দেশ জুড়ে দীপাবলির উৎসব। ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলছে। বাজি, আলো এবং নানা রকমের খাবারে মেতে উঠেছেন মানুষ। কিন্তু হিমাচল প্রদেশের একটি গ্রামে ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে দীপাবলি মানেই নীরবতা। নেই কোনও আলোর সাজ, বাজি বা বিশেষ রান্নার আয়োজন। গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই গ্রামের মানুষ দীপাবলি পালন করেন না। এর পিছনে রয়েছে বংশপরম্পরায় চলে আসা এক অদ্ভুত বিশ্বাস।হিমাচল প্রদেশের সাম্মু গ্রামের বাসিন্দাদের বিশ্বাস, দীপাবলি পালন করলে গ্রামে অমঙ্গল নেমে আসতে পারে। আগুন লাগা, অকালমৃত্যু কিংবা অন্য কোনও বিপদ ঘটতে পারে। সেই ভয় থেকেই বছরের পর বছর ধরে উৎসব থেকে দূরে রয়েছেন তাঁরা। গ্রামের প্রবীণদের কথায়, বহু বছর ধরে এই নিয়ম চলে আসছে। নতুন প্রজন্মও ছোট থেকেই এই বিশ্বাসের কথা শুনে বড় হচ্ছে।গ্রামের বাসিন্দা রাম সিংহ জানিয়েছেন, দীপাবলি পালন করা তাঁদের গ্রামে এক রকম নিষিদ্ধ। কেউ এই নিয়ম ভাঙার চেষ্টা করলে পরে নানা দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি। কখনও আগুন লেগেছে, কখনও প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটেছে। সেই সব ঘটনার কথা মনে রেখেই গ্রামের মানুষ আর দীপাবলি পালনের সাহস দেখান না। তবে এই বিশ্বাসের সঙ্গে দুর্ঘটনাগুলির কোনও বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে, এমন প্রমাণ নেই।শুধু বাজি বা প্রদীপ জ্বালানো নয়, দীপাবলির বিশেষ খাবার তৈরিও এড়িয়ে চলেন গ্রামের বহু পরিবার। বাসিন্দা সচিনের কথায়, উৎসবের দিন বিশেষ রান্না করতেও ভয় পান তাঁরা। তাঁদের আশঙ্কা, এমন কিছু করলে পরিবারের উপর বিপদ নেমে আসতে পারে। তবে বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানো হয় কি না, তা নিয়ে গ্রামবাসীদের বক্তব্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। কিন্তু বাজি, আলোর সাজ এবং বিশেষ খাবারের আয়োজন যে হয় না, সে বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত।গ্রামের এই বিশ্বাস দূর করার জন্য অতীতে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়েরা। কিন্তু তাতেও বদলায়নি পরিস্থিতি। দীপাবলির দিন অনেকেই বাড়ির বাইরে বেরোন না। প্রবীণদের মুখে একই কথা শুনে বড় হচ্ছে গ্রামের শিশুরাও।গ্রামের বাসিন্দা অনিতা জানিয়েছেন, তাঁরা বহু বছর ধরে দীপাবলি পালন করেন না। প্রবীণদের বিশ্বাস, এই উৎসব পালন করলে বিপদ ঘটতে পারে। তাই পরিবারের লোকেরাও সেই নিয়ম মেনে চলেন।তবে দীপাবলির আনন্দ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নন গ্রামের মানুষ। অনেকের মনেই রয়েছে উৎসব পালনের ইচ্ছা। প্রবীণ বাসিন্দা রঘুবীর সিংহ রাংড়ার কথায়, দীপাবলির আনন্দ তাঁরা অনুভব করেন ঠিকই, কিন্তু নিজেদের গ্রামে সেই উৎসব পালন করতে পারেন না। নেই আলো, নেই সাজসজ্জা।বিদ্যা দেবীও জানিয়েছেন, অন্য জায়গায় দীপাবলির উৎসব দেখলে তাঁর ভাল লাগে। সেই আনন্দ উপভোগ করতে কখনও কখনও তাঁরা পাশের গ্রামে যান। অর্থাৎ নিজেদের গ্রামে উৎসব পালন না করলেও অন্য গ্রামের আলো, প্রদীপ এবং উৎসবের আনন্দ দূর থেকে উপভোগ করেন সাম্মুর বাসিন্দারা।দেশের নানা প্রান্ত যখন দীপাবলির আলোয় ঝলমল করে, তখন সাম্মু গ্রামে নেমে আসে নীরবতা। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা বিশ্বাসের কারণে এই গ্রামের মানুষের কাছে দীপাবলি আজও আনন্দের উৎসব নয়, বরং ভয় আর নিষেধের এক অন্য নাম।