বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু কিছু কণ্ঠ আছে, যাদের শুধু ‘গায়ক’ বললে অন্যায় হয়। তাঁরা যেন একটি সময়ের কণ্ঠস্বর, একটি মননের প্রতিনিধি, কখনও বা একটি অসমাপ্ত তর্কের নাম। দেবব্রত বিশ্বাস তেমনই একজন। বাঙালির কাছে তিনি ‘জর্জ বিশ্বাস’, আরও আপন করে বললে ‘জর্জদা’।
আজও তাঁর গলায় ‘যেতে যেতে একলা পথে’ কিংবা ‘এ মণিহার আমার নাহি সাজে’ ভেসে এলে মনে হয়—একজন মানুষ গান গাইছেন না, নিজের সমস্ত জীবনটাকে খুলে রেখে গেছেন শ্রোতার সামনে। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ কখনও নিছক সুর নন; তিনি হয়ে ওঠেন অভিমান, প্রেম, প্রতিবাদ, নিঃসঙ্গতা এবং মানুষের অন্তর্গত দীর্ঘশ্বাস।
দেবব্রত বিশ্বাসের জন্ম ১৯১১-র ২২ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলার কিশোরগঞ্জে। ছোটবেলাতেই তাঁর জীবনে গানের প্রবেশ। মায়ের কাছ থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও ভক্তিগীতি শোনা, পরে কলকাতায় এসে নানা বিশিষ্ট শিল্পী ও সুরকারের সংস্পর্শ—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছিল এক অদ্ভুত সঙ্গীতমন।
কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের মুহূর্তগুলির একটি এসেছিল ১৯২৮ সালে। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের ভাদ্রোৎসবে প্রথমবার তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। তখন কবির বয়সের ভার, শরীরের ক্লান্তি—তবু দেবব্রতের চোখে তিনি ছিলেন যেন ‘সুরের রাজা’। সেই দর্শন তাঁর মনে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, বহু বছর পরেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে কোনও দূরের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেননি; বরং থেকে গিয়েছিলেন এক অন্তরঙ্গ অথচ অধরা মানুষ।
সম্ভবত সেই কারণেই রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর কাছে কখনও ‘শুধু গান’ হয়ে ওঠেনি।
গান, না কি মানুষের কথা?
জর্জদার গলার প্রথম যে জিনিসটি শ্রোতাকে থামিয়ে দিত, তা হল তাঁর কণ্ঠস্বর। গভীর, ভারী, উদাত্ত—কখনও যেন মেঘের মতো, কখনও আবার শুকনো পাতার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ার মতো বিষণ্ণ। তাঁর গলায় শব্দেরও যেন আলাদা শরীর ছিল।
তিনি ‘জ্যোৎস্না’ বললে জ্যোৎস্না দেখা যেত। ‘বেদনা’ বললে শব্দটির মধ্যে যেন সত্যিই একটা ব্যথা জন্ম নিত। ‘পাতায় পাতায়’ উচ্চারণে মনে হত, অন্ধকার বাগানে কোথাও জলবিন্দু পড়ছে।
এখানেই তাঁর গায়কির আসল জাদু।
রবীন্দ্রসঙ্গীতকে তিনি কেবল স্বরলিপির অনুগত সুর হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে গান ছিল কবিতার উচ্চারণ, আর সেই উচ্চারণের মধ্যে মানুষের নিঃশ্বাস থাকা চাই। তাই তাঁর গানে কোথাও দীর্ঘ টান, কোথাও শব্দের উপর বিশেষ চাপ, কোথাও বা হঠাৎ থেমে যাওয়া—সবই যেন গানের কথাকে জীবন্ত করে তুলত।
এই কারণেই তাঁর গান শুনলে কখনও মনে হয় তিনি গাইছেন না—কথা বলছেন। আর কখনও মনে হয়, কথা বলতে বলতে হঠাৎ গান হয়ে গেলেন।
‘জর্জ’ নামটির গল্পটিও কম মজার নয়
দেবব্রত নামের মানুষটি কী করে ‘জর্জ’ হয়ে গেলেন?
