশুদের কবি। তিনি শ্রমিকের কবি, কৃষকের কবি, নারীর কবি, নিপীড়িত মানুষের কবি।তাঁর সাম্যবাদী উচ্চারণ যেমন রাজনৈতিক, তেমনই গভীর মানবিক। তাঁর নারী কবিতা যেমন নারীমুক্তির কথা বলে, তেমনই তাঁর প্রেমের গান ব্যক্তিমানুষের হৃদয়ের গোপন দরজাও খুলে দেয়।নজরুলের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষানজরুলের জীবনের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠেতিনি কখনও নিজের পরিচয়কে সংকীর্ণ হতে দেননি।দারিদ্র্য তাঁকে থামাতে পারেনি। সেনাজীবন তাঁকে কবিতা থেকে দূরে সরাতে পারেনি। কারাগার তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি। রাজনৈতিক ব্যর্থতা তাঁকে ভেঙে দেয়নি। ধর্মীয় বিভাজন তাঁকে কোনও একপক্ষের কবি বানাতে পারেনি।তিনি একই সঙ্গে মসজিদের আজান শুনেছেন, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি শুনেছেন; ইসলামী গজল লিখেছেন, আবার শ্যামাসংগীতে মাতৃসাধনার ভাষা সৃষ্টি করেছেন।এই কারণেই নজরুল কেবল একটি জাতির, একটি ধর্মের বা একটি সময়ের কবি নন। তিনি বাংলা ভাষার এক অনন্ত মানবিক কণ্ঠ।আজ তাঁর প্রয়াণের এত বছর পরেও যখন সমাজে বিভাজন বাড়ে, যখন মানুষের পরিচয় ধর্ম ও সম্প্রদায়ের খোপে আটকে যেতে চায়, যখন অন্যায়ের সামনে নীরব থাকার প্রবণতা তৈরি হয়তখন নজরুলের কণ্ঠ আবার ফিরে আসে।সে কণ্ঠ বলেমানুষের চেয়ে বড় কোনও পরিচয় নেই।বিদ্রোহ মানে শুধু অস্ত্র তুলে নেওয়া নয়; অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করাও বিদ্রোহ।আর সাম্য মানে শুধু রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়; অন্যের ধর্ম, ভাষা, পরিচয় ও মর্যাদাকে নিজের মতোই সম্মান করাও সাম্য।তাই নজরুলকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় শুধু তাঁর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান নয়। তাঁর গান গাওয়া, কবিতা আবৃত্তি করা কিংবা সামাজিক মাধ্যমে কয়েকটি আবেগঘন বাক্য লেখা নয়।নজরুলকে সত্যিকার অর্থে স্মরণ করতে হলে তাঁর প্রশ্নগুলিকে নিজেদের জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে।মানুষ কি সত্যিই মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে?অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা কি এখনও কথা বলি?ধর্মের নামে বিভেদের বদলে ভালোবাসার সেতু গড়তে পারি কি?এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলেই বোঝা যায়নজরুল আজও অমর।তিনি আছেন আমাদের প্রতিবাদে, আমাদের প্রেমে, আমাদের গানে, আমাদের সাম্যের স্বপ্নে।আর যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি কণ্ঠ উচ্চারিত হবে, ততদিন সেই কণ্ঠের ভিতরে কোথাও না কোথাও বেঁচে থাকবেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
ভারত কেশরী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি: এক অবিস্মরণীয় রাষ্ট্রনায়ক
৬ জুলাই। ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। আজ সেই মানুষটির জন্মদিন, যিনি স্বাধীন ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ, শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ এবং আপসহীন দেশপ্রেমিকড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি।অনেকেই তাঁকে কেবল একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে মনে রাখেন। কিন্তু তাঁর পরিচয় এর চেয়েও অনেক বিস্তৃত। তিনি ছিলেন এক অসামান্য শিক্ষাবিদ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য, স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা। দেশের ঐক্য, সাংবিধানিক মর্যাদা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তিনি কখনও আপস করেননি।ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির শিকড় জড়িয়ে রয়েছে বাংলার মাটির সঙ্গে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের জিরাট। যদিও তাঁর জন্ম হয়েছিল কলকাতার ভবানীপুরে, তবুও জিরাট আজও গর্বের সঙ্গে বহন করে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের স্মৃতি। এই বাংলার মাটিতেই তাঁর শৈশব-কৈশোরের মূল্যবোধ গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীকালে তাঁকে জাতীয় রাজনীতির এক দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন নির্ভীক। দেশভাগের সময় বাংলার হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত রাখার দাবিতে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর দৃঢ় অবস্থানের ফলেই পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে টিকে থাকেএমন মত বহু ঐতিহাসিক ও গবেষকের। স্বাধীনতার পরে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেও দেশের স্বার্থে মতপার্থক্য দেখা দিলে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেন। নীতির সঙ্গে আপস না করার এই বিরল দৃষ্টান্ত আজও রাজনৈতিক মহলে অনুকরণীয়।ভারতের সংবিধানে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের প্রবর্তন এবং জম্মু-কাশ্মীরে পৃথক সংবিধান, পৃথক পতাকা ও পৃথক প্রধানমন্ত্রীর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ় আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত আহ্বানএক দেশে দুই বিধান, দুই প্রধান, দুই নিশান চলবে নাআজও জাতীয় রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক স্লোগান হিসেবে বিবেচিত।১৯৫৩ সালে কাশ্মীরে প্রবেশের সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বন্দি অবস্থায় রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়। সেই মৃত্যুকে ঘিরে আজও বহু প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর মেলেনি। স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এটি এক বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে।দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে, বিশেষত তৎকালীন কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন সরকারগুলির আমলে, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নিএমন অভিযোগ বহু গবেষক, ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরেছেন। পাঠ্যপুস্তক, সরকারি আলোচনা কিংবা জাতীয় স্মৃতিচর্চায় তাঁর ভূমিকা অনেকাংশেই আড়ালে থেকে যায় বলে সমালোচনা রয়েছে। মতাদর্শগত পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু জাতীয় জীবনে তাঁর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ইতিহাসের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তথ্য, অবদান এবং কর্মের ভিত্তিতেরাজনৈতিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে নয়।আজকের ভারত তাঁর স্বপ্নের বহু দিক বাস্তবায়নের সাক্ষী। দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতার প্রশ্নে তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু একজন শিক্ষাবিদ, সংসদীয় গণতন্ত্রের বিশ্বাসী নেতা এবং আত্মত্যাগী দেশপ্রেমিক হিসেবে তাঁর অবদান ভারতীয় ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর, এই বছর ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জন্মদিনে রাজ্যজুড়ে এক পক্ষকাল ধরে স্কুল, কলেজ সহ নানা প্রতিষ্ঠানে গভীর শ্রদ্ধ নিবেদনের পালা চলছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের মতে তাঁর জীবন আমাদের শেখায়আদর্শের জন্য সংগ্রাম করতে হয়, নীতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, আর দেশকে ভালোবাসতে হলে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হয়। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন; তিনি ভারতের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যাঁর স্মৃতি আগামী প্রজন্মকেও দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং আত্মত্যাগের শিক্ষা দিয়ে যাবে।
