মতুয়াদের নাগরিকত্বের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বড় পদক্ষেপ রাজ্য সরকারের। রবিবার ঠাকুরনগরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন, চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সমস্ত শুনানি শেষ করে মতুয়া সম্প্রদায়ের আবেদনকারীদের নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। নাগরিকত্ব পাওয়ার পর যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের নাম ফের তোলার ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক সাহায্যের আশ্বাস দেন তিনি। সেই ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলায় ১২ জন প্রবেশনারি আইএএস আধিকারিককে নিয়োগ করেছে নবান্ন।সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ-তে আবেদনের ক্ষেত্রেও সম্প্রতি কিছুটা সুবিধা হয়েছে। আগে আবেদনের সঙ্গে বাংলাদেশি নথি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করতে না পেরে অনেকেই আবেদন করতে পারছিলেন না। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার সেই বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ায় সিএএ-তে আবেদনের সংখ্যা বেড়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।উত্তর ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত বনগাঁ মহকুমায় ৪২ হাজার ৭৮২ জন সিএএ-তে আবেদন করেছেন। গোটা উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় আবেদনকারীর সংখ্যা ৯২ হাজার ছাড়িয়েছে। মতুয়া অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে আবেদন করার আগ্রহ বেড়েছে। অনেকেই ফর্ম পূরণ করছেন। ঠাকুরবাড়িতে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর।সিএএ-তে আবেদন করার পরেও দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্বের শংসাপত্রের অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে। কারও শুনানি হয়ে গিয়েছে, আবার কারও আবেদন এখনও প্রশাসনিক দফতরে পড়ে রয়েছে। কবে নাগরিকত্ব মিলবে, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল আবেদনকারীদের মধ্যে। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় আশার আলো দেখছেন মতুয়া সম্প্রদায়ের একাংশ।প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, এত দিন প্রয়োজনীয় কর্মী ও পরিকাঠামোর অভাবে আবেদন এবং শুনানির কাজে দেরি হচ্ছিল। ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তেন অনেকে। শুনানির জন্য দূরে জেলাশাসকের দফতরেও যেতে হত। নথি যাচাই করতেও সময় লাগছিল। নতুন ব্যবস্থায় মহকুমা স্তরেই ফর্ম পূরণ ও শুনানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফলে আবেদনকারীদের হয়রানি কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই কাজে ১২ জন প্রবেশনারি আইএএস আধিকারিক নিয়োগের সিদ্ধান্তেও খুশি মতুয়া সম্প্রদায়ের অনেকেই।হরিণঘাটার বিজেপি বিধায়ক অসীম সরকার মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, উদ্বাস্তু মতুয়াদের মধ্যে নতুন করে আনন্দ ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তাঁর কথায়, আগে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, মতুয়াদের নাগরিকত্ব সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসাবেন না। সিএএ কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় এখন তিনি তা বসিয়েছেন বলেও জানান অসীম।বাগদার নতুন আবেদনকারী নরোত্তম বিশ্বাসের কথায়, আগে তিনি সিএএ নিয়ে আশঙ্কার কারণে আবেদন করেননি। তাঁর দাবি, আগের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে ভোটার কার্ড ও আধার কার্ড থাকলেই নাগরিকত্ব প্রমাণ করা যায়। কিন্তু পরে দেখেছেন, অনেকে সিএএ-তে আবেদন করেও নাগরিকত্ব হারাননি। তাই তিনিও আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।এ দিন উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ, ঠাকুরনগর, বাগদা ও গাইঘাটা-সহ মতুয়া অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় মিছিল বের হয়। ডঙ্কা, কাঁসি ও নিশান নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান মতুয়া ভক্তদের একাংশ। নদিয়ার বিভিন্ন এলাকাতেও একই ছবি দেখা যায়। হরিণঘাটায় উদ্বাস্তু মতুয়া ও নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ ডঙ্কা ও কাঁসর বাজিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন। তাঁদের সঙ্গে উৎসবে যোগ দেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক অসীম সরকারও।দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র না পাওয়া এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় অনিশ্চয়তায় ছিলেন মতুয়া সম্প্রদায়ের একাংশ। এ বার প্রশাসনিক তৎপরতায় সেই সমস্যা কতটা মেটে, সেটাই দেখার।