ডার্বি মানেই কি আর নিয়মরক্ষার ম্যাচ? কলকাতার ফুটবলে ডার্বির কোনও ম্যাচই যে নিছক নিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকে না, বারাসত বিদ্যাসাগর স্টেডিয়ামে আরও একবার তার প্রমাণ মিলল। কয়েকদিন আগেই ডুরান্ড কাপের ডার্বিতে হারের যন্ত্রণা ছিল মোহনবাগানের। ফলে কলকাতা লিগের এই ম্যাচের গুরুত্ব লিগের অঙ্কে যতই কম থাকুক, সবুজ-মেরুন সমর্থকদের কাছে ‘বদলার’ আবেগটা ছিল যথেষ্টই তীব্র।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য বদলা নেওয়া হল না। জমজমাট লড়াই শেষে ১-১ গোলে ড্র হল কলকাতা লিগের ডার্বি। মোহনবাগানের হয়ে গোল করলেন মনবীর সিং। দ্বিতীয়ার্ধে সেই গোল শোধ করে ইস্টবেঙ্গলকে সমতায় ফেরালেন মহম্মদ বিলাল। লিগের হিসেব বদলাল না। তবে তরুণ লাল-হলুদ ফুটবলারদের লড়াই নিঃসন্দেহে নজর কাড়ল।
দুই দলই ইতিমধ্যে কলকাতা লিগের সুপার সিক্সে জায়গা করে নিয়েছে। ফলে ইস্টবেঙ্গল যে সিনিয়র দলের কোনও ফুটবলারকে খেলাবে না, তা আগেই পরিষ্কার ছিল। চাকু মান্ডি, মনতোষ মাজি, গৌরব সাউ, আকাশ হেমরামদের কাছে তাই এই ডার্বি ছিল নিজেদের প্রমাণ করার মঞ্চ। বিপরীতে মোহনবাগান শুরু থেকেই নামিয়ে দিয়েছিল অভিজ্ঞ শুভাশিস বোস, রাহুল ভেকে, আপুইয়া, মনবীর সিং, সাহাল আবদুল সামাদের মতো ফুটবলারদের।
স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচের শুরুটা ছিল মোহনবাগানের দখলে। প্রথম থেকেই চাপ তৈরি করে সবুজ-মেরুন। ইস্টবেঙ্গলের তরুণরা চেষ্টা করলেও অভিজ্ঞতার ব্যবধানটা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। তবে গোলের সামনে গিয়ে বারবার তালগোল পাকিয়ে ফেলছিল মোহনবাগান। একাধিক সুযোগ তৈরি করেও ব্যবধান বাড়াতে পারেনি তারা।
অবশেষে ৩৭ মিনিটে সেই চাপেরই ফল। মাঝমাঠ থেকে আসা একটি আপাত নিরীহ বলের দিকে ঠিকমতো এগোতে পারেননি ইস্টবেঙ্গল গোলকিপার গৌরব সাউ। অঙ্কন ভট্টাচার্যও মনবীরকে যথেষ্ট জায়গা দিয়ে ফেলেছিলেন। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে একটুও ভুল করেননি মনবীর। তাঁর শট জালে জড়িয়ে যায়। প্রথমার্ধের শেষ বাঁশি বাজার সময় ১-০ গোলে এগিয়ে মোহনবাগান।
কিন্তু বিরতির পর যেন সম্পূর্ণ বদলে গেল ইস্টবেঙ্গল।
দ্বিতীয়ার্ধে অনেক বেশি আগ্রাসী ফুটবল খেলতে শুরু করল অর্চিষ্মান বিশ্বাসের দল। প্রথমার্ধে যেখানে মোহনবাগানের গোলমুখে কার্যত কোনও আক্রমণ ছিল না, সেখানে দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ২০ মিনিটেই একের পর এক আক্রমণে সবুজ-মেরুন রক্ষণকে ব্যস্ত করে তুলল লাল-হলুদ।
বিজয়ের শট শুভাশিস বোসের গায়ে লেগে ফিরে এল। একবার মেহতাব কোনওরকমে আকাশকে আটকালেন। ৬০ মিনিটে বিজয় মুর্মু বল পায়ে নিতে ব্যর্থ হলেন। তার কিছু পরেই ইস্টবেঙ্গলের একটি শট বারে লেগে ফিরে এল। একের পর এক সুযোগ নষ্ট হলেও বোঝা যাচ্ছিল, সমতা ফেরানো এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা।