ছোটবেলায় অসুস্থতার সময়ে তাঁকে দেখাশোনা করা এক ইংরেজ নার্সের দেওয়া নাম থেকেই ‘জর্জ’ নামটির সূত্রপাত বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে রাজা ছিলেন পঞ্চম জর্জ। পরে সেই নামই এমনভাবে তাঁর সঙ্গে মিশে যায় যে, দেবব্রত বিশ্বাসের চেয়ে ‘জর্জদা’ নামটিই মানুষের মুখে বেশি আপন হয়ে ওঠে।
অদ্ভুত ব্যাপার—যে মানুষটির নামের সঙ্গে এক ব্রিটিশ রাজার ছায়া জড়িয়ে ছিল, তিনিই পরে গানের ভিতর দিয়ে ঔপনিবেশিক মানসিকতার বাইরে এক সম্পূর্ণ বাঙালি সত্তাকে প্রতিষ্ঠা করলেন।
জর্জদা ছিলেন গম্ভীর, আবার বেশ মজার মানুষও
তাঁকে শুধু ‘গম্ভীর রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী’ ভাবলে ভুল হবে। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন বেশ রসিক, খানিকটা খামখেয়ালি, এবং অনেকটাই নিজের মতো করে চলা মানুষ। দক্ষিণ কলকাতার ছোট ভাড়াবাড়িতে তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। অথচ সেই ছোট ঘরেই গান, চিঠিপত্র, পান সাজানোর সরঞ্জাম, বই আর অসংখ্য মানুষের আনাগোনা—সব মিলিয়ে যেন এক আশ্চর্য সাংস্কৃতিক আড্ডা বসত।
তিনি রান্না করতেও ভালবাসতেন। মশলাদার রান্নার প্রতি তাঁর বিশেষ টান ছিল বলে তাঁর সম্পর্কে লেখা স্মৃতিচারণে জানা যায়। আবার কলকাতার রাস্তায় তাঁকে মোটরবাইক চালিয়েও দেখা যেত—এই দৃশ্য তাঁর ‘গম্ভীর রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক’ ভাবমূর্তির সঙ্গে বেশ বেমানান, অথচ মানুষটি যে এমনই ছিলেন, সেটাই তাঁর চরিত্রের মজা।
আর ছিল তাঁর পানপ্রেম। ছোট ঘরে বসে পান সাজছেন, সামনে হারমোনিয়াম, পাশে চিঠির ফাইল—এই ছবিটি যেন তাঁর জীবনের এক অদ্ভুত প্রতিকৃতি।
কেউ কেউ তাঁকে একটু ‘পাগলাটে’ বলতেন। কিন্তু সেই পাগলামির মধ্যেও ছিল গভীর শৃঙ্খলা—গানের প্রতি, শব্দের প্রতি, নিজের বিশ্বাসের প্রতি।
রবীন্দ্রনাথের গান তাঁর কাছে ‘গণমানুষের গান’
জর্জদার সঙ্গীতজীবন শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীতে আটকে ছিল না। গণনাট্য আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল মানুষের আরও কাছে। তিনি গণসঙ্গীত গেয়েছেন, রাজনৈতিক মঞ্চে গান গেয়েছেন, মানুষের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কণ্ঠের সেই বজ্রগম্ভীর শক্তি শুধু প্রেমের গানেই নয়, মানুষের অধিকারের গানেও সমানভাবে ধ্বনিত হয়েছে।
দেশভাগ তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর কণ্ঠ মানুষের কাছে পৌঁছেছিল। রবীন্দ্রনাথকে তিনি তাই কেবল অভিজাত ড্রয়িংরুমের কবি বলে ভাবেননি। তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মাঠের মানুষেরও কবি, দুঃখী মানুষেরও কবি, প্রতিবাদী মানুষেরও কবি।
সেই জায়গা থেকেই হয়তো তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত এতখানি মাটির গন্ধ বহন করে।
আর তারপর শুরু হল বড় সংঘাত
জর্জ বিশ্বাসের জীবনকে যদি একটি নদী ভাবা যায়, তবে ষাটের দশক ছিল সেই নদীর সবচেয়ে উত্তাল বাঁক।
