দীপাবলিতে বাজি পোড়ানো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের। পরিবেশ দূষণ রুখতে আতশবাজি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করাই একমাত্র সমাধান কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালত। আদালতের মতে, শুধু বাজি পোড়ানো বন্ধ করলেই বায়ুদূষণ কমবে, এমন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালে দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকায় সম্পূর্ণ বাজি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু তার পরেও বায়ুর গুণমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
দীপাবলিতে বাজি পোড়ানো সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে এই পর্যবেক্ষণ করেছে বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ এবং বিচারপতি প্রসন্ন বি বরালের বেঞ্চ। আদালত জানিয়েছে, বাজি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেই নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হয়েছে, তার যথেষ্ট তথ্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার জমা দিতে পারেনি।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, ২০২৪ সালে দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকায় বাজি পোড়ানো পুরোপুরি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতেও বায়ুর গুণমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। এমনকি চলতি বছর দশেরার দিন এবং তার পরের দিনও দূষণের মাত্রা অনেকটা বেড়েছিল। তাই শুধু বাজি নিষিদ্ধ করলেই দূষণ নিয়ন্ত্রণে আসবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো যথেষ্ট তথ্য নেই।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর পরীক্ষামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব বাজি পোড়ানোর অনুমতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের উপর এই বাজির প্রভাব কতটা পড়ে, তা খতিয়ে দেখাই ছিল উদ্দেশ্য। সেই কারণে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। কিন্তু সেই নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করা হয়নি বলে অভিযোগ শীর্ষ আদালতের।
সব দিক বিবেচনা করে আপাতত সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পরিবেশবান্ধব বাজি পোড়ানোর অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৭ ও ৮ নভেম্বর দীপাবলির দু’দিন নির্দিষ্ট সময়ে বাজি পোড়ানো যাবে। সকাল ৬টা থেকে ৭টা এবং রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত এই অনুমতি থাকবে।
তবে সব ধরনের বাজি পোড়ানো যাবে না। শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদিত এবং নির্দিষ্ট সরকারি সংস্থার শংসাপত্র পাওয়া পরিবেশবান্ধব বাজি ব্যবহার করা যাবে। সাধারণ বাজি বা নিষিদ্ধ বাজি পোড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি।
একই সঙ্গে হাসপাতাল, নার্সিংহোম, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বৃদ্ধাশ্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট নীরব এলাকার ৩০০ মিটারের মধ্যে বাজি পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে আদালত। এই এলাকাগুলিকে নিষিদ্ধ বাজি পোড়ানোর এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। অনলাইনেও বাজি বিক্রি করা যাবে না। নির্দিষ্ট জায়গা থেকেই অনুমোদিত বাজি কিনতে হবে। নিষিদ্ধ বাজি বিক্রি বা ব্যবহার করলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
শুনানিতে পরিবেশ ও দীপাবলির ইতিহাস নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে শীর্ষ আদালত। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে প্রকৃতিকে ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হত। সমস্ত জীবের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের কথাও বলা হয়েছে বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে।
আদালতের বক্তব্য, স্কন্দপুরাণ এবং পদ্মপুরাণের মতো প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে দীপাবলি উদযাপনের সময় প্রদীপ জ্বালানোর কথা উল্লেখ রয়েছে। কয়েক শতাব্দী আগে ভারতে বারুদের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর উৎসব পালনের ধরনে পরিবর্তন আসে। তার পর থেকেই আতশবাজি পোড়ানোর প্রচলন বাড়ে।
বাজি পোড়ানোর ফলে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আদালত। বিচারপতিদের মতে, বাজি থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা দীর্ঘ সময় পরিবেশে থেকে যেতে পারে। শ্বাসের সঙ্গে সেই কণা শরীরে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। এর ফলে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং শারীরিক ভাবে অসুস্থ মানুষেরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকার ভৌগোলিক অবস্থানও দূষণ বাড়ার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে আদালত। ওই এলাকায় বাতাসের গতিবেগ কম থাকায় দূষিত বাতাস সহজে সরে যেতে পারে না। শীতকালে তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
আদালত আরও জানিয়েছে, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বেঁচে থাকার অধিকারের মধ্যে সুস্থ ও দূষণমুক্ত পরিবেশে বেঁচে থাকার অধিকারও রয়েছে। অন্যদিকে, ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হলেও সেই অধিকার জনস্বাস্থ্য এবং সংবিধানের অন্যান্য বিধিনিষেধের ঊর্ধ্বে নয়। দীপাবলির ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব মেনে নিয়েও আদালতের বক্তব্য, উৎসব পালনের নামে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি করা যায় না।
শুধু দীপাবলির দিন নয়, উৎসবের পরেও নিয়মিত দূষণের মাত্রা পরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বায়ুর গুণমানের পাশাপাশি দূষণের কারণে কতজন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এবং কতজনের মৃত্যু হচ্ছে, সেই তথ্যও সংগ্রহ করতে হবে সরকারি সংস্থাগুলিকে। পরে সেই পরিসংখ্যান আদালতে জমা দিতে হবে।
আদালত জানিয়েছে, ৯ নভেম্বর থেকে সারা বছর বাজি পোড়ানোর উপর নিষেধাজ্ঞা ফের কার্যকর হবে। দীপাবলির পর দূষণ এবং মানুষের স্বাস্থ্যের উপর তার প্রভাব নিয়ে রাজ্যগুলিকে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে।
অর্থাৎ, দীপাবলিতে বাজি পোড়ানোর ক্ষেত্রে আপাতত কিছুটা ছাড় মিললেও তা সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে বা নিষিদ্ধ এলাকায় বাজি পোড়ালে আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে হতে পারে।
- More Stories On :
- Supreme Court
- Fire cracker,