শেষ পর্যন্ত ৬৫ মিনিটে এল সেই কাঙ্ক্ষিত গোল।
কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে দুর্দান্ত হেড করলেন মহম্মদ বিলাল। মেহতাব, শুভাশিস, রাহুলদের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারদের সামনে দাঁড়িয়েও কোনওরকম নার্ভাসনেস দেখালেন না তিনি। তাঁর হেডে পরাস্ত হলেন গোলকিপার দীপ্রভাত। ১-১।
এরপর ম্যাচের শেষ ২৫ মিনিটে যেন ডার্বির আসল উত্তেজনা। মোহনবাগান জয়সূচক গোলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেও ইস্টবেঙ্গলের তরুণ রক্ষণভাগ একের পর এক আক্রমণ সামলে গেল। কখনও অঙ্কন, কখনও মনতোষ চাকলাদার—প্রাণপণে রক্ষণ সামলালেন তাঁরা। জার্সি বদলে মাঠে নামা সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়কেও কার্যত আটকে রাখলেন অঙ্কন।
আর ৮৩ মিনিটে গৌরব সাউয়ের সেই দুর্দান্ত সেভ! শরীর ছুড়ে দেওয়া সেই সেভ নিঃসন্দেহে ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। শেষ পর্যন্ত আর গোল হল না। ১-১ গোলে শেষ হল কলকাতা লিগের ডার্বি।
সুপার সিক্সে আর মুখোমুখি হবে না দুই প্রধান। দু’দলই খেলবে তিনটি করে ম্যাচ। ফলে এই ড্র লিগের সমীকরণে কোনও পরিবর্তন আনল না। কিন্তু দুই দলের কোচের ভাবনায় যে কিছু পরিবর্তন আনবে, তা বলাই যায়।
এই ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলের তরুণদের পারফরম্যান্স বিশেষভাবে নজর কাড়ল। চাকু মান্ডি দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক ম্যাচে দলের নেপথ্য নায়ক। বড় ম্যাচের চাপ সামলানোর ক্ষমতাও যে তাঁর রয়েছে, ডার্বিতে ফের তা প্রমাণিত। অঙ্কন ভট্টাচার্য এবং তন্ময় দাস ছিলেন দুর্দান্ত। আকাশ হেমরামের গতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়—এই তরুণ বাঙালি ফুটবলারদের কি আরও বড় মঞ্চে সুযোগ দেওয়া যায় না? আইএসএলের সিনিয়র দলে জায়গা করে নেওয়ার মতো প্রতিভা তাঁদের মধ্যে রয়েছে কি না, তা অন্তত এই ডার্বির পর ভেবে দেখার সময় এসেছে। ইস্টবেঙ্গলের সিনিয়র দলের কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের নজর নিশ্চয়ই পড়বে তাঁদের উপর।
অন্যদিকে মোহনবাগানের জন্য এই ড্র কিছুটা সতর্কবার্তাও বটে। অভিজ্ঞ ফুটবলারদের নিয়ে শুরু করেও ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে তরুণ ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ হারানো প্রশ্ন তুলবেই। কোচ প্যানাজিওটিস ডিলেমপেরিসকে ভাবতে হবে দলের ফিটনেস, গতি এবং সবচেয়ে বড় কথা—জয়ের খিদে নিয়ে।
ডার্বির ফল লিগের অঙ্ক বদলাল না। কিন্তু ৯০ মিনিটের এই লড়াই দুই দলের জন্যই রেখে গেল বেশ কিছু প্রশ্ন। সামনে দীর্ঘ মরশুম। তার আগে বারাসতের এই ডার্বি হয়তো দুই দলের কোচকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।
- More Stories On :
- Mohunbagan
- Eastbengal