রবীন্দ্রসঙ্গীত কীভাবে গাওয়া হবে—স্বরলিপি কতটা মানতে হবে, কোন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে, গানের প্রকাশভঙ্গি কতখানি স্বাধীন হতে পারে—এই প্রশ্নে তাঁর সঙ্গে বিশ্বভারতী-নির্ভর প্রচলিত রীতির সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে।
১৯৬৪ সালে তাঁর গাওয়া ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ এবং ‘এসেছিলে তবু আসো নাই’ নিয়ে আপত্তি ওঠে। পরে ‘পুষ্প দিয়ে মারো যারে’ ও ‘তোমার শেষের গানের’ মতো গান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তাঁর গানে ‘অতিনাটকীয়তা’, স্বরলিপি থেকে বিচ্যুতি এবং অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
কিন্তু জর্জদা পিছিয়ে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না।
তাঁর যুক্তি ছিল সরল—রবীন্দ্রনাথের গান যদি মানুষের অনুভূতির গান হয়, তবে তাকে শুধু কাগজের স্বরলিপির মধ্যে বন্দি করে রাখা যায় না। রবীন্দ্রনাথ নিজেই ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতের নানা উপাদানের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন; তাহলে তাঁর গানে নতুন বাদ্যযন্ত্র বা নতুন প্রকাশভঙ্গির দরজা বন্ধ থাকবে কেন?
এই প্রশ্নই তাঁকে ক্রমশ একা করে দিয়েছিল।
অবশেষে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড করা প্রায় বন্ধ করে দেন। বাইরে অনুষ্ঠান করাও কমিয়ে দেন। অথচ তখন তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে যে তাঁর রয়্যালটি সমসাময়িক বহু প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর চেয়েও অনেক বেশি ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
এ যেন আশ্চর্য এক পরিহাস—যে শিল্পীকে শ্রোতা আরও শুনতে চায়, সেই শিল্পীই একদিন নিজের গান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন।
‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’
নিজের জীবন ও সঙ্গীতভাবনা নিয়ে তিনি লিখেছিলেন ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’। বইটি শুধু আত্মজীবনী নয়; এক অর্থে নিজের শিল্পীসত্তার পক্ষে তাঁর জবানবন্দি। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচলিত রীতির সঙ্গে তাঁর সংঘাত, নিজের গায়কির দর্শন এবং শিল্পীর স্বাধীনতা—সবকিছু নিয়েই সেখানে তাঁর অকপট বক্তব্য রয়েছে।
নামটিই যেন তাঁর জীবনকে বলে দেয়—‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’।
তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের একনিষ্ঠ প্রেমিক, অথচ রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রাতিষ্ঠানিক পাহারাদারদের সঙ্গে তাঁর সংঘাত। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের গানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাওয়া এক শিল্পী, অথচ সেই পথেই তাঁকে একসময় প্রায় একঘরে হতে হয়েছিল।
এই দ্বন্দ্বই জর্জদাকে এত বড় করে।
তাঁর গান শুনলে আজও কেন বুকের ভিতর কেঁপে ওঠে?
