নিজের হাতে আঁকা সেই জোড়াফুল প্রতীকই আপাতত ব্যবহার করতে পারছেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে নির্বাচন কমিশন অন্তর্বর্তী নির্দেশে দুই পক্ষকেই পুরনো নাম ও প্রতীক ব্যবহার করতে নিষেধ করেছে। এই সিদ্ধান্তের পরেই জাতীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর।
এই সিদ্ধান্তের পর বিরোধীদের একাংশ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দল ভাঙার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, শিবসেনা ও এনসিপির পর এবার তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। তাঁর দাবি, একটি রাজনৈতিক দলই যদি ‘চুরি’ হয়ে যেতে পারে, তা হলে কোটি কোটি মানুষের ভোট চুরি হওয়ার আশঙ্কাকেও অবিশ্বাস করার কারণ নেই।
রাহুল আরও অভিযোগ করেছেন, ভোট চুরি এবং সরকার চুরির পর এবার দল চুরির ঘটনা সামনে এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হওয়া উচিত জনমত রক্ষা করা। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, কমিশন সেই ভূমিকা পালন করছে না। উল্লেখ্য, এগুলি রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক অভিযোগ; নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তকে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীকে সমান সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
অন্যদিকে, তৃণমূলের নাম ও প্রতীক ফ্রিজ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সরব হয়েছেন আম আদমি পার্টির আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনকে উল্লেখ করে এই সিদ্ধান্তকে ‘জন্মদিনের উপহার’ বলে কটাক্ষ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, এই ভাবে কি নির্বাচনে জিততে চাইছে বিজেপি?
বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন জানায়, আপাতত কোনও পক্ষই ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম বা ঘাসের উপর জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের আগে এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। দুই গোষ্ঠীকেই বিকল্প নাম এবং কমিশনের নির্ধারিত তালিকা থেকে বিকল্প প্রতীকের প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, আসন্ন উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী—কোনও পক্ষই পুরনো তৃণমূলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে ভোটে নামতে পারবে না। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়। দলের আসল নাম ও প্রতীক কোন পক্ষ পাবে, সেই বিষয়ে পরবর্তী প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জোড়াফুল প্রতীকের ইতিহাস অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গেই গভীর ভাবে যুক্ত। বিভিন্ন পুরনো প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেস তৈরির সময় মমতা নিজেই জোড়াফুলের নকশা এঁকেছিলেন। ১৯৯৭ সালে তিনি দলের প্রতীকের জন্য প্রথম জোড়াফুল আঁকেন বলে পুরনো সংবাদ প্রতিবেদনেও উল্লেখ রয়েছে।
এই কারণেই বর্তমান পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে প্রতীক তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে, সেই প্রতীক নিয়েই এখন দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দাবি-পাল্টা দাবি চলছে। আর নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তের পর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে সেই জোড়াফুল আর দেখা যাবে না।
তবে রাহুল গান্ধী বা অরবিন্দ কেজরিওয়াল মমতার পাশে দাঁড়ানোর যে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন, তা থেকে আগামী দিনে বিরোধী দলগুলির মধ্যে কী ধরনের সমন্বয় তৈরি হবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়। জোড়াফুল বিতর্ককে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে যে নতুন চাপানউতোর তৈরি হয়েছে, তার পরবর্তী পর্বে নজর থাকবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং আসন্ন উপনির্বাচনের দিকে।
- More Stories On :
- Rahul Gandhi
- TMC
- Mamata Banerjee

