লিয়োনেল মেসির কলকাতা সফর ঘিরে বিতর্কের জেরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়াল। রাজ্যের প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর ধারায় এফআইআর দায়ের করেছে বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশ। অভিযোগকারী তথা অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত নিজেই সমাজমাধ্যমে এফআইআরের কপি প্রকাশ করে বিষয়টি সামনে আনেন।
ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে শতদ্রু লেখেন, “সত্যের জয় হয়েছে। প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।” একই সঙ্গে তিনি রাজ্যের বর্তমান প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে ধন্যবাদও জানান। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিনের অভিযোগের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার পাঁচটি পৃথক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অভিন্ন উদ্দেশ্যে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ, তোলাবাজি, প্রতারণা, অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মতো গুরুতর অভিযোগ।
শতদ্রুর অভিযোগ, গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে অনুষ্ঠিত মেসি-সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের আগে তাঁর উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, অনুষ্ঠানের জন্য বিপুল সংখ্যক টিকিট দাবি করেছিলেন অরূপ বিশ্বাস। সেই দাবি পূরণ না করলে অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, প্রায় ২২ হাজার ‘কমপ্লিমেন্টারি’ টিকিট নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন শতদ্রু। পরে ওই টিকিটের একটি বড় অংশ কালোবাজারে বিক্রি করা হয় বলেও তাঁর অভিযোগ।
মেসির কলকাতা সফর ঘিরে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠান চলাকালীন মাঠে প্রবেশাধিকার নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অভিযোগ, আমন্ত্রিত অতিথি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মন্ত্রী, আমলা এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠদের অতিরিক্ত উপস্থিতির কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, একসময় মাঠের ভিতরে ধাক্কাধাক্কির পরিবেশ তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতে মেসির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
ঘটনার সময় মেসির সঙ্গে থাকা উরুগুয়ের তারকা ফুটবলার লুইস সুয়ারেজ এবং আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি’পলও বিশৃঙ্খলার শিকার হন বলে অভিযোগ। নিরাপত্তার স্বার্থে শেষ পর্যন্ত মেসিকে দ্রুত মাঠের ওই অংশ থেকে সরিয়ে নিয়ে যান তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা।
মাঠের বিশৃঙ্খলার রেশ পরে ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতেও। ক্ষুব্ধ দর্শকদের একাংশ মাঠে নেমে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও সামনে আসে। এই ঘটনার জেরে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় দুটি পৃথক মামলা দায়ের হয়েছিল। প্রথম মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল অভিযোগকারী শতদ্রু দত্তকেই। অন্য মামলায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত ১৯ মে শতদ্রু দত্ত অরূপ বিশ্বাস, জুঁই বিশ্বাস, আইএএস আধিকারিক শান্তনু বসু, তৎকালীন ডিজি রাজীব কুমার-সহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর দাবি ছিল, প্রভাবশালী কয়েকজনের হস্তক্ষেপ এবং নিয়মবহির্ভূত প্রবেশের কারণেই বহু প্রতীক্ষিত অনুষ্ঠানটি কার্যত ভেস্তে যায়।
মেসি-কাণ্ড নিয়ে বিতর্ক চরমে ওঠার পরেই অরূপ বিশ্বাস ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে তিনি অতীতে সরাসরি দায় স্বীকার করেননি।
তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক মানের একটি অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে এত বড় গাফিলতি কীভাবে ঘটল এবং তার দায় শেষ পর্যন্ত কার কাঁধে বর্তাবে। আপাতত সেই উত্তর খুঁজতেই তদন্তকারীদের নজর মেসি-সফর সংক্রান্ত গোটা ঘটনাপ্রবাহের দিকে।
আরও পড়ুনঃ কলকাতায় মেসির অনুষ্ঠানেই অশান্তি! সময়ের আগেই যুবভারতী ছাড়লেন বিশ্বতারকা
আরও পড়ুনঃ কলকাতায় মেসি মানেই উৎসব হওয়ার কথা ছিল, কেন রণক্ষেত্র হল যুবভারতী?
- More Stories On :
- Aroop Biswas
- Satadru Dutta
- Lionel Messi
- Football
- GOAT Event
- Salt Lake Stadium