কারণ জর্জ বিশ্বাস গানকে সাজিয়ে দেননি—তিনি গানকে বাঁচিয়েছেন।
‘যেতে যেতে একলা পথে’ তাঁর গলায় নিছক একাকিত্বের গান নয়; মনে হয়, কোনও এক সন্ধ্যায় জীবনের সমস্ত পরিচিত মুখ পিছনে ফেলে একজন মানুষ সত্যিই একা পথে বেরিয়ে পড়েছেন।
‘এ মণিহার আমার নাহি সাজে’ যেন আত্মসম্মানের গান।
‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ হয়ে ওঠে অন্ধকার ঘরের একান্ত স্বগতোক্তি।
আর ‘এসেছিলে তবু আসো নাই’—সেখানে অপেক্ষা যেন জল হয়ে পাতায় পাতায় ঝরে পড়ে।
'হে মাধবী, দ্বিধা কেন?' সে এক আকুল আহ্বান।
'নীল- অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় সম্বৃত অম্বর হে গভীর!' জলদ গম্ভীর কণ্ঠ।
এই যে গানের মধ্যে দৃশ্য তৈরি করার ক্ষমতা, এটাই জর্জ বিশ্বাসের অনন্যতা।
তিনি শব্দকে শুধু উচ্চারণ করেননি; শব্দের ভিতরে ঢুকে তার দরজা খুলে দিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি একাই রইলেন
জীবনের শেষ পর্বে শরীর তাঁকে ক্রমশ দুর্বল করে দিয়েছিল। ১৯৭১-এর পর তাঁর সক্রিয় সঙ্গীতজীবন কার্যত থেমে যায়। ১৯৮০ সালের ১৮ আগস্ট কলকাতায় তাঁর মৃত্যু। কিন্তু আশ্চর্যভাবে তাঁর গান থামেনি।
আজও বাঙালির ঘরে যখন সন্ধে নামে, পুরনো রেডিয়ো বা রেকর্ড থেকে যখন ভেসে আসে তাঁর ভারী, গভীর কণ্ঠ—মনে হয়, মানুষটি বুঝি এখনও কোথাও বসে আছেন।
হয়তো সামনে পান সাজা।
হয়তো পাশে হারমোনিয়াম।
হয়তো টেবিলের উপর ছড়িয়ে রয়েছে কয়েকটি চিঠি।
আর কেউ তাঁকে বলছে—
‘জর্জদা, গানটা আর একবার গাইবেন?’
তিনি হয়তো একটু বিরক্ত মুখে বলছেন, ‘এক গান বারবার গাইতে হয় নাকি?’
তারপরই হারমোনিয়ামের রিড কেঁপে উঠছে।
ঘরটা একটু অন্ধকার হয়ে আসছে।
আর জর্জদার গলা ভেসে উঠছে— 'আমার রাত পোহালো'
রবীন্দ্রনাথের গান।
সেই গান, যার ভিতরে প্রেম আছে, অভিমান আছে, মানুষের কান্না আছে, বিদ্রোহ আছে—আর আছে এক শিল্পীর নিজের মতো করে বাঁচার একগুঁয়ে স্বাধীনতা।
তাই দেবব্রত বিশ্বাস শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীতের একজন গায়ক নন। তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ইতিহাসে এক দীর্ঘ প্রশ্নচিহ্ন।
রবীন্দ্রনাথের গান কীভাবে গাইতে হবে?
জর্জ বিশ্বাস যেন সারাজীবন তার উত্তর খুঁজেছেন।
আর তাঁর উত্তরটি ছিল—
গান আগে মানুষের কাছে পৌঁছবে, তারপর তার সমস্ত নিয়ম-কানুন।
সেই কারণেই এত বছর পরেও জর্জদা পুরনো হননি।
কারণ কিছু কণ্ঠ সময়ের সঙ্গে পুরনো হয় না।
তারা সময়কে অতিক্রম করে—
গানের ভিতর দিয়ে, মানুষের ভিতর দিয়ে।
আরও পড়ুনঃ রাতে আচমকা বর্ধমানের দুই হাসপাতালে হানা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর, কি বললেন শারদ্বত মুখোপাধ্যায়?
- More Stories On :
- Debabrata Biswas
- Rabindrasangeet
- Vocalist
- Rabindranath
- George Da

