এক বছর আগেও ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তখন তিনি রাজ্যের প্রশাসনিক পদে। কালীপুজোর দিন হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে উপচে পড়ত মানুষের ভিড়। রাজ্যের মন্ত্রী, আমলা থেকে শুরু করে টলিউডের পরিচিত মুখ, নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষসকলেরই আনাগোনা লেগে থাকত সেখানে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে বদলে গিয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর পদ হারিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর তার সঙ্গে বদলে গিয়েছে তাঁর বাড়ির কালীপুজোর চেনা ছবিও।এবার কালীপুজোর দিন হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে চোখে পড়ল অন্য ছবি। রাস্তায় পুলিশের কয়েকটি গাড়ি থাকলেও আগের মতো মানুষের ভিড় নেই। নেই অনুগামীদের সেই চেনা জমায়েত। বাড়ির সামনে মূলত নিরাপত্তারক্ষীদেরই দেখা গেল। অথচ এত দিন এই পুজোকে ঘিরে পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দলীয় কর্মী এবং সাধারণ মানুষের ভিড় লেগে থাকত।তবে সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ির দরজা এবারও খোলা রেখেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিচয় জানিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে দেখা যায় অনেককেই। নিজে আটপৌরে শাড়ি পরে অতিথিদের স্বাগত জানান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু প্রতি বছর যে ভিআইপিদের ভিড় দেখা যেত, এবার তার অনেকটাই অনুপস্থিত। পরিচিত রাজনৈতিক মুখের পাশাপাশি টলিউডের তারকাদেরও তেমন দেখা যায়নি। পুজোর প্রতিমার আকার নিয়েও উপস্থিত কয়েকজনের মধ্যে আলোচনা শোনা গিয়েছে।হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের গলিতে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়ে বাঁ দিকে একটি ছোট কালীপুজো। সেখান থেকে কিছুটা এগোলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। বাড়ির ভিতরের উঠোনে তখন চলছে পুজোর আয়োজন। নিরাপত্তার কড়াকড়িও চোখে পড়ার মতো বেশি ছিল না। সাধারণ পরিচয় জানিয়েই ভিতরে ঢোকার সুযোগ মিলেছে।সন্ধ্যার পর থেকে ধীরে ধীরে বাড়িতে আসতে শুরু করেন তৃণমূলের কয়েকজন নেতা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাংসদ সৌগত রায়, দোলা সেন, বিধায়ক কুণাল ঘোষ-সহ দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের একাধিক নেতা। প্রাক্তন বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ আরও কয়েকজন প্রাক্তন বিধায়ক ও নেতাকেও দেখা যায়। রাতের দিকে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মমতার বাড়িতে পৌঁছন সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।পুজোর আয়োজনের মধ্যেই অতিথিদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় মমতাকে। বাড়িতে মৃদু সুরে বাজছিল গত দশ বছরে তাঁর লেখা ও সুর করা গানের অ্যালবামের গান। নিজেই সেই কথা জানান মমতা। তাঁর কথায়, শ্রীরাধা, ইন্দ্রনীল, তৃষা এবং রূপঙ্করের গাওয়া গানই বাজছে বাড়িতে।তবে এবারের পুজোয় সবচেয়ে বেশি আলোচনা পরিচিত কয়েকটি মুখের অনুপস্থিতি নিয়ে। একসময় এই বাড়ির কালীপুজোয় আইপিএস ও আইএএস আধিকারিকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। টলিউডের একাধিক তারকাও আসতেন। পুজোর আয়োজন সামলাতে সবসময় ব্যস্ত থাকতেন ইন্দ্রনীল সেন ও অরূপ বিশ্বাস। প্রতি বছর ফিরহাদ হাকিম নবনীড় বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিকদেরও নিয়ে আসতেন। কিন্তু এবার তাঁদের কাউকেই দেখা যায়নি। ফলে বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিকদেরও পুজোয় আসতে দেখা যায়নি।এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির পুজো ছাড়াও এলাকায় আরও দুটি বড় কালীপুজোর আয়োজন হয়েছে। তার মধ্যে একটি পুজোর উদ্বোধন আগেই করেছেন মমতা। অন্য দিকে, তরুণ যুবক সঙ্ঘের পুজোও উদ্বোধন করেন তিনি। নিজের বাড়ির পুজোর আয়োজনের মাঝেই কিছুক্ষণের জন্য বেরিয়ে ওই মণ্ডপে যান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।সব মিলিয়ে, এক বছরের ব্যবধানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির কালীপুজোয় চোখে পড়ল স্পষ্ট পরিবর্তন। সাধারণ মানুষের জন্য দরজা খোলা থাকলেও আগের মতো ভিআইপি, আমলা ও তারকাদের ভিড় আর দেখা গেল না। রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর কালীঘাটের এই পরিচিত পুজোর ছবিও যে বদলেছে, তা এদিনের আয়োজনেই স্পষ্ট।