কাঠমান্ডু: ভয়াবহ বন্যার জেরে নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গে আটকে পড়ার নয় দিন পর অবশেষে জীবিত উদ্ধার হলেন দুই শ্রমিক। শুক্রবার আপার ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার করা হয় সঞ্জয় সাহ এবং কবীর মহার্জনকে। সুড়ঙ্গের প্রায় ১৭০ মিটার ভিতরে তাঁদের সন্ধান মেলে। তাঁদের উদ্ধারের ঘটনায় অন্য সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদেরও জীবিত উদ্ধারের আশা নতুন করে জোরালো হয়েছে।
৩০ বছরের সঞ্জয় সাহ নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের মেকানিক্যাল ফোরম্যান। গত ২৬ অগস্ট ত্রিশুলি উপত্যকায় বন্যা আছড়ে পড়ার সময় অন্য কর্মীদের বেরিয়ে যেতে সাহায্য করতে গিয়ে তিনি নিজেই আটকে পড়েন। পরবর্তী নয় দিন অন্ধকার সুড়ঙ্গেই কাটাতে হয় তাঁকে। উদ্ধারকারীদের তিনি জানিয়েছেন, মানসিকভাবে নিজেকে শক্ত রাখতে মন্ত্র জপ করতেন। সুড়ঙ্গের ভিতরে আরও কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
বন্যার সময় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণকক্ষে সাধারণত চার থেকে ছ’জন কর্মী থাকলেও সেদিন সেখানে ৪০ থেকে ৪৫ জন ছিলেন বলে জানিয়েছেন সাহ। বিপদের খবর পেয়ে তিনি অন্যদের দ্রুত পালিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু নিজে আর বেরোতে পারেননি। তাঁর কথায়, এত বড় বিপদের সময় অন্যদের ফেলে পালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
উদ্ধার অভিযানও ছিল অত্যন্ত কঠিন। বন্যার স্রোতে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে সুড়ঙ্গের মুখ সম্পূর্ণ চাপা পড়ে যায়। পুরনো মানচিত্র, উপগ্রহচিত্র, হেলিকপ্টারের ভিডিয়ো এবং এলাকার বিদ্যুতের খুঁটির অবস্থান দেখে উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণ করেন। এরপর শুরু হয় ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ।
বিশাল আকারের পাথর সরাতে ব্যবহার করা হয় খননযন্ত্র। কোথাও কোথাও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ তৈরি করতে হয়েছে। পাশাপাশি সুড়ঙ্গের ভিতরে জমে থাকা জল বার করতে পাম্প এবং নিকাশি পথও তৈরি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে একজন মানুষ যাতায়াত করতে পারে এমন সরু পথ তৈরি হয়।
শুক্রবার ভোরে সুড়ঙ্গের গভীর থেকে উদ্ধারকারীরা ক্ষীণ আওয়াজ শুনতে পান। ডাকাডাকির পর ভিতর থেকে সাড়া মেলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাহ এবং মহার্জনের কাছে পৌঁছে যান উদ্ধারকারীরা। একজনকে পিঠে করে এবং অন্যজনকে স্ট্রেচারে করে বাইরে আনা হয়। পরে দু’জনকেই চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গিয়েছে। মহার্জন হাত-পা নাড়াতে পারছিলেন না। তবে সাহের আঘাত গুরুতর নয় বলেই জানা যায়।
তবে উদ্ধার অভিযান এখনও শেষ হয়নি। প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিতে প্রায় ৯০০ কর্মীর কোনও খোঁজ নেই। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা। শুধু আপার ত্রিশুলি-৩এ প্রকল্পেই প্রায় ১১৫ জন আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ত্রিশুলি উপত্যকার অন্যান্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেও চলছে তল্লাশি। উদ্ধারকাজে নেপালের সেনা ও পুলিশের পাশাপাশি ভারত, চিন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরাও সহযোগিতা করছেন। প্রযুক্তিগত তথ্য আদানপ্রদানের জন্য ইঞ্জিনিয়ারদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। সুড়ঙ্গের নকশা থেকে নিখোঁজ কর্মীদের ফোন নম্বর—বিভিন্ন তথ্য দ্রুত উদ্ধারকারী দলগুলির কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
সঞ্জয় সাহ ও কবীর মহার্জনের জীবিত উদ্ধারের ঘটনা তাই শুধু দু’টি প্রাণ বাঁচানোর সাফল্য নয়, সুড়ঙ্গের অন্ধকারে আটকে থাকা আরও বহু মানুষের পরিবারের কাছে নতুন আশার আলো। উদ্ধারকারীরা এখন এমন একটি অংশের সন্ধান করছেন, যেখানে তুলনামূলক বেশি জায়গা এবং বেঁচে থাকার উপযোগী পরিস্থিতি থাকতে পারে।
অন্যদিকে, নিখোঁজদের পরিবারের অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি। আপার ত্রিশুলি-১ প্রকল্পের পরিবেশবিদ রাজিশ শ্রেষ্ঠার পরিবারও তাঁর ফেরার আশায় দিন গুনছে। তাঁর বাবা জানিয়েছেন, বাইরে তাকালেই তাঁর মনে হয় ছেলে বুঝি ব্যাগ হাতে বাড়ি ফিরছে। সেই আশাতেই এখনও দিন কাটছে তাঁদের।
আরও পড়ুনঃ ফরাক্কায় রেললাইনে ধস, দ্বিতীয় দিনেও বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গের ট্রেন যোগাযোগ, দুর্ভোগে যাত্রীরা