ক্ষমতার শীর্ষ থেকে অনিশ্চয়তার কিনারায়, মমতা-অভিষেকের সামনে কঠিন প্রশ্ন
দেহপট সনে নট সকলি হারায় মঞ্চে বা পর্দায় যে নট-নটিরা অসংখ্য মানুষের চোখের পর্দায় বিচরণ করেন তাঁদের সম্পর্কে কবির এই নিদান। গ্ল্যামারের ছটায় যে সাফল্য আসে নট-নটিদের, তার জনমোহিনী আকর্ষণ শরীরে বয়স থাবা বসানোর সঙ্গে সঙ্গে অতি দূরের নির্জন দ্বীপের চেহারা নেয়। তবে, রাজনীতির মঞ্চে কালের এই নিয়ম আলাদা। সেখানে বয়স নয়, ক্ষমতার মসনদ ই মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতার মসনদের উপরে ও নিচে কোথায় অবস্থান তা নির্দিষ্ট করে দেয় খেলার নিয়ম। এই মুহূর্তে এই অনুভব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে বেশি কেউ বুঝছেন না। শুধু ক্ষমতা হারানো নয় ১৯৯৮ সালে যে দলটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই দলটাই তাঁর মুঠোয় আর থাকবে কি না সেই প্রশ্ন ই এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মমতার। ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস বলছে ব্যক্তি নির্ভর দলের বোধহয় এটাই ভবিতব্য। ইংরেজিতে একটা কথা আছে nothing succeeds like success। নতুন দল তৈরির পর থেকেই সাফল্যের মুখ দেখেননি মমতা। ধীরে ধীরে রাজ্যের বিরোধী পরিসরে তিনি জায়গা পেয়েছেন। অবশেষে, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম পর্ব পেরিয়ে ২০০৮ এর পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে ক্ষমতার বিন্দুর দিকে যাত্রা শুরু হয় মমতার। ২০০৯ এর লোকসভা, ২০১০ এর পুরসভা ও পৌরসভার নির্বাচন এর পরপর ২০১১ এর বিধানসভা নির্বাচনে সেই বিন্দুর স্পর্শ পেয়েছেন তিনি। তারপরে তো দল এবং সরকারে তিনিই ছিলেন শেষকথা। ক্ষমতায় থাকার জন্য দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে মজবুত করতে নিচুতলার কর্মী থেকে নেতা - মন্ত্রীদের বেপরোয়া ক্ষমতার ব্যবহার ও দূর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। অন্যদিকে, দলে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে অভিষেক বন্দোপাধ্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে একের পর এক ঘুঁটি সাজিয়েছেন। এই সবই ছিল ক্ষমতার মসনদে বসে থাকাকালীন সময়ের ঘটনা প্রবাহ। কিন্তু, ২০২৬ সালের ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোনোর পরে পরিস্থিতি আমূল বদলে গিয়েছে। দলের টিকিটে ল্যাম্পপোস্ট দাঁড় করালেও মমতার নামে তিনি বৈতরণী পেরিয়ে যাবেন - দলের মধ্যে এই যে myth তৈরি হয়েছিল তা আজ অতীত। এখন তো তাঁর নামে একটি কর্মসূচিতেও দলের নেতা কর্মীদের দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হবে। এই পরিস্থিতিতে আমার মনে হয় মমতার থেকে ও অনেক অনেক বেশি কঠিন কঠোর বাস্তব এসে দাঁড়িয়েছে অভিষেকের সামনে। মমতার পক্ষে তাঁকে ব্রাত্য করা অসম্ভব হলেও দলের নেতা, বিধায়ক, কর্মীদের কাছে নয়। কারণ অভিষেক দলের মধ্যে যেখানে ছিলেন তা তাঁর রাজনৈতিক পরিশ্রমের ফল নয়। ক্ষমতার সোপানে পা রেখেই তাঁর যাত্রা শুরু। দলের নেতা, বিধায়ক ও কর্মীদের তা অজানা নয়। ফলে এখন পরীক্ষা অভিষেকের। এতদিন তিনি digital space এ রাজনীতি করে এসেছেন, এবার নামতে হবে রাজনীতির রুক্ষ মাঠে, রাস্তায়। এই রাস্তা, মাঠে তাঁর জন্য কোন বাস্তব অপেক্ষা করে আছে তা তিনি আঁচ পেয়েছেন সোনারপুরের রাস্তায়। তিনি কি দলের ভাঙন ঠেকাতে পারবেন? সাফল্যের নিচে যে অন্ধকার থাকে তার সঙ্গে কি মানিয়ে চলতে পারবেন? দলের মধ্যে যাঁরা মাঠে - ময়দানে লড়াইতে, অভিজ্ঞতায় তাঁর থেকে এগিয়ে রয়েছেন তাঁদের সঙ্গে পা মেলাতে পারবেন? এইগুলোই এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে কালীঘাট ও হরিশ মুখার্জি রোডের দরজায়।

